নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: নোবেলবিজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ রবার্ট লুকাস বলেছিলেন, প্রচলিত অর্থনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশে সস্তা শ্রম ও মূলধনের স্বল্পতার কারণে সেখানে বিনিয়োগের রিটার্ন বেশি হওয়ার কথা এবং স্বাভাবিকভাবেই বিদেশি পুঁজি বা বিনিয়োগ সেখানে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটে না, কারণ শুধু সস্তা শ্রম বা কাঁচামাল থাকলেই বিনিয়োগ আসে না; বরং দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য একটি দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, শক্তিশালী আইনি পরিকাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক গুণমান (ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি) এবং নির্ভরযোগ্য আর্থিক নীতি থাকা আবশ্যক।
১৯৯০ সালে তার প্রকাশিত তার বিখ্যাত ‘Why Doesn't Capital Flow from Rich to Poor Countries?’ শীর্ষক গবেষণাপত্রের সে তত্ত্ব বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শতভাগ সত্য প্রমাণিত। কারণ স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে উল্লেখ্যযোগ্য কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। বিভিন্ন সময়ে সরকার পরিবর্তন হয়েছে; তারা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের নানা পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে কিন্তু সেগুলো খুব একটা প্রভাব রাখেনি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বিভিন্ন দেশে রোড শো বা বিনিয়োগ সম্মেলন করেছে কিন্তু সেগুলোর কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। বরং বিদায়ী অর্থবছরে বিদেশি বিনিয়োগে কিছুটা ধস নেমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমন চিত্রই উঠে এসেছে। এতে দেখা যাচ্ছে, গত অর্থবছর দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমেছে ১২ শতাংশের বেশি। এখানেই শেষ নয়, অর্থবছরের শেষ ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) ফ্রেশ এফডিআই আসা অনেকটাই কমে গেছে। এমনকি শেষ তিন মাসে (এপ্রিল-জুন) বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফা পুনঃবিনিয়োগ প্রবণতাও হ্রাস পেয়েছে।
অর্ধযুগ তথা গত ছয় বছরের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, দেশে এফডিআই প্রবাহ মোটামুটি দেড় বিলিয়ন ডলারের আশপাশেই ঘুরপাক খাচ্ছে। যদিও এ সময় বাংলাদেশ বিনিয়োগ বোর্ডকে (বিওইআই) বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (বিডা) রূপান্তর করা হয়। সম্প্রতি তার সঙ্গে আরও দুটি সংস্থাকে যুক্ত করে ইনভেস্ট বাংলাদেশ গঠন করা হয়েছে। এছাড়া বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ওয়ান স্টপ সার্ভিসসহ নানা বিষয় চালুর কথা বলা হয়েছে। তবে বিনিয়োগকারীরা এসবের কোনো সুবিধা বাস্তবে পান না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছর দেশে নিট এফডিআই এসেছে প্রায় ১ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন (১৪৮ কোটি) ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছর এর পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন বা ১৬৯ কোটি ডলার। অর্থাৎ গত অর্থবছর দেশে এডিআই প্রবাহ কমেছে প্রায় ২১ কোটি ডলার বা ১২ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছর এফডিআই এসেছিল ১ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছর ১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন, ২০২১-২২ অর্থবছর ১ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ও ২০২০-২১ অর্থবছর ১ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এফডিআই ২ বিলিয়ন ডলারের ঘরে পৌঁছাতে পারছে না।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, দেশের ভেতরেই বিনিয়োগ কমে গেছে এবং অভ্যন্তরীণ খাতে ঋণের কোনো চাহিদা নেই। দেশীয় বিনিয়োগ না বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগকারী বা উদ্যোক্তারা আকৃষ্ট হবেন না। এছাড়া বিদেশি বিনিয়োগ আসার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক পরিবেশের স্থিতিশীলতা হলো সবচেয়ে বড় ও প্রাথমিক মাপকাঠি। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না ফেরা পর্যন্ত দেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশে নিট এফডিআই এসেছে ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ডলার, যা আগের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় প্রায় ১০ কোটি ৪ লাখ ডলার কম। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে ২২ দশমিক ৪৪ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে নিট এফডিআই ছিল ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলার। তবে গতবছর এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে বিদেশি বিনিয়োগের আসার পরিমাণ আরও খারাপ ছিল। ২০২৫ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশে নিট এফডিআই এসেছিল ৩০ কোটি ৭৬ লাখ ডলার। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে প্রবাহ বেড়েছে ১২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
