রূপসী বাংলার নিঃসঙ্গ নির্জন কবি

নাসির আহমেদ: এই রচনার শিরোনামের বিশেষণের মধ্যেই নিহিত আছে জীবনানন্দ দাশের কবি-সত্তার স্বরাট সার্বভৌম মৌলিকত্বের স্বরূপ। ‘রূপসী বাংলা’ তার বহুল আলোচিত এবং পাঠকনন্দিত কাব্যগ্রন্থ, যা তার মৃত্যুর তিন বছর পরে প্রকাশিত— না ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থের কবি হিসেবে এই শিরোনামে কবিকে বিশেষিত করিনি। আবহমান বাংলার অবারিত সবুজ শ্যামল প্রকৃতির প্রতি গভীর আসক্ত একজন প্রকৃতিপ্রেমী বাঙালি, যিনি বৃহত্তর বাংলাকে ভালোবেসে ছিলেন গভীরভাবে, তাকেই চিহ্নিত করার লক্ষ্যে এই শিরোনাম। মাতৃভূমি বাংলার রূপ ঐশ্বর্যের মুগ্ধ একজন কবি হিসেবে জীবনানন্দ দাশকে রূপসী বাংলার কবি হিসেবে ভাবতে চাই আমি। আর নিঃসঙ্গ নির্জন শব্দ যুগল তাও কবির স্বতন্ত্র এক কাব্যভূগোল সৃষ্টির অসামান্য প্রতিভার গৌরবকেই ধরতে চেয়েছি। কারণ সত্যিকার অর্থেই তিনি নিঃসঙ্গ। তার মত এমন কবি বাংলা ভাষায় দ্বিতীয় আরেকজন নেই। নির্জনতার মধ্যেই তিনি নিজেকে অনুভব করেছেন সবসময়। সব লোকের ভিড়ে বসেও তিনি একাকীত্বকে যাপন করেছেন। কতটা সার্বভৌম কবি তিনি, তা নিজে যেমন জানতেন, কবিজীবনের সূচনায়ই সদর্পে তা পাঠকদেরও জানিয়েছেন কবিতার কথা শিরোনামের প্রবন্ধ গ্রন্থে। আর তাইতো লিখতে পেরেছিলেন: 

‘কেহ যাহা জানে নাই, কোন এক বাণী 
              আমি বয়ে আনি;
আমি তাই আসিয়াছি, আমার মতন 
             আর নাই কেউ।’

এই দর্পিত উচ্চারণ অক্ষরে অক্ষরে সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন তিনি তার তুলনারহিত মৌলিক কবিতামালায়। অথচ চির লাজুক কবি জীবনানন্দ দাশ তার জীবদ্দশায় বাহ্যিকভাবে ছিলেন একেবারেই অন্তর্মুখীন, অনেকটাই যেন সমাজবিচ্ছিন্ন। সমকালীন কবি সাহিত্যিক এবং সহকর্মীদের উপেক্ষার শিকার হয়েছেন আজীবন। কবি সম্পাদক বুদ্ধদেব বসু ছাড়া বলতে গেলে আর কেউ জীবনানন্দ দাশকে সঠিক মূল্যায়ন করেননি। জীবদ্দশায় যিনি ছিলেন চরমভাবে উপেক্ষিত বঞ্চিত, সেই জীবনানন্দ দাশই পরবর্তীকালে হয়ে উঠেছেন বাংলা কবিতার অপ্রতিরোধ্য অতুলনীয় পাঠকনন্দিত কবি। শুধু পাঠকনন্দিত কবি বললেও যথার্থ হয় না, তিনি এ দেশের কবিদেরও কবি হয়ে উঠেছেন। মাইকেল থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলাম পর্যন্ত বিপুল পাঠকনন্দিত যে কবিদের নাম সর্বজনবিদিত তারাও কেউ পরবর্তীকালে বাংলা কবিতাকে জীবনানন্দের মতো এত দীর্ঘকাল প্রভাবিত করতে পারেননি। আধুনিক বাংলা কবিতা বলতে গেলে গত ৬০ থেকে ৭০ বছর ধরে জীবনানন্দ দাশেরই এক্সটেনশন বহন করে চলেছে। পাঠকনন্দিত কবি হিসেবে যারা সুখ্যাতি অর্জন করেছেন, তাদের অধিকাংশই জীবনানন্দের ছায়ায় নিজেদের বিকশিত করেছেন।

নানা কারণে জীবনানন্দ পৃথক ভূগোলের বাসিন্দা। বাংলা কবিতায় রবীন্দ্রনাথ, নজরুল জসীমউদদীনসহ অনেকেই প্রকৃতিকে ব্যবহার করেছেন নানাভাবে, কিন্তু বিস্ময়করভাবে জীবনানন্দ বাংলার প্রকৃতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন তার কবিতায়। নতুন চোখে দেখেছেন আবহমান বাংলার রূপের ঐশ্বর্যকে। সম্ভবত সে কারণেই ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’ বলে পরিচিত কবি পৃথিবীর আর কোন রূপ দেখতে চাননি। মৃত্যুর পরেও এই মায়াময় মাতৃপ্রকৃতির কাছে, বাংলার এই সবুজ শ্যামল সৌন্দর্যের কাছে ফিরে আসার আকুতি প্রকাশ করেছেন। 

তার সব কাব্যগ্রন্থেই বাংলাদেশের প্রকৃতি বহুমাত্রিকতা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। কিন্তু মৃত্যুর তিন বছর পরে প্রকাশিত ‘রূপসী বাংলা’ সত্যিকার অর্থেই বাংলার মুখের প্রতিমা রূপে উদ্ভাসিত— কাব্যগ্রন্থের সঙ্গে তার আর কোন কাব্যের তুলনা হয় না অন্তত প্রকৃতি এবং বাংলাদেশের রূপৈশ্বর্যের প্রশ্নে। ১৯৩২ সালে রচিত এই বইটির কবিতাগুলো পাণ্ডুলিপি করে সাজিয়েছিলেন কবি স্বয়ং, (যদিও কাব্যগ্রন্থের শিরোনাম তিনি দেননি) কিন্তু কী দ্বিধায় এমন মৌলিক অসামান্য কবিতা মালা অপ্রকাশিত ফেলে রেখেছেন রেখে গেছেন তোরঙ্গবন্দি করে! এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয় যে, জীবনানন্দ দাশ এবং কাজী নজরুল ইসলাম একই সালে (১৮৯৯) জন্মগ্রহণ করা সত্ত্বেও কবি হিসেবে অতি তরুণ বয়সেই কাজী নজরুল ইসলাম সারা বাংলায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। জানি না সে কারণেই কিনা কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা তরুণ জীবনানন্দ দাশকে কবিতা চর্চার প্রাথমিক দিনগুলিতে বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছিল। যে কারণে জীবনানন্দ দাশের প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’-এ শব্দ ব্যবহার এবং আঙ্গিকের দিক থেকেও একেবারেই নজরুলাক্রান্ত। নজরুলের কবিতায় ব্যবহৃত বহু শব্দ, চরণের বিন্যাস, অন্ত্যমিল মধ্যমিলে বহু সাদৃশ্য লক্ষণীয়। যদিও অসামান্য প্রতিভাবান ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ও পরবর্তীকালে ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক জীবনানন্দ দাশ নিজের কবিতাকে আমূল বদলে নিয়েছিলেন অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে। নজরুল থেকে তিনি এতটাই দূরে সরে গিয়েছিলেন যে, তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ এবং দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থের কবি যে একই কবি, সেটা মিলানো এখনও অসম্ভব প্রায়।

১৯২৭ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’ প্রকাশিত হয়। তার ৯ বছর পর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ প্রকাশিত হয় ১৯৩৬ সালে। এই নয় বছরের ব্যবধানে কবি জীবনানন্দ দাশ প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকে আমূল বদলে নিয়েছিলেন নিজেকে। প্রথম কাব্যগ্রন্থে কাজী নজরুল ইসলামের ছায়া প্রবলভাবে তাকে তাড়িত করেছে আঙ্গিক এবং শব্দ প্রয়োগে। কিন্তু ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’র মধ্য দিয়ে সক্রিয় সত্তায় এক সার্বভৌম কবির আবির্ভাব লক্ষ্য করি আমরা। যেমন ভাষার নতুনত্বে তেমনি আঙ্গিকের পরিবর্তনে প্রলম্বিত ২২ এবং ২৬ মাত্রার অক্ষরবৃত্তে বাংলা কবিতার ভূগোলকে তিনি বিপুলভাবে সম্প্রসারিত করে দিয়েছেন ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ এবং ‘বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থে। ‘মহাপৃথিবী’তে আরও সম্প্রসারিত হয়েছে তার কাব্যের ভূগোল।

জীবদ্দশায় প্রকাশিত সবচেয়ে আলোচিত কাব্যগ্রন্থ ‘বনলতা সেন’ প্রকাশিত হয় ১৯৪২ সালে। ‘মহাপৃথিবী’ ১৯৪৪ এবং ‘সাতটি তারার তিমির’ প্রকাশিত হয় ১৯৪৮ সালে। 

কিন্তু সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী যে কাব্যগ্রন্থ ‘রূপসী বাংলা’— সেই কাব্যগ্রন্থ পাণ্ডুলিপি আকারে তৈরি হয়েছিল তার মৃত্যুর অনেক আগেই। কিন্তু কেন তিনি তা প্রকাশ করেননি সে এক অমীমাংসিত রহস্য।

বাংলার সবুজ শ্যামল প্রকৃতিকে তার মত করে আর কেউ কখনও অবলোকন করেছিলেন বলে মনে হয় না। অন্তত রূপসী বাংলা কবিতাগুলো পড়তে পড়তে এ কথাই মনে হবে সচেতন পাঠকের। এত যে আলোচিত ধানসিঁড়ি নদীর কথা, সেই খবর আমরা প্রথম পাই রূপসী বাংলায়। অবিভক্ত বাংলার পূর্ববঙ্গের বরিশাল জেলার ঝালকাঠি মহকুমার রাজাপুর থানার শুক্তাগড় ইউনিয়নের বামুনকাঠি গ্রামের দাস বাড়িতে জন্মগ্রহণকারী কবি জীবনানন্দ দাশ জন্মেছিলেন খাল-নদী, ঝোপঝাড় বেষ্টিত এক অবারিত সবুজের মধ্যে। এমন এক ঘন সবুজ সেই প্রকৃতির মধ্যে তার শৈশব এবং কৈশোর যাপন করেছিলেন, যা তার অস্তিত্বের মর্মমূলে বুনে দিয়েছিল এমন এক সৌন্দর্যের অনুভব, যা তার কবিসত্তাকে অসামান্য নিসর্গমণ্ডিত করে দিয়েছে।

বাবা সত্যানন্দ দাশ আর মা কবি কুসুমকুমারী দাশের প্রিয় সন্তান জীবনানন্দ দাশের শৈশব কৈশোর রাজাপুরের দাদা বাড়ি আর নানা বাড়িতে। নানা বাড়ি ছিল রাজাপুরের পিংড়ি গ্রামে। ফলে আজীবন বরিশালের নদী আর শ্যামলপ্রকৃতি কবির চেতনায় ছিল সদা জাগ্রত। এমনকি পরবর্তীকালের কলকাতায় যাপিত জীবনেও এই প্রকৃতিলগ্নতা তাকে ছেড়ে যায়নি।

‘রূপসী বাংলা’র কবিতাগুলোতে তার শৈশব-কৈশোরের সঘন সবুজ প্রকৃতির অসামান্য চিত্র নতুন মাত্রায় প্রকাশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার কবিতা পড়ে বলেছিলেন ‘চিত্র রূপময়’— সেই চিত্র রূপময়তাও প্রবলভাবে উপস্থিত তার ‘রূপসী বাংলা’র কাব্যে। 

প্রথম দিকের কবিতায় তার যে বিষাদময়তা, সেই বিষাদ আজীবন বিস্তৃত হয়েছে তার কবিতায়। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইতিহাস চেতনা এবং দার্শনিক উপলব্ধি। রূপক প্রতীকে ধূসর নিঃসঙ্গতার ব্যঞ্জনা তার কবিতাকে স্বতন্ত্র মহিমায় উদ্ভাসিত করেছে। অক্ষরবৃত্ত ছন্দকে তিনি গদ্যের কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিলেন যা তার আগে বাংলা কবিতায় দেখা যায়নি।

সেই যে কাব্য ভাষা তা সম্পূর্ণ নতুন বাংলা ভাষায়: 

‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়/ হয়তো মানুষ নয়— হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে;/ হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে/ কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব কাঁঠালছায়ায়;/ হয়তো বা হাঁস হব— কিশোরীর— ঘুঘুর রহিবে লাল পায়, /সারা দিন কেটে যাবে কলমির গন্ধ ভরা জলে ভেসে-ভেসে;/
আবার আসিব আমি বাংলার নদী-মাঠ-খেত ভালোবেসে /জলাঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলার এ সবুজ করুণ ডাঙ্গায়; ...

জীবনানন্দ দাশের ‘রূপসী বাংলা’ আসলে বাংলার শাশ্বত ছবি। এখানে শুধু প্রকৃতি নয় লোকজ সমাজের নানা উপকরণ, নানা চিত্র এমন কি কীট-পতঙ্গ পর্যন্ত চিত্রিত হয়েছে অসাধারণ শৈল্পিক দক্ষতায়। একমাত্র তার পক্ষেই বলা এবং সুখ্যাত সূক্ষ্ম দৃশ্য দেখা সম্ভব হয়েছে: 

তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও— আমি এই বাংলার পারে র’য়ে যাব;/দেখিব কাঁঠাল পাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে; /দেখিব খয়েরি ডানা শালিকের সন্ধ্যায় হিম হ’য়ে আসে/ ধবল রোমের নিচে তাহার হলুদ ঠ্যাং ঘাসে অন্ধকারে...

বাংলার রূপ সৌন্দর্যের প্রতি তার যে মুগ্ধতা তার কোন তুলনা নেই। রূপসী বাংলায় ইতিহাস, ঐতিহাসিক চরিত্র এবং রূপকথার উপকথা, কিংবদন্তি ঘুরে ফিরে এসেছে নানাভাবে। সপ্ত ডিঙ্গা মধুকর কিংবা ‘এশিরিয়া ধুলো আজ বেবিলন ছাই হয়ে আছে’— এমন কত চিত্র কিংবা ‘এবার বল্লাল সেন আসিবে না জানি আমি— রায়গুণাকর আসিবে না— দেশবন্ধু আসিয়াছে খরধার পদ্মায় এবার/ কালীদহে ক্লান্ত গাংশালিখের ভিড়ে যেন আসিয়াছে ঝড়,/ আসিয়াছে চণ্ডীদাস-রামপ্রসাদের শ্যাম সাথে সাথে তার: /শঙ্খমালা, চন্দ্রমালা মৃত শত কিশোরীর কঙ্কনের স্বর। ...

‘স্বপ্ন কি দেখিনি রোম এশিরিয়া উজ্জয়িনী গৌর বাংলা দিল্লি ব্যাবিলন?’

উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করা যাবে না। জীবনানন্দ দাশ এমনই এক কবি— যিনি নিঃসঙ্গ নির্জন সব অর্থেই।

গভীর শ্রদ্ধায় প্রদীপের স্মরণ করি প্রয়াণ বার্ষিকী মনে রেখে।