মো. ইউনুছ আলী, কুড়িগ্রাম: কুড়িগ্রামের নদ-নদী তীরবর্তী চর ও দ্বীপচরগুলো ছেয়ে গেছে কাশফুলের শুভ্রতায়। ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ধরলা নদীর তীরে জন্ম নেওয়া কাশবন প্রকৃতির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। শরতের অবসর সময়ে শহরের যান্ত্রিক জীবন থেকে দূরে সরে মানুষ ছুটে যাচ্ছে কাশফুলের শুভ্রতা দেখতে। স্থানীয়রা জানান, কাশফুল শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ায় না। এটি এখন চরাঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকায় গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ভূমিকা রাখছে।
সরেজমিন দেখা যায়, ব্রহ্মপুত্র ও ধরলা নদীর বুকে জেগে ওঠা নতুন-পুরাতন চর ও দ্বীপচরের পতিত জমিতে দেখা দিয়েছে কাশবন। বিঘার পর বিঘা জমিতে দুলছে কাশফুল। শরতের সাদা মেঘ আর ধু-ধু বালুচরে কাশবনের এই উপস্থিতি সবার মন কাড়ে। দূর-দূরান্ত থেকে নানা বয়সি মানুষ ভিড় করছেন কাশবন দেখতে। শুধু প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছেই নয়, এই কাশবন এখন চরবাসীর জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাংসারিক নানা কাজে কাশবনের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। জেলার বাইরেও রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। বিশেষ করে রাজশাহী ও বরিশাল অঞ্চলের পান চাষিদের কাছে পানের বরজ তৈরিতে কাশবনের প্রচুর চাহিদা। এছাড়া স্থানীয়ভাবে গো-খাদ্য সংকট মোকাবিলা ও ঘরে বেড়া তৈরিতেও কাশবনের প্রয়োজন হয়।
কাশফুল মূলত শরৎকালের অন্যতম প্রধান প্রতীক হিসেবে পরিচিত। প্রতিবছর ভাদ্র-আশ্বিন মাসে নদীবেষ্টিত জেলা কুড়িগ্রামের চর ও দ্বীপচরগুলোতে প্রাকৃতিকভাবেই কাশবনের বিস্তার ঘটে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর জেগে ওঠা বালুময় পতিত জমিতে বিনা চাষেই জন্ম নেয় এই কাশবন, যা কৃষকদের জন্য বাড়তি কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই মৌসুমি আয়ের একটি সহজলভ্য উৎস হয়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পর্যটকদের কাছেও কাশবন পরিণত হয়েছে আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থানে। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকে ছুটে আসেন কাশবনের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে এবং ছবি তুলতে। এভাবে কাশবন একদিকে যেমন চরাঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করছে, তেমনি স্থানীয় অর্থনীতিতেও রাখছে উল্লেখযোগ্য অবদান।
মুসার চরের বাসিন্দা ওবায়দুল হক চাঁন এই প্রতিবেদককে বলেন, কাশবনের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। এক সময় শুধু গরু-মহিষের খাদ্যের জন্য কাঁচা কাশবন কেটে সংগ্রহ করা হতো। এখন বিভিন্ন কাজে এর ব্যবহার হচ্ছে। পান চাষিরা নৌকায় করে দূর-দূরান্ত থেকে কাশবন কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। পাইকারি দরে প্রতি হাজার কাশবনের আঁটি বিক্রি হচ্ছে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকায়। তিনি বলেন, প্রতিবছর চরবাসী এই কাশবন থেকে বেশ লাভবান হচ্ছেন। খরচ ছাড়াই এক বিঘা পতিত জমি থেকে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকার কাশবন বিক্রি হয়।
মশালের চরের বাসিন্দা আতাউর রহমান বলেন, গত বছর নদীভাঙনে তিনি ভিটেমাটি হারিয়েছেন। এ বছর সেই জমিতে বালু জমে চর জেগেছে। ওই পতিত জমিতে প্রায় পাঁচ বিঘাজুড়ে জন্মেছে কাশবন, যাতে কোনো খরচ হয়নি। তিনি জানান, সাধারণত বন্যা ও বন্যা-পরবর্তী সময়ে জেগে ওঠা চরের পতিত জমিতে কাশবন জন্মায়। মাত্র দুই-তিন মাস গরু-মহিষের হাত থেকে রক্ষা করতে পারলেই ভালো কাশবন পাওয়া যায়। তিনি আশা করছেন, এবার ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার কাশবন বিক্রি করতে পারবেন। আতাউর রহমান আরও বলেন, প্রতিবছর বন্যার সময় চারণভূমি ডুবে যায়, তখন গো-খাদ্যের সংকট দেখা দেয়। এ সময় ধান-খড়ের পাশাপাশি কাশবন কেটে গো-খাদ্যের অভাব পূরণ করা হয়।
কুড়িগ্রাম চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, কুড়িগ্রাম জেলায় সাড়ে চার শতাধিক চরাঞ্চল রয়েছে। জেলার ১৬টি নদ-নদী বেষ্টিত এই চরাঞ্চলগুলোতে খণ্ড খণ্ডভাবে ছড়িয়ে আছে সহস্রাধিক কাশবন। তিনি বলেন, বর্তমানে কাশবন শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়াচ্ছে না, এটি বিক্রি করে কৃষকরাও ভালো আয় করতে পারছেন।