এ কে এম ফজলুর রহমান: কর্মসংস্থান পৃথিবীর প্রতিটি দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু। বাংলাদেশের মতো জনবহুল, শ্রমবহুল ও বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশের জন্য এর গুরুত্ব আরও অনেক বেশি। একটি দেশের অর্থনীতি কত দ্রুত বাড়ছে-এটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সেই প্রবৃদ্ধি মানুষের জন্য কতটা উৎপাদনশীল, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। কর্মসংস্থান মানুষের কাছে শুধু আয়ের উৎস নয়। এর সঙ্গে তার আত্মমর্যাদা, সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, পারিবারিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা জড়িত। একইভাবে রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে কর্মসংস্থান দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক স্থিতিশীলতা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, রাজস্ব আহরণ ও মানবসম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের অন্যতম প্রধান মাধ্যম।
তাই কর্মসংস্থানকে কেবল একটি অর্থনৈতিক খাত বা প্রকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি শিক্ষা, দক্ষতা, বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি, অভিবাসন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, শ্রমকল্যাণ এবং সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি আন্তঃখাতভিত্তিক জাতীয় অগ্রাধিকার। কিন্তু বাংলাদেশের কর্মসংস্থানে একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ করা যায়। সেটি হলো আমরা কর্মসংস্থান সমস্যার সমাধানকে প্রায়ই ‘কত চাকরি সৃষ্টি হলো বা হবে’ এ প্রশ্নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে ফেলি। চাকরি সৃষ্টি অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু চাকরি বা কর্ম সৃষ্টি হলেই কার্যকর শ্রম বাজার তৈরি হয় না।
ধরা যাক, কোনো শিল্পাঞ্চলে ৫ হাজার নতুন পদ সৃষ্টি হলো। কিন্তু দেশের কোন অঞ্চলে কোন দক্ষতার কতজন কর্ম-প্রত্যাশী রয়েছে তাদের কে শনাক্ত করবে? কে তাদের শূন্য পদ সম্পর্কে জানাবে? কার দক্ষতা নিয়োগকর্তার প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তা কে নির্ধারণ করবে? দক্ষতার ঘাটতি থাকলে কে তাকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণে পাঠাবে বা পরামর্শ দেবে? কেউ বিদেশে যেতে আগ্রহী হলে তার জন্য বৈধ, নিরাপদ এবং দক্ষতানির্ভর বৈদেশিক গমনের পথ কোথায় তা কে দেখাবে? এখানেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও কর্মসংস্থান ব্যবস্থাপনার পার্থক্য।
চাকরি সৃষ্টি হয় মূলত বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, উদ্যোগের বিকাশ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সম্প্রসারণ, কৃষি, সেবা খাত, রপ্তানি ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের মাধ্যমে। অন্যদিকে রাষ্ট্রের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো এই সুযোগগুলোর সঙ্গে কর্ম-প্রত্যাশী মানুষকে যুক্ত করার কৌশল তৈরি করা।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মতে, Employment Service-এর সরাসরি নতুন চাকরি তৈরি করে না। কিন্তু কর্মসংস্থান উন্নয়ন, শ্রমবাজারের কার্যকারিতা ও চাকরিপ্রার্থী ও নিয়োগকর্তার মধ্যে কার্যকর সংযোগ স্থাপনে এর ভূমিকা সরাসরি ও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ চাকরি সৃষ্টি এক বিষয় আর সৃষ্ট চাকরিতে সঠিক মানুষকে সঠিক জায়গায় পৌঁছে দেওয়া আরেক বিষয়। দুটি একসঙ্গে না হলে কর্মসংস্থান নীতি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। শুধু নীতি থাকলেই হবে না, Delivery mechanism-ই মূল চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে জাতীয় কর্মসংস্থান নীতি ২০২২ প্রণীত হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অগ্রগতি। কিন্তু যেকোনো পলিসির কার্যকারিতা নির্ভর করে তার সেবা প্রদানের কাঠামোর ওপর। আমরা কি তা আজও করতে পেরেছি?
আইএলওর এমপ্লয়মেন্ট পলিসি ইমপ্লিমেনটেশন ফ্রেমওয়ার্কে বলা হয়েছে, একটি জাতীয় কর্মসংস্থান নীতির পেছনে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, অর্থায়ন, শ্রমবাজারের তথ্য ব্যবস্থাপনা, আইনি ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি থাকা প্রয়োজন। জাতীয় কর্মসংস্থান সেবাকে সেখানে কর্মসংস্থান নীতি বাস্তবায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের পাশাপাশি প্রয়োজন সৃষ্ট কর্মসংস্থানের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা, দক্ষতা ও সক্ষমতাসম্পন্ন মানবসম্পদ গড়ে তোলা। বাংলাদেশে কর্মসংস্থানসংশ্লিষ্ট অনেক কার্যক্রম বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে। কেউ দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছে, কেউ বৈদেশিক কর্মসংস্থান, কেউ উদোক্তা উন্নয়ন, কেউ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে অর্থায়ন, কেউ তথ্য প্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষণ, কেউ শ্রমিক কল্যাণ আবার বেসরকারি খাতের রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি ও অনলাইন জব পোর্টাল নিজেদের মতো কাজ করছে।
ফলে দেখা যায় প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোগের সংখ্যা কম নয়। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠান (NSDA, BMET, DYD, TMED ইত্যাদি) অনেক ক্ষেত্রেই নিজস্ব কাঠামো ও লক্ষ্য অনুযায়ী বিচ্ছিন্নভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তাই একটি সুস্পষ্ট, শক্তিশালী ও কার্যকর সমন্বয় ব্যবস্থার অভাবে সামগ্রিকভাবে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জিত হচ্ছে না। অগোছালো ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রচেষ্টা যেমন প্রত্যাশিত ফল দেয় না তেমনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও বিনিয়োগ প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের অভাবে কাঙ্ক্ষিত কর্মোপযোগী মানবসম্পদ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। তাই শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, শিল্প খাত ও শ্রমবাজারের চাহিদাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে যুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। এখানেই জাতীয় কর্মসংস্থান প্রতিষ্ঠানের প্রসঙ্গটি চলে আসে ও একটি পৃথক কর্মসংস্থান সেবা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
বিষয়টি আরেকটু পরিষ্কার করা যাক। যেমন- প্রতিষ্ঠান অনেক আছে কিন্তু একজন সাধারণ কর্ম-প্রত্যাশীর দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নটি হলো- ‘আমি কোথায় যাব?’ তারপর দ্বিতীয় প্রশ্ন- ‘কে আমার প্রয়োজন বা যোগ্যতা বুঝে আমাকে সঠিক প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছে দেবে?’ এ জায়গাতেই একটি শক্তিশালী কর্মসংস্থান সহায়তা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন।
তাই একটি জাতীয় কর্মসংস্থান প্রতিষ্ঠান শুধু একটি সরকারি অফিস হবে- এভাবে চিন্তা করলে এর গুরুত্ব বোঝা যাবে না। একে দেশের শ্রমবাজার দিকনির্দেশক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মতে আধুনিক কর্মসংস্থান সেবা জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান; এগুলো চাকরি প্রার্থীকে নিয়োগদাতার সঙ্গে যুক্ত করে, কর্মসংস্থান যোগ্যতা ও কর্ম ধরে রাখার সক্ষমতা বাড়ায় এবং শ্রমবাজারে প্রবেশ ও পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান উভয়কে সহায়তা করে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটির কাজ শুধু ‘চাকরি পেতে বা কর্মী পেতে সহায়তা’ নয়। এর প্রধান কাজ হবে শ্রমবাজারকে কার্যকর করা। একজন নাগরিকের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাকে এ ব্যবস্থা সহায়তা করবে-প্রথম চাকরিতে প্রবেশ, চাকরি হারানোর পর পুনঃপ্রবেশ, দক্ষতা পরিবর্তন, নতুন পেশায় রূপান্তর, বিদেশে কর্মসংস্থান কিংবা উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রেও। ফলে এটি শুধু এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ নয়; বরং একটি কর্মসংস্থান দিকনির্দেশনা এবং উত্তরণ ব্যবস্থা। এটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে কর্মসংস্থানে প্রবেশের মধ্যবর্তী সময় সংক্ষিপ্ত, সুসংগঠিত ও কার্যকর করতে সহায়তা করবে। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব আগ্রহ, দক্ষতা ও শ্রমবাজারের চাহিদার আলোকে ভবিষ্যৎ শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মজীবনের পরিকল্পনা প্রণয়নে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করবে।
কর্মসংস্থান ব্যবস্থাপনাকে একটি জীবনচক্র হিসেবে দেখতে হবে। আমাদের কর্মসংস্থান ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ paradigm shift প্রয়োজন। একজন মানুষকে প্রথমে ‘বেকার’ হিসেবে নিবন্ধন করে একটি শূন্য পদে ধরিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট নয়। তার Employment Journey হতে পারে- নিবন্ধন → মূল্যায়ন → ক্যারিয়ার নির্দেশনা → দক্ষতা উন্নয়ন → কর্ম মেলানো/রেফারেল → কর্মে প্রবেশ → কর্মে টিকে থাকা → পুনঃদক্ষতা অর্জন → কর্মজীবনে অগ্রগতি।
একটি কার্যকর ওয়ান-স্টপ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসে প্রথমে চাকরিপ্রার্থীর শিক্ষা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, আগ্রহ ও কর্মপছন্দ মূল্যায়ন করা হবে। এরপর যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের পথ নির্ধারণ করা হবে। কর্মের জন্য প্রস্তুত ব্যক্তিকে শূন্য পদের সঙ্গে যুক্ত করা, দক্ষতার ঘাটতি থাকলে চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং উদ্যোক্তা হতে আগ্রহীদের ব্যবসা উন্নয়ন, এসএমই সহায়তা ও অর্থায়নের সুযোগ দেওয়া হবে। বৈদেশিক কর্মসংস্থানপ্রত্যাশীদের বিএমইটির মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করা এবং আইসিটি ও ফ্রিল্যান্সিংয়ে আগ্রহীদের উপযুক্ত কর্মসূচিতে পাঠানো হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং ও পরিকল্পনার মাধ্যমে শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী ভবিষ্যৎ কর্মজীবন নির্ধারণে সহায়তা করা হবে।
এজন্য শ্রমবাজারের একটি তথ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি জরুরি। এটি ছাড়া সঠিক কর্মসংস্থান নীতি সম্ভব নয়। আমাদের জানা দরকার- কোথায় ভ্যাকেন্সি আছে? কোন পেশার চাহিদা বাড়ছে? কোন দক্ষতার চাহিদা কমছে? কোন জেলায় কী ধরনের কর্মী আছে? কোন শিল্প খাতে আগামী কয়েক বছরে কত জনবল প্রয়োজন হবে? কোন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির গ্র্যাজুয়েটরা চাকরি পাচ্ছে? কোন খাতে মজুরি বাড়ছে বা কমছে? এসব তথ্য ছাড়া প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা, শিক্ষা পরিকল্পনা কিংবা কর্মসংস্থান নীতি অনেকাংশে অনুমাননির্ভর হয়ে পড়ে। এ কারণেই একটি প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমবাজার তথ্য ব্যবস্থা অপরিহার্য। এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিস সেন্টারস এবং এমপ্লয়ী থেকে নিয়মিত শূন্য পদ ও পেশাগত ডেটা সংগ্রহপূর্বক জাতীয় পর্যায়ে একটি ডায়নামিক লেবার ডিমান্ড ম্যাপ তৈরি করতে হবে। এ তথ্যের আলোকে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হবে।
নিয়োগকর্তাকে অবশ্যই ব্যবস্থার কেন্দ্রে আনতে হবে। নিয়োগকর্তাকে এই ব্যবস্থার সমান গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হিসেবে দেখতে হবে। মানসম্মত চাকরির শূন্যপদ সংগ্রহ, প্রাথমিক প্রার্থী নির্বাচন, ইন্টারভিউ সহায়তা, বাছাইকরণ সহায়তা, জব ফেয়ার আয়োজন, চাকরিতে যোগদান ও প্রাথমিক অভ্যস্তকরণ প্রক্রিয়া এবং চাকরিতে প্রবেশের পরবর্তী সহায়তা পর্যন্ত আধুনিক জাতীয় কর্মসংস্থান সহায়তা কার্যক্রমের অংশ হতে পারে।
Public Employment Service বা Employment Support Service শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অন্যতম ম্যান্ডেট হওয়া সত্ত্বেও অদ্যাবধি গড়ে ওঠেনি। জাতীয় কর্মসংস্থান নীতি-২০২২ এবং শ্রম কমিশনের প্রতিবেদনে (২০২৫) কর্মসংস্থান কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পৃথক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গঠনের সুপারিশ রয়েছে। সর্বশেষ বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে বিষয়টি (এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ সেন্টার চালুকরণ) অগ্রাধিকার পাওয়ায় দ্রুত বাস্তবায়নের সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এখন। আশার কথা শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় কর্তৃক এটি দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে যা দেশবাসীর জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক একটি অধ্যায়।
বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে বিভিন্ন নামে ও কাঠামোয় পাবলিক এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিস চালু রয়েছে। এদের মধ্যে জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের মডেলগুলোকে অন্যতম সেরা দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে চীন, ভিয়েতনাম এবং ফিলিপাইন হলো উদ্বৃত্ত শ্রমের অর্থনীতিতে এই ব্যবস্থা কীভাবে পরিচালিত হয় তার চমৎকার উদাহরণ। এর মধ্যে ফিলিপাইনের PESO (Public Employment Service Office) মডেলটি বাংলাদেশের জন্য বেশ উপযোগী হতে পারে, কারণ ফিলিপাইনও বাংলাদেশের মতো একটি উদ্বৃত্ত শ্রমের অর্থনীতি যার অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ এবং রেমিট্যান্সের জন্য জনশক্তি রপ্তানির ওপর উচ্চ নির্ভরশীলতা রয়েছে। PESO মডেলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো কেন্দ্রীয় (DoLE) নীতিমালায় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সমন্বয়ে (Central Coordination with Local Delivery) বাস্তবায়ন। বর্তমানে সেখানে ১ হাজার ৫০০-এর মতো এ ধরনের সেন্টার চালু রয়েছে।
আমাদের দেশের জন্য কোন মডেল বা কাঠামো প্রযোজ্য হবে তা দেশের বিদ্যমান সরকারি-বেসরকারি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, শ্রমবাজারের বৈশিষ্ট্য ও সেবা প্রদানের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে। তবে কর্মসংস্থানসংক্রান্ত এ ধরনের একটি কার্যকর মেকানিজম গড়ে তুলতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের বিকল্প নেই। কাঠামো ও নাম যাই হোক না কেন, এটি দ্রুত চালু করা প্রয়োজন। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে NSDA, BEF, NCCWE, DYD, DTE, BMET-এর প্রতিনিধি সমন্বয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি কাউন্সিল বা কাঠামো থাকতে পারে; যার কাজ হবে জাতীয় নীতি প্রণয়ন ও কেন্দ্রীয় সমন্বয় ও পরিবীক্ষণ। উল্লিখিত অংশীজনের স্থানীয় প্রতিনিধি সমন্বয়ে পর্যায়ে জেলা বা স্থানীয় বাস্তবায়ন ও সমন্বয় কমিটি করা যেতে পারে। ILO, Dhaka-কে পর্যবেক্ষক হিসেবে রাখা যেতে পারে।
তরুণ ও বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সহায়তা ও এডিবি, বিশ্বব্যাংকের মতো উন্নয়ন অংশীদারদের সম্পৃক্ততায় পাইলট ভিত্তিতে ওয়ান স্টপ কর্মসংস্থানসেবা চালু করা যেতে পারে। পাইলটের অভিজ্ঞতা ও ফলাফল মূল্যায়নের মাধ্যমে ধাপে ধাপে এটিকে দেশব্যাপী টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় রূপ দিতে হবে। তবে এর কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করাকে শুরু থেকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
যুগ্মসচিব, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়