মশিউর রহমান শাওন: পণ্য সময়মতো পৌঁছায়নি। গ্রাহক অভিযোগ জানালেন কোম্পানির কাছে। ফিরতি বার্তা এলো দ্রুত, ভাষাও ভদ্র। সমস্যার সমাধানের আশ্বাসও দেওয়া হলো। তবু গ্রাহকের অসন্তোষ কাটল না। কারণ, তার মনে হলো, অভিযোগের উত্তর দেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার সমস্যাটি যেন কেউ সত্যিকার অর্থে বোঝেনি। এমন অভিজ্ঞতা এখন ডিজিটাল ব্যবসায়িক যোগাযোগে অচেনা নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের ফলে কোম্পানিগুলো আগের চেয়ে দ্রুত গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছে। কিন্তু দ্রুত উত্তর দেওয়াই কি ভালো যোগাযোগের শেষ কথা? নাকি গ্রাহকের কথা বোঝা, তার উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা তৈরি করাও সমান জরুরি?
বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশে প্রশ্নটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। গ্রাহকসেবা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট তৈরি, গ্রাহকের মতামত বিশ্লেষণ এবং নিয়মিত বার্তা পাঠানোর মতো কাজে এআই ব্যবহারের সুযোগ বাড়ছে। এতে সময় ও খরচ সাশ্রয়ের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হচ্ছে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান যখন এআইয়ের মাধ্যমে গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলে, তখন সেই কথার যথার্থতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার-সেটিও ভেবে দেখা প্রয়োজন।
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছে এআইয়ের আকর্ষণ স্পষ্ট। বিশেষ করে ব্যাংক, টেলিযোগাযোগ, ই-কমার্স ও আর্থিক সেবার মতো খাতে, যেখানে প্রতিদিন অসংখ্য গ্রাহকের প্রশ্ন ও অভিযোগ সামলাতে হয়, সেখানে এ ধরনের প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। উদাহরণ হিসেবে দেখানো যায় সিটি ব্যাংকের একটি চ্যাটবট। ব্যাংকটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চ্যাটবটটি প্রতিদিন কল সেন্টারে আসা প্রায় ৩ হাজার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, যা মোট প্রশ্নের প্রায় অর্ধেক। অন্যদিকে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকও ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ‘মিতা’ নামক দেশের প্রথম এআই-চালিত মানবসদৃশ ভার্চুয়াল রিলেশনশিপ ম্যানেজার চালু করেছে।
কিন্তু মনে করা উচিত যোগাযোগ মানে শুধু তথ্য সরবরাহ নয়। পণ্য পৌঁছাতে দেরি হওয়া, অপ্রত্যাশিতভাবে টাকা কেটে নেওয়া কিংবা লেনদেন ব্যর্থ হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে গ্রাহক শুধু একটি উত্তর চান না; তিনি চান তার সমস্যাটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হোক। একটি স্বয়ংক্রিয় বার্তা নিয়মমাফিক তথ্য দিতে পারে, কিন্তু জটিল পরিস্থিতিতে সেই তথ্য যথেষ্ট কি না, তা বোঝার জন্য প্রয়োজন প্রেক্ষাপট বিবেচনা ও উপযুক্ত সিদ্ধান্ত।
এ বিষয়ে গবেষণাও গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৫ সালে পাবলিক রিলেশন্স রিভিউ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় করপোরেট সংকটের সময় ক্ষমা চাওয়ার বার্তার প্রতি মানুষের প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করা হয়। গবেষণাটিতে দেখা যায়, একই ধরনের বার্তাকে মানুষের লেখা বলে উপস্থাপন করা হলে সেটি এআইয়ের লেখা বলে উপস্থাপিত বার্তার তুলনায় বেশি আন্তরিক বলে বিবেচিত হয়েছিল। এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা এবং প্রতিষ্ঠানকে ক্ষমা করার প্রবণতারও সম্পর্ক পাওয়া যায়। অর্থাৎ, সংকটের সময় শুধু কী বলা হচ্ছে, তা নয়; কে বলছে বলেও গ্রাহকের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
২০২৬ সালে করপোরেট কমিউনিকেশনস: অ্যান ইন্টারন্যাশনাল জার্নালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় এআই ও মানুষের তৈরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির প্রতি পাঠকের প্রতিক্রিয়া তুলনা করা হয়। গবেষণায় মানুষের লেখা বিজ্ঞপ্তি উৎসের বিশ্বাসযোগ্যতা, বার্তার গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রতিষ্ঠানের সুনামের মূল্যায়নে তুলনামূলকভাবে ভালো ফল পেয়েছিল। তবে এসব ফলাফলকে সব ধরনের এআই যোগাযোগের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। বরং এগুলো মনে করিয়ে দেয়, প্রযুক্তির দক্ষতার পাশাপাশি বার্তার বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য এই প্রশ্নের বাস্তব তাৎপর্য রয়েছে। একটি চ্যাটবট গ্রাহককে অ্যাকাউন্টের সাধারণ তথ্য জানাতে বা নিয়মিত প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। কিন্তু কোনো গ্রাহকের টাকা হারিয়ে গেলে, ভুল পণ্য পৌঁছালে কিংবা জটিল অভিযোগের সমাধান না হলে শুধু পূর্বনির্ধারিত উত্তর যথেষ্ট নাও হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে গ্রাহকের সমস্যার গুরুত্ব বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত মানবকর্মীর কাছে অভিযোগ পৌঁছে দেওয়া জরুরি।
আর্থিক খাতে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। বাংলাদেশ ব্যাংকের আইসিটি নিরাপত্তা নির্দেশিকায় এআই ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত সম্ভাব্য ঝুঁকির মধ্যে মানহানি, আর্থিক ক্ষতি এবং মানুষের আস্থা কমে যাওয়ার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। ভুল ফলাফল, ত্রুটিপূর্ণ অ্যালগরিদম কিংবা পক্ষপাতদুষ্ট তথ্যের কারণে সমস্যা তৈরি হতে পারে বলেও নির্দেশিকায় সতর্ক করা হয়েছে। এসব ঝুঁকি সামলাতে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ও মানুষের বিচারবোধের গুরুত্বও তুলে ধরা হয়েছে।
এআই ব্যবহারের নীতিগত দিকটিও বাংলাদেশে গুরুত্ব পাচ্ছে। জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিমালা ২০২৬ থেকে ২০৩০-এর খসড়ায় দায়িত্বশীল এআই ব্যবহারের কাঠামো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এ ধরনের নীতিগত উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোরও নিজেদের ব্যবহারের নিয়ম স্পষ্ট করা প্রয়োজন। কোন ক্ষেত্রে এআই সরাসরি গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করবে, কখন মানুষের অনুমোদন প্রয়োজন হবে এবং গ্রাহকের তথ্য কীভাবে সুরক্ষিত রাখা হবে-এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত থাকা দরকার।
এআই বাংলাদেশের করপোরেট যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। তবে প্রযুক্তি যতই দক্ষ হোক, গ্রাহকের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং সেই সম্পর্কের দায় নেওয়ার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানেরই।