মালীর বেতন ১ লাখ টাকা, তাহলে সাংবাদিকের বেতন কত?
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:  কয়েকদিন আগেই গণপূর্ত অধিদপ্তর মালী পদে চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়েছে। এটা ২০তম গ্রেড অর্থাৎ সর্বশেষ গ্রেডের চাকরি, শিক্ষাগত যোগ্যতা মাত্র অষ্টম শ্রেণী পাস। প্রারম্ভিক বেতন স্কেলেই হাতে পান প্রায় ৪৮ হাজার টাকা। চাকরির বয়স ১০ বছর হলে এবং পদোন্নতি না পেলেও বেতন দাঁড়ায় প্রায় ৮০ হাজার টাকা, আর পদোন্নতি পেলে এক লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার কিংবা বাসস- সবখানেই একই চিত্র।

অথচ বেসরকারি গণমাধ্যম বা অন্য প্রতিষ্ঠানে দক্ষতা এবং কাজের ব্যাপ্তি বিটিভির চেয়ে বহুগুণ বেশি হলেও বেতন আকাশ-পাতাল কম। সরকারের বাগানে এমন প্রায় ১৪ লাখ কর্মচারী আছেন। তারা দেশের মোট শ্রমশক্তির মাত্র ২ শতাংশ হলেও তাদের পেছনে রাষ্ট্রের খরচ হয় জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশ। যা আমাদের স্বাস্থ্যখাতের মোট বরাদ্দের চার গুণ এবং শিক্ষাখাতের দ্বিগুণ।

সরকারি কর্মচারীদের বেতন এবার তিন দফায় বাড়িয়ে দ্বিগুণেরও বেশি করা হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত খরচ হবে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা, মোট ব্যয় দাঁড়াবে ২ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। অথচ সচিব নিজেই স্বীকার করেছেন, এই সিদ্ধান্ত অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ইতিহাস বলে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলেই বাজারে জিনিসপত্র, বাড়িভাড়া ও পরিবহনের দাম হু-হু করে বাড়ে। 

বেসরকারি ব্যাংকে এন্ট্রি লেভেলে কিছু ভালো বেতন থাকলেও বাকি প্রায় সব খাতের অবস্থা করুণ। গণমাধ্যমে এন্ট্রি লেভেলে বেতন ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি মাত্র ১২ হাজার টাকা, যা সরকারি সর্বনিম্ন গ্রেডের বেতনের তুলনায় তিন ভাগের এক ভাগ।

বিবিএস লেবার ফোর্স সার্ভে অনুযায়ী, দেশের ৮৪ শতাংশ অর্থাৎ ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যাদের কোনো চাকরিগত সুরক্ষা নেই। ২০১৫ সালে যেখানে একটি পরিবারের ন্যূনতম খরচ ছিল প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার টাকা, আজ তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩২ হাজার টাকায়। দেশে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার অজুহাতে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হলো। কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার দায়িত্ব তো এই সরকারি কর্মচারীদেরই ছিল। নিজেদের ব্যর্থতাকে অজুহাত বানিয়ে তারা বেতন বাড়িয়ে নিলেন, কিন্তু দেশের বাকি ৭ কোটি কর্মজীবীর বেতন বাড়ানোর উদ্যোগ কে নেবে?

সাধারণ মানুষ কি তবে রাজপথে নেমে আন্দোলন না করা পর্যন্ত অনাহারেই দিন কাটাবে? সরকারি ও বেসরকারি খাতের এই অস্বাভাবিক আয়ের ব্যবধান দ্রুত না কমালে সমাজ ও অর্থনীতিতে যে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে, তার খেসারত দিতে হবে আমাদের সবাইকে।

অষ্টম শ্রেণী পাস করে সরকারি অফিসে মালী পদে যোগ দিলেই প্রারম্ভিক বেতন ৪৮ হাজার টাকা! আর কয়েক বছর পর তা গিয়ে ঠেকে ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকায়। অথচ অন্যদিকে গার্মেন্টস শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি মাত্র ১২ হাজার টাকা। বেসরকারি খাতের শিক্ষিত তরুণরা পাচ্ছেন ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারীর বেতন দ্বিগুণ করতে দেশের ১ লাখ কোটি টাকার বেশি অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। কিন্তু দেশের বাকি ৭ কোটি সাধারণ কর্মজীবী মানুষের কথা কে ভাববে? এই চরম বৈষম্য কি আমাদের অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে না?

সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লেই বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র থেকে শুরু করে বাড়িভাড়া-সবকিছুর দাম বাড়ে এক লাফে। এবারও ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারীর বেতন দ্বিগুণের বেশি বাড়ানো হলো। কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার মূল দায়িত্ব তো ছিল এই কর্মকর্তাদেরই! তারা বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলেন, আর সেই ব্যর্থতার সুযোগ নিয়ে নিজেদের বেতন বাড়িয়ে নিলেন। রাষ্ট্র ২ শতাংশ মানুষের জন্য ১ লাখ কোটি টাকার বেশি অতিরিক্ত বরাদ্দ দিল, আর মূল্যস্ফীতির কড়া মাশুল গুণতে হচ্ছে দেশের ৮৪ ভাগ অনানুষ্ঠানিক খাতের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষকে। এই অবিচারের শেষ কোথায়?  

 

—জা. অর্থনীতি/এলএটি