এদিকে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এফডিআইয়ের তিনটি প্রধান অঙ্গ ইক্যুইটি মূলধন, পুনঃবিনিয়োগকৃত আয় ও আন্তঃকোম্পানি ঋণ সব খাতেই নিট প্রবাহ কমেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ কমেছে আন্তঃকোম্পানি ঋণ। এ খাতে জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় ৬৭ দশমিক ০৪ শতাংশ কমে ৮৬ লাখ ১০ হাজার ডলারে নেমেছে। পুনঃবিনিয়োগ প্রবাহ ২৩ দশমিক ৯২ শতাংশ কমে ২৬ কোটি ৯ লাখ ডলার হয়েছে। আর ইক্যুইটি মূলধনে নিট বিনিয়োগ ১ দশমিক ০৭ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৭৪ লাখ ডলারে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, নির্বাচনের পরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিছুটা কাটলেও নীতিগত অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। ফলে বিনিয়োগের ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি ও উচ্চব্যয়, দুর্বল অবকাঠামো, প্রশাসনিক জটিলতা এবং দুর্বল ব্যাংকিং খাতও প্রকল্পের খরচ ও অনিশ্চয়তা বাড়ায়। তাই বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাসের জন্য কোনো একটি কারণকে একমাত্র হিসেবে দায়ী করা ঠিক হবে না।
তিনি বলেন, এফডিআই কমলে নতুন কর্মসংস্থান, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানান্তরের সুযোগ সীমিত হতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহেও চাপ বাড়তে পারে, যদিও এফডিআইয়ের প্রভাব তাৎক্ষণিক নয়। তাই সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত নীতির ধারাবাহিকতা, দ্রুত অনুমোদন, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি ও বন্দরসেবা এবং চুক্তি বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। বিনিয়োগের ঘোষণা নয়, বাস্তবায়িত প্রকল্প ও নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ বাড়ানোই হবে সাফল্যের মাপকাঠি।
এফডিআই আসায় শীর্ষে সিঙ্গাপুর, খাত হিসেবে শীর্ষে বিদ্যুৎ
২০২৫-২৬ অর্থবছর দেশভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি নিট বিনিয়োগ এসেছে সিঙ্গাপুর থেকে। এরপর রয়েছে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া। আর খাতভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ এসেছে বিদ্যুৎ খাতে। এরপর রয়েছে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক এবং ব্যাংকিং খাত।
গত অর্থবছর দেশভিত্তিক হিসাবে সিঙ্গাপুর থেকে বিনিয়োগ এসেছে ২৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলার, চীন দেশটি থেকে এসেছে ২০ কোটি ৭৪ লাখ ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে এসেছে ১৯ কোটি ১৯ লাখ ডলার। এছাড়া হংকং থেকে ১৮ কোটি ৩৭ লাখ ডলার, যুক্তরাজ্য থেকে ১৭ কোটি ৫৫ লাখ, নেদারল্যান্ডস থেকে ১৬ কোটি ৭১ লাখ, ভারত থেকে ১২ কোটি ২৯ লাখ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার নিট বিনিয়োগ এসেছে।
অন্যদিকে খাতভিত্তিক হিসাবে বিদ্যুৎ খাতে নিট এফডিআই এসেছে ৪১ কোটি ৩৮ লাখ ডলার, বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতে এসেছে ৩১ কোটি ২৯ লাখ ডলার এবং ব্যাংকিং খাতে নিট বিনিয়োগ এসেছে ১৫ কোটি ৬৪ লাখ ডলার। এছাড়া অন্যান্য সেবা খাতে ১৩ কোটি ৯১ লাখ এবং বাণিজ্য খাতে ১২ কোটি ৯২ লাখ ডলারের নিট বিনিয়োগ এসেছে।
এফডিআই স্টকে শীর্ষে যুক্তরাজ্য, খাত হিসেবে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক
বাংলাদেশে এফডিআই স্টকে (মোট স্থিতি) সবচেয়ে বড় অংশ যুক্তরাজ্যের। অন্যদিকে খাতভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি বিদেশি বিনিয়োগ রয়েছে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতে। এরপর রয়েছে বিদ্যুৎ ও ব্যাংকিং খাত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুন শেষে বাংলাদেশে এফডিআই স্টক দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যের এফডিআই স্টকের পরিমাণ ৩২৪ কোটি ১৭ লাখ ডলার। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চীনের বিনিয়োগের স্থিতি ছিল ২৪৯ কোটি ৬২ লাখ ডলার ও সিঙ্গাপুরের ২৪৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার ১৯৩ কোটি ৮৯ লাখ ডলার, নেদারল্যান্ডসের ১৯১ কোটি ৪১ লাখ, হংকংয়ের ১৪০ কোটি ৯১ লাখ, যুক্তরাষ্ট্রের ১০৭ কোটি ৭৮ লাখ এবং ভারতের ৯৭ কোটি ৬ লাখ ডলারের এফডিআই স্টক ছিল।
খাতভিত্তিক হিসাবে, জুন শেষে সবচেয়ে বেশি ছিল বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতে বিদেশি বিনিয়োগের স্থিতি দাঁড়ায় ৪৬৮ কোটি ২০ লাখ ডলার। বিদ্যুৎ খাতে এফডিআই স্টকের পরিমাণ ৩৪৬ কোটি ১৮ লাখ ডলার এবং ব্যাংকিং খাতে ৩১১ কোটি ৮৫ লাখ ডলার। এছাড়া টেলিযোগাযোগ খাতে ১৩৭ কোটি ২০ লাখ এবং তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে ১১৪ কোটি ৯০ লাখ ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ স্থিতি ছিল।