ক্রীড়া প্রতিবেদক: বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের সামনে চ্যালেঞ্জটা ছিল বড়। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথমবার ওয়ানডে খেলতে নেমে ইতিহাস গড়ার সুযোগ ছিল নিগার সুলতানা জ্যোতিদের সামনে। কিন্তু ব্রিসবেনের অ্যালান বোর্ডার ফিল্ডে সেই উপলক্ষ স্মরণীয় হয়ে থাকল না। ব্যাটিংয়ে ধীরগতির শুরু, মাঝের ওভারগুলোতে উইকেট হারানো এবং প্রতিপক্ষের রান তাড়ায় কার্যকর চাপ তৈরি করতে না পারা— সব মিলিয়ে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের প্রথমটিতে ৭ উইকেটের হার দিয়ে যাত্রা শুরু করল বাংলাদেশ।
গতকাল টস হেরে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশের ইনিংসের শুরুটাই ছিল বিপর্যস্ত। ইনিংসের প্রথম বলেই মেগান শুটের শিকার হয়ে ফেরেন ফারজানা হক। তৃতীয় ওভারে আরেক ওপেনার শারমিন সুলতানার বিদায়ে স্কোরবোর্ডে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় মাত্র ১১ রান, হারায় ২ উইকেট। শুরুতেই এমন ধাক্কা সামলে ওঠার দায়িত্ব নিতে হয় পরের ব্যাটারদের।
শারমিন আক্তার পাল্টা আক্রমণে পরিস্থিতি বদলানোর চেষ্টা করেন। ২৬ বলে ২৪ রান করে তার বিদায় নেওয়ার পর আবারও চাপে পড়ে বাংলাদেশ। সোবহানা মুশতারির ব্যাট থেকেও আসেনি প্রত্যাশিত রান। একদিকে নিয়মিত উইকেটের পতন অন্যদিকে রান তোলার গতি ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ— দুইয়ের চাপে বড় সংগ্রহের সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসে।
এমন পরিস্থিতিতে হাল ধরেন অধিনায়ক নিগার সুলতানা ও স্বর্ণা আক্তার। তাদের ৩৫ রানের জুটি দলকে কিছুটা স্থিতি এনে দিলেও তা বড় ইনিংসের ভিত গড়ার জন্য যথেষ্ট হয়নি। ৮৬ বলে ২৯ রান করে নিগারের বিদায়ের পর ৫০ বলে ২১ রান করে ফিরে যান স্বর্ণাও। অধিনায়কের ইনিংসে ধৈর্য ছিল কিন্তু রান তোলার গতি বাড়ানোর সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ।
শেষ দিকে রিতু মনি ও নাহিদা আক্তারের জুটি বাংলাদেশের ইনিংসে যোগ করে লড়াইয়ের সামান্য অবলম্বন। অষ্টম উইকেটে ৫৮ বলে ৩৭ রান যোগ করেন তারা। এর আগে স্বর্ণার বিদায়ের পরও ইনিংস টেনে নেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন রিতু। ৬৩ বলে ৪৫ রান করে রানআউট হওয়ার আগে তিনিই হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহক। তার এই ইনিংসের সুবাদে একসময় বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়া বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত ১৬৬ রানে পৌঁছায়। তবে ইনিংস শেষ হয় ৪৯.৪ ওভারেই হাতে থাকে মাত্র ২ বল।
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে বল হাতে সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিলেন অ্যানাবেল সাদারল্যান্ড। ৯.৪ ওভারে ৩০ রান দিয়ে ৪ উইকেট তুলে নিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপের ওপর বড় আঘাত হানেন তিনি। বাংলাদেশের ইনিংসে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট পড়ার পেছনে অস্ট্রেলীয় বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়েরও বড় ভূমিকা ছিল।
১৬৭ রানের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমে অস্ট্রেলিয়াও শুরুতে একটি উইকেট হারায়। অভিষিক্ত ১৭ বছর বয়সি হাবিবা ইসলাম পিংকি জর্জিয়া ভলকে ফিরিয়ে বাংলাদেশকে প্রথম সাফল্য এনে দেন। পরে ফোবি লিচফিল্ড ও এলিস পেরির জুটি ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়। মাত্র ৬৭ বলে ৮৯ রান যোগ করে তারা অস্ট্রেলিয়াকে জয়ের খুব কাছে নিয়ে যান।
লিচফিল্ডের ব্যাটিং ছিল বাংলাদেশের বোলারদের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা। ৫৭ বলে ৭৭ রানের ঝোড়ো ইনিংসে তিনি মারেন ১০টি চার ও একটি ছক্কা। ওয়ানডে ক্যারিয়ারের চতুর্থ সেঞ্চুরির সম্ভাবনা তৈরি করলেও তিন অঙ্ক ছোঁয়ার আগেই রাবেয়া খানের বলে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন তিনি। এরপর হাবিবা ইসলাম পিংকি ফিরিয়ে দেন বেথ মুনিকেও। ফারজানা হক পিংকির দারুণ ক্যাচে শেষ হয় মুনির ১৩ রানের ইনিংস।
পরপর দুই উইকেট হারিয়ে অস্ট্রেলিয়া কিছুটা থমকালেও ম্যাচে ফেরার মতো চাপ তৈরি করতে পারেনি বাংলাদেশ। এলিস পেরি ও অ্যানাবেল সাদারল্যান্ড বাকি পথ অনায়াসে পাড়ি দেন। পেরি ৪৫ বলে ২৬ রানে অপরাজিত থাকেন আর সাদারল্যান্ড ২৩ বলে ২৫ রান করে অপরাজিত থেকে দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন। ২৬ ওভার পূর্ণ হওয়ার আগেই ৭ উইকেট হাতে রেখে জয় নিশ্চিত করে স্বাগতিকরা।
বাংলাদেশের জন্য এই ম্যাচে ইতিবাচক দিক খুঁজতে গেলে রিতু মনির দায়িত্বশীল ব্যাটিং এবং হাবিবা ইসলাম পিংকির অভিষেকেই দুটি উইকেট পাওয়ার কথা বলতে হয়। তবে বিচ্ছিন্ন কিছু ব্যক্তিগত সাফল্য দলীয় দুর্বলতা আড়াল করতে পারেনি। ব্যাটিংয়ে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বড় জুটি গড়তে না পারা এবং প্রতিপক্ষের রান তাড়ার সময় ধারাবাহিক চাপ ধরে রাখতে ব্যর্থ হওয়াই ব্যবধান গড়ে দিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২০২০ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলেছিল বাংলাদেশ। তবে দেশটির মাটিতে এবারই প্রথম ওয়ানডে খেলতে নামল বাংলাদেশের মেয়েরা। ঐতিহাসিক এই ম্যাচে প্রত্যাশিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে না পারায় সিরিজের শুরুতেই পিছিয়ে পড়ল দলটি। আগামীকাল রোববার একই মাঠে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে মাঠে নামবে বাংলাদেশ।