কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জে ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ছয় বছর আট মাসে ২৬ জনের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে একটি আন্তর্জাতিক সমাজসেবী সংস্থা।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, শনাক্ত ব্যক্তিদের ২২ জনই জেলার ভৈরব কার্যালয়ের আওতাধীন ৬ উপজেলা ভৈরব, কুলিয়ারচর, বাজিতপুর, নিকলী, অষ্টগ্রাম ও কটিয়াদীর। বাকি ৪ জন শনাক্ত হয়েছেন কিশোরগঞ্জ কার্যালয়ের অধীন সাত উপজেলায়।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে নতুন করে ৯ জনের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে ৫ জন ভৈরব কার্যালয়ের আওতাধীন ৬ উপজেলার এবং ৪ জন কিশোরগঞ্জ কার্যালয়ের আওতাধীন ৭ উপজেলার।
তবে বেসরকারি সংস্থাটির এই হিসাবের সঙ্গে সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবের বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।
কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাইদুর রহমান জানিয়েছেন, সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এখন পর্যন্ত কিশোরগঞ্জে একজন এইচআইভি রোগীও শনাক্ত হয়নি।
ডেঙ্গুতে আরও ৭ মৃত্যু, হাসপাতালে ১৭৫
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক সমাজসেবী সংস্থাটি কিশোরগঞ্জে ২০১০ সাল থেকে বিভিন্ন উপজেলায় প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইচআইভি অনুসন্ধানের কাজ করছে। সংস্থাটি তাদের কার্যক্রম অনেকটা গোপনীয়তার সঙ্গে পরিচালনা করে।
শনাক্ত ব্যক্তিদের নাম-পরিচয়, তারা জেলার ঠিক কোন এলাকায় বসবাস করেন কিংবা তাদের ব্যক্তিগত কোনো প্রোফাইল প্রকাশ করতে রাজি হয়নি সংস্থাটি।
তাদের বক্তব্য, এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিদের পরিচয় অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গোপনীয় বিষয়। রোগীদের সঙ্গে সেই গোপনীয়তা রক্ষা করেই পরীক্ষা ও পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
সংস্থাটির ম্যানেজার জানান, কোনো ব্যক্তির শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হওয়ার পর তাকে এআরটি (অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি) চিকিৎসার আওতায় আনা হয়। এই চিকিৎসা বিনামূল্যে দেওয়া হয়। পাশাপাশি রোগীদের নিয়মিত ফলোআপ করা হয়।
হাম উপসর্গে আরও ৮ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১০৪৪
সংস্থাটির ম্যানেজারের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইচআইভি শনাক্তকরণের কাজ করে। এর মধ্যে রাস্তায় বা ভাসমান অবস্থায় থাকা মানুষ, হিজড়া সম্প্রদায়, ট্রাকচালকসহ কিছু প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, মাদক গ্রহণকারী ব্যক্তি, সমকামী ব্যক্তি, গার্মেন্টস শ্রমিক এবং বিদেশফেরত প্রবাসীদের মতো জনগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করেন তিনি।
তবে এসব জনগোষ্ঠীর মধ্যে শনাক্তের হার বা ২৬ জনের মধ্যে কোন শ্রেণির কতজন রয়েছেন, সে তথ্য সংস্থাটি প্রকাশ করেনি। ফলে নির্দিষ্ট কোনো জনগোষ্ঠীকে কিশোরগঞ্জের শনাক্ত ব্যক্তিদের প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই।
কিশোরগঞ্জে এইচআইভি শনাক্তের তথ্য নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
নবজাতক ইউনিটে অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি, পাকিস্তানে ১৪ শিশুর মৃত্যু
সমন্বয় সমাজকল্যাণ সংস্থার সভাপতি আতা মোহাম্মদ ওবায়েদ বলেন, এটি অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। কিশোরগঞ্জ হাওরবেষ্টিত জেলা। ভৈরবে গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে জংশন রয়েছে। এছাড়া সড়ক ও নৌপথেও মানুষের চলাচল রয়েছে। এসব কারণে এইচআইভি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।
কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সানজিদ আহমেদ বলেন, এইচআইভির বিস্তার শুধু স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ও মানবিক সংকটও। সচেতনতার ঘাটতি, ভুল তথ্য, সামাজিক সংস্কার এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ অনেক মানুষকে সংক্রমণের ঝুঁকিতে ফেলছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (মেডিসিন) আবিদুর রহমান ভূইয়া বলেন, অনিরাপদ যৌনসম্পর্ক, সংক্রমিত রক্ত গ্রহণ এবং ব্যবহৃত বা অপরিষ্কার সূঁচ ও সিরিঞ্জ ভাগাভাগির মাধ্যমে এইচআইভি ছড়াতে পারে। এছাড়া আক্রান্ত মায়ের মাধ্যমে গর্ভাবস্থা, প্রসব বা বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় শিশুও সংক্রমিত হতে পারে।
তিনি বলেন, প্রবাসফেরত জনগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিয়মিত পরীক্ষা ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
৪২ দিনের ব্যবধানে ব্লিস হাসপাতালে ফের আগুন, আতঙ্কে রোগীরা
অন্যদিকে কিশোরগঞ্জের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এ পর্যন্ত কোনো এইচআইভি রোগী শনাক্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাইদুর রহমান।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে প্রতিটি উপজেলায় এইচআইভি শনাক্তের জন্য পর্যাপ্ত পরীক্ষার কিট সরবরাহ করা হচ্ছে। সরকারি ব্যবস্থায় এ পর্যন্ত কিশোরগঞ্জে কোনো এইচআইভি রোগী শনাক্ত হয়নি।
বেসরকারি সংস্থার দেওয়া ২৬ জনের তথ্য সম্পর্কে সিভিল সার্জন বলেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের আরও করণীয় আছে কি না, সে বিষয়েও তিনি প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করবেন।
কিশোরগঞ্জে এইচআইভি শনাক্তের এই দুই ধরনের হিসাবের পার্থক্য এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে একটি আন্তর্জাতিক সমাজসেবী সