ক্ষমতা মানেই দায়িত্ব, আর দায়িত্ব মানেই জবাবদিহি। ইসলামি শাসনব্যবস্থার এই মূলনীতি এমন এক সুস্পষ্ট কাঠামোতে বিন্যস্ত, যা আধুনিক সুশাসনের ধারণাকেও হার মানায়।
‘তোমরা প্রত্যেকেই রাখাল’: সর্বজনীন জবাবদিহিতার ঘোষণা
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন: ‘তোমরা প্রত্যেকেই রাখাল, আর প্রত্যেকেই তার অধীনদের জন্য দায়বদ্ধ। শাসক জনগণের রাখাল, তিনি তাদের জন্য দায়বদ্ধ’ (সহিহ বোখারি, সহিহ মুসলিম)। এই হাদিসের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়, এখানে শাসক ও শাসিত, উচ্চপদস্থ ও সাধারণ মানুষ, সবাইকে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নে সমান দায়বদ্ধতার আওতায় আনা হয়েছে। ‘রাখাল’ শব্দটি এমন একজন বিশ্বস্ত অভিভাবককে বোঝায় যাকে কোনো বিষয়ের প্রতিপালন ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, আর ‘দায়বদ্ধ’ মানে আল্লাহ যা তার ওপর অর্পণ করেছেন তার জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য।
উমরের বিপ্লবী পদ্ধতি: দায়িত্বের আগে ও পরে সম্পদ গণনা
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর প্রশাসনিক জবাবদিহি ব্যবস্থা ছিল এক যুগান্তকারী উদ্ভাবন। তিনি প্রশাসক ও গভর্নরদের সম্পদ তাদের দায়িত্ব গ্রহণের আগেই গণনা করে রাখতেন, যাতে দায়িত্ব শেষে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়া সম্পদের হিসাব নেওয়া যায়। একটি বিখ্যাত ঘটনায় দেখা যায়, উমরের এক কর্মকর্তা হারিস ইবনে কাব ইবনে ওয়াহাবের সম্পদ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেলে উমর তাকে এর উৎস জিজ্ঞেস করেন। হারিস জবাব দেন, তিনি সঙ্গে নিয়ে যাওয়া অর্থ দিয়ে ব্যবসা করেছেন। উমর তখন বলেন, ‘আল্লাহর কসম, আমরা তোমাদের ব্যবসা করতে পাঠাইনি,’ এবং তার লাভের অর্থ কেড়ে নেন। প্রশাসকদের জন্য সরাসরি বাণিজ্যে অংশগ্রহণই নিষিদ্ধ ছিল, যাতে ক্ষমতার সুযোগে সম্পদ বৃদ্ধির কোনো সম্ভাবনা না থাকে।
ছদ্মবেশে তদন্ত ও লিখিত চুক্তি
উমর কেবল ঘোষিত হিসাবেই সন্তুষ্ট থাকতেন না। তিনি অনুমতি নিয়ে ছদ্মবেশে তার কর্মকর্তাদের ঘরে প্রবেশ করে তাদের জীবনযাত্রার পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করতেন। এভাবেই তিনি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.)-এর বাড়িতেও প্রবেশ করেছিলেন, যদিও সেখানে জবাবদিহির মতো কিছু পাননি। এছাড়া উমর যখন কাউকে প্রশাসক নিয়োগ দিতেন, তখন একটি লিখিত চুক্তি তৈরি করতেন এবং আনসারদের একটি দলকে সাক্ষী রাখতেন। শর্ত থাকত, তিনি দামি ঘোড়ায় চড়বেন না, উৎকৃষ্ট খাবার খাবেন না, আর মুসলিমদের প্রয়োজনে তার দরজা কখনো বন্ধ রাখবেন না—এরপর তিনি বলতেন, ‘হে আল্লাহ, তুমি সাক্ষী থেকো।’
হজের মৌসুমে সম্মিলিত জবাবদিহি
উমরের প্রশাসনিক পদ্ধতির আরেকটি অসাধারণ দিক ছিল প্রতি হজ মৌসুমে গভর্নরদের ডেকে এনে জনসম্মুখে জবাবদিহির আয়োজন করা, যাতে জনগণ তাদের অভিযোগ সরাসরি উপস্থাপন করতে পারে। তিনি নিজেও বিভিন্ন প্রদেশে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে সরাসরি তদারকির পরিকল্পনা করেছিলেন, কেননা তিনি জানতেন অনেক মানুষের সমস্যা তার কাছে পৌঁছায় না, কারণ তারা তার কাছে পৌঁছাতে পারে না, অথবা কর্মকর্তারা তা তার কাছে উত্থাপন করে না।
আমাদের দেশে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদ বিবরণী দাখিলের বিধান তাত্ত্বিকভাবে উমরের এই সম্পদ-গণনা পদ্ধতিরই আধুনিক প্রতিফলন, তবে বাস্তবায়নে দুর্বলতা নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে। নিয়মিত সম্পদ বিবরণী হালনাগাদ ও যাচাইয়ের অভাব, প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনীহা এই ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়। বাংলাদেশের সুশাসন বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই যুক্তি দেন যে, উমরের মডেল থেকে শেখার মূল বিষয় হলো, জবাবদিহি হতে হবে সক্রিয় ও নিয়মিত, কেবল অভিযোগ ওঠার পর প্রতিক্রিয়াশীল নয়। একই সঙ্গে, জনগণের সরাসরি অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা (যেমন উমরের হজ-মৌসুম মডেল) আধুনিক ই-গভর্নেন্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য একটি ধারণা হতে পারে।
ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থায় ক্ষমতা কখনো অবাধ ছিল না। প্রতিটি পদ ছিল একটি আমানত, যার হিসাব দিতে হতো মানুষের কাছেও, আল্লাহর কাছেও। উমরের এই দৃষ্টান্ত আজও প্রমাণ করে, প্রকৃত সুশাসনের ভিত্তি আইনের বইয়ে নয়, বরং শাসকের নিজের জবাবদিহির প্রতি আন্তরিক অঙ্গীকারে নিহিত।
শাহেদ হারুন
ইসলামি গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক