অনলাইন ডেস্ক: ভ্রমণে গিয়ে কিংবা নতুন কোনো পরিবেশে প্রথম রাত কাটানোর সময় ঘুম দেরিতে আসা, মাঝরাতে বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া এবং সার্বিকভাবে কম ঘুম হওয়ার সমস্যায় প্রায় সবাই পড়েন। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ঘুম গবেষণায় অতি পরিচিত এই সমস্যাটিকে ‘ফার্স্ট-নাইট ইফেক্ট’ বা প্রথম রাতের প্রভাব বলা হয়ে থাকে। উদাহরণ হিসেবে কাজের প্রয়োজনে নিয়মিত ভ্রমণ করা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের এক বিক্রয় নির্বাহীর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জাপান টুডে জানায়, নিজ বাড়িতে দিনে স্বাভাবিকভাবে সাত ঘণ্টা ঘুমালেও ভ্রমণের প্রথম রাতে স্মার্টওয়াচের হিসাবে তাঁর ঘুম নেমে আসে প্রায় পাঁচ ঘণ্টায়; কোনো মানসিক চাপ না থাকলেও অচেনা পরিবেশে শরীর বারবার সতর্ক হয়ে জেগে ওঠে। গবেষকদের মতে, এটি কোনো সাধারণ অস্বাভাবিকতা নয়, বরং মানবদেহের স্নায়ুতন্ত্রের এক বিশেষ প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া।
সুইজারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ফ্রাইবার্গের জ্যেষ্ঠ ঘুম গবেষক অ্যানা উইক ব্যাখ্যা করেন, মূলত বিবর্তনগত কারণেই মানব মস্তিষ্ক এমনভাবে তৈরি হয়েছে। অচেনা কোনো পরিবেশে সম্ভাব্য বিপদ থেকে নিজেকে রক্ষা করার জৈবিক তাগিদে মানুষ ঘুমালেও তার মস্তিষ্কের একটি অংশ সার্বক্ষণিক জাগ্রত ও সতর্ক থাকে। পেনসিলভানিয়ার পিটসবার্গ ইউনিভার্সিটির ঘুম গবেষক আহমাদ মেয়েলি জানান, নতুন কোনো পরিবেশে গেলে মানুষের স্বাভাবিক ঘুমের পরিধি প্রায় ২০ থেকে ৩০ মিনিট কমে যায় এবং গবেষণায় দেখা গেছে গভীর ঘুমের সঙ্গে সম্পৃক্ত মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব নতুন জায়গায় বেশি সক্রিয় থাকে। ডলফিনের সাঁতার কাটার সময় মস্তিষ্কের অর্ধেক অংশ জেগে থাকার মতো সম্পূর্ণ না হলেও, মানুষের ক্ষেত্রেও একটি নির্দিষ্ট অংশ তুলনামূলকভাবে কম ঘুমায়; তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রভাব বৃদ্ধি পায় এবং বিশের কোঠার তরুণদের ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে কম অনুভূত হয়।
শুধু বিবর্তনগত সতর্কতাই নয়, আরও কিছু পারিপার্শ্বিক ও মানসিক উপাদানও এই অনিদ্রার পেছনে ভূমিকা রাখে বলে জানিয়েছেন ঘুম বিশেষজ্ঞ ও মনস্তাত্ত্বিক লিসা স্ট্রস। তাঁর মতে, ভ্রমণের তীব্র শারীরিক ক্লান্তি, হোটেলের কক্ষের অস্বাভাবিক পরিবেশ—যেমন ঘরের ধোঁয়া শনাক্তকরণ বা ফায়ার অ্যালার্মের নিয়ন বাতি—এবং অবচেতন মনের দুশ্চিন্তা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। বিশেষ করে যাঁদের মধ্যে আগে থেকেই অতিরিক্ত উদ্বেগের প্রবণতা রয়েছে, তাঁরা ‘আজ রাতে ঠিকমতো ঘুম হবে কি না’—এমন আগাম চিন্তায় পড়ে নিজেদের আরও বেশি সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে জাগিয়ে রাখেন।
নতুন জায়গায় এই অনিদ্রা দূর করতে এবং দ্রুত স্বাচ্ছন্দ্যবোধ তৈরি করতে বেশ কিছু বিজ্ঞানসম্মত উপায় অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ভ্রমণে নিজের ব্যবহৃত প্রিয় বালিশ বা কম্বল সঙ্গে রাখলে পরিবেশটি মস্তিষ্কের কাছে দ্রুত পরিচিত ও কম অচেনা মনে হয়। শোবার সঙ্গে সঙ্গেই জোর করে ঘুমানোর চেষ্টা না করে কিছুক্ষণ বই পড়ে বা শান্ত কোনো কাজ করে নতুন বিছানায় ধাতস্থ হওয়া উচিত। এ ছাড়া ভ্রমণের সময়েও প্রতিদিনের নির্দিষ্ট ঘুমানোর সময়সূচি মেনে চলা, কক্ষ ঠান্ডা ও অন্ধকার রাখা, ঘুমানোর আগে মুঠোফোন বা টেলিভিশনের পর্দা বন্ধ রাখা এবং মানসিকভাবে নিজেকে নিরাপদ রাখার আশ্বাস দেওয়া কার্যকর ভূমিকা রাখে। এক রাতের কম ঘুম শরীরে দীর্ঘমেয়াদি বড় ক্ষতি না করলেও, পরদিন কোনো গুরুত্বপূর্ণ সভা বা কাজ থাকলে শরীর ও মনকে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে অন্তত একদিন আগেই গন্তব্যে পৌঁছানোর পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
জেএ/অভি