বদলে যাচ্ছে  বরিশালের মানচিত্র

বরিশাল প্রতিনিধি: বাপ-দাদার ভিটেমাটি বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। সন্ধ্যা নদীর ভাঙনে পাঁচ বছরে পাঁচবার বসতবাড়ি সরাতে হয়েছে বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার ইলুহার গ্রামের জয় হাজরার পরিবারকে। প্রতিবার নতুন করে ঘর বেঁধেছেন, গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন সংসার। কিন্তু নদীর ভাঙন থামেনি। এবার যে জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন, সেটিও কত দিন টিকবে, তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তিনি।

জয় হাজরার মতো বরিশালের নদী তীরবর্তী হাজারো মানুষ দিন কাটাচ্ছেন ভাঙন আতঙ্কে। কারও বসতঘর, কারও ফসলি জমি, আবার কারও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিলীন হচ্ছে নদীগর্ভে। ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে অনেক পরিবার হারাচ্ছে নতুন করে ঘর বাঁধার শেষ আশ্রয়টুকুও।

বরিশালের মেঘনা, কালাবদর, তেঁতুলিয়া, সন্ধ্যা, সুগন্ধা, কীর্তনখোলা, পাণ্ডব ও আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙনে একের পর এক বসতবাড়ি, বাজার, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা ও ফসলি জমি বিলীন হচ্ছে। এতে বদলে যাচ্ছে এ অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি ও জনপদের চিত্র। মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় নদীভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মেঘনা, কালাবদর ও তেঁতুলিয়া নদী তীরবর্তী চরগোপালপুর ও আলিমাবাদ ইউনিয়নে মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে ৮০টি বসতঘর এবং বাজারের প্রায় ৪০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া গোবিন্দপুর, চর মিঠুয়া, দড়িরচর খাজুরিয়া, আদর্শনগর, আন্দারমানিক, জাঙ্গালিয়া ও দক্ষিণ উলানিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।

বাবুগঞ্জ উপজেলাতেও সন্ধ্যা, সুগন্ধা ও আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙনে সড়ক, বেড়িবাঁধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, কবরস্থান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ শতাধিক বসতঘর বিলীন হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। মীরগঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় একাধিক গ্রাম হুমকির মুখে পড়েছে। ক্ষুদ্রকাঠী এলাকায় নদীভাঙন বরিশাল বিমানবন্দরের দক্ষিণ পাশের নিরাপত্তাপ্রাচীরের প্রায় ৬০০ মিটারের কাছাকাছি চলে এসেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বানারীপাড়ার জয় হাজরা বলেন, ‘সন্ধ্যা নদীর ভাঙনে বাপ-দাদার সব সম্পত্তি চলে গেছে। গত পাঁচ বছরে আমাদের পরিবার পাঁচবার বসতবাড়ি সরিয়েছে। এখন যেখানে আছি, সেটি এ বছর টিকে গেলেও আগামী বছর থাকবে কি না, জানি না।

বরিশাল সদর উপজেলার চরবাড়িয়া, চরমোনাই ও শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নেও ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। গত দেড় দশকে চরবাড়িয়া ইউনিয়নের লামচরী গ্রামের কয়েক শ’ পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের বাসিন্দা করিম হাওলাদার বলেন, ফসলি জমি ও ভিটেমাটি— সবই নদীর ভাঙনে চলে গেছে। ভাঙন শুরু হলে সহজে থামতে চায় না। আমাদের অবস্থা এখন খুবই খারাপ। নদী ভাঙনের ভয়াবহতা তুলে ধরে মুলাদী উপজেলার কৃষক আবুল ফজল বলেন, চোখের সামনে নিজের বসতভিটা ভাঙনে চলে গেছে। ভোররাতে যদি টের না পেতাম, তাহলে হয়তো আমরাও বেঁচে ফিরতে পারতাম না। হিজলা উপজেলার স্কুল শিক্ষক জয়নাল মৃধা বলেন, এভাবে ভাঙন চলতে থাকলে একসময় বরিশালের মানচিত্রই বদলে যাবে। ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য তিনি পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতি আহ্বান জানান।

বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ৩৮টি নদ-নদী রয়েছে। এসব নদ-নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৭১৬ কিলোমিটার। এর মধ্যে আটটি নদীর প্রায় ৬০ কিলোমিটার এলাকায় ভাঙন চলছে। ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা বেশি। ভাঙন মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে বিভিন্ন এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে।

বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জাবেদ ইকবাল বলেন, ভাঙনপ্রবণ এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে। এছাড়া স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে একটি প্রকল্প প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে স্থায়ী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ করা যাবে।