অফিসে বা কর্মস্থলে নামাজের সময় হলে কী করবেন?

নামাজ এমন এক নির্দিষ্ট, সুসংজ্ঞায়িত সময়সূচির মধ্যে বাঁধা, যা কোনো পরিস্থিতিতেই লঙ্ঘন করার অনুমতি নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘নিশ্চয়ই নামাজ মুমিনদের ওপর নির্ধারিত সময়ে ফরজ করা হয়েছে’ (সুরা আন-নিসা, ৪: ১০৩)। এই আয়াতেই লুকিয়ে আছে আজকের ব্যস্ত কর্মজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর: কর্মক্ষেত্রে নামাজের সময় হয়ে গেলে করণীয় কী?


ব্যস্ত কর্মক্ষেত্রে যখন নামাজের সময় হয়ে যায়, তখন অনেকেই দ্বিধায় পড়েন, কাজ চালিয়ে যাবেন, নাকি নামাজের জন্য বিরতি নেবেন? ইসলামি শরিয়ত এই বাস্তব সমস্যার সমাধানে সুস্পষ্ট ও প্রয়োগযোগ্য নির্দেশনা দিয়েছে।

মূলনীতি: কাজের অজুহাতে নামাজ বিলম্ব করা যাবে না
ফকিহদের মতে, আসরের নামাজ সূর্য হলুদ হয়ে যাওয়ার আগেই আদায় করতে হবে, যে জায়গাতেই থাকো না কেন— স্থলে, জলে বা আকাশে, সফরে বা বাড়িতে। কেননা আল্লাহর হক সৃষ্টির হকের আগে অগ্রাধিকার পাবে। পার্থিব বা ব্যবসায়িক কাজকে নামাজের সময়ের উপর প্রাধান্য দেওয়ার কোনো অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়, তা সমুদ্রে হোক, স্থলে হোক বা আকাশে। 

যখন প্রতিটি ওয়াক্তে আলাদা নামাজ কঠিন হয়ে পড়ে
তবে শিফট-ভিত্তিক কর্মক্ষেত্রে বাস্তব কষ্টের কথা বিবেচনা করে তারা গুরুত্বপূর্ণ ছাড় দিয়েছেন, যদি কারো কর্মঘণ্টা এমন হয় যে জোহরের নামাজ তার সময়ে আদায় করা কষ্টকর হয়ে পড়ে, তাহলে সে তা আসরের সঙ্গে জমা করে নিতে পারে, একইভাবে মাগরিব-এশাও। তিনি ইবনে আব্বাস (রা.)-এর হাদিস উদ্ধৃত করেন, যেখানে নবীজি (সা.) মদিনায় বিনা ভয়ে ও বিনা বৃষ্টিতে জোহর-আসর এবং মাগরিব-এশা জমা করেছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল ‘উম্মতকে সংকটে না ফেলা’ (সহিহ মুসলিম)। তবে এক্ষেত্রে তাদের অনেকেই ভিন্নমত পোষণ করে বলেছেন, জমহুর আলেমদের মতে, সফর, বৃষ্টি, ভয় ও অসুস্থতা ছাড়া কাজের কারণে নামাজ জমা করা বৈধ নয়, যা প্রমাণ করে এই বিষয়ে আলেমদের মধ্যে বাস্তব মতভেদ রয়েছে।

ব্যবহারিক সমাধান: ‘জমউস সুরি’
উভয় মতের মধ্যে সমন্বয় সাধনকারী একটি বাস্তবসম্মত পদ্ধতি হলো ‘জমউস সুরি’ (আপাত-জমা)— এতে জোহরের নামাজ তার সময়ের একেবারে শেষভাগে আদায় করা হয়, তারপর সঙ্গে সঙ্গেই আসরের নামাজ তার সময়ের একেবারে শুরুতে পড়ে নেওয়া হয়। এই পদ্ধতিতে প্রকৃতপক্ষে উভয় নামাজই নিজ নিজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আদায় হয়, কেবল সময়ের প্রান্তসীমা কাজে লাগিয়ে দুটি নামাজ কার্যত একসঙ্গে পড়ে ফেলা হয়, যদিও প্রথম অগ্রাধিকার হলো প্রতিটি নামাজ তার নিজস্ব প্রথম ওয়াক্তে পড়া।

কর্মস্থলে জায়গার অভাব কোনো অজুহাত নয়
কর্মস্থলে অজু বা নামাজের জায়গার অভাবকে কারণ দেখিয়ে নামাজ বিলম্ব করা বৈধ নয়। বরং কর্মস্থলেই কোনো ব্যবস্থা করতে হবে, অথবা নিকটবর্তী মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করতে হবে, যাতে কোরআনে বর্ণিত সেই সতর্কবাণীর অন্তর্ভুক্ত না হতে হয়: ‘অতঃপর তাদের পরে এমন এক প্রজন্ম এলো, যারা নামাজ নষ্ট করল এবং কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করল’ (সুরা মারইয়াম, ১৯:৫৯)।
আমাদের সমাজে অনেক বেসরকারি অফিস ও পোশাক কারখানায় নামাজের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা বা বিরতির ব্যবস্থা না থাকার অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়, বিশেষত করপোরেট অফিসগুলোতে যেখানে কঠোর কর্মঘণ্টা মেনে চলতে হয়। শ্রম আইন অনুযায়ী কারখানায় নামাজের বিরতি ও স্থান নিশ্চিত করার বিধান থাকলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়ে গেছে। অনেক আলেম এক্ষেত্রে নিয়োগকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান কর্মক্ষেত্রে একটি ছোট নামাজের স্থান নিশ্চিত করতে, আর কর্মীদেরও পরামর্শ দেন কর্মঘণ্টার মধ্যেই সংক্ষিপ্ত বিরতিতে নামাজ সেরে নেওয়ার কৌশল অবলম্বন করতে, যাতে নামাজ তার নির্ধারিত সময়ের বাইরে চলে না যায়।
নামাজ পার্থিব ব্যস্ততার কাছে কখনও পরাজিত হতে পারে না। সময়ের প্রতি এই আনুগত্যই তার ঈমানের প্রকৃত পরীক্ষা, আর ব্যস্ত কর্মজীবনের মাঝেও আল্লাহর হককে অগ্রাধিকার দেওয়ার এই মানসিকতাই একজন মুমিনকে প্রকৃত সফল কর্মজীবী করে তোলে।

শাহেদ হারুন
ইসলামি গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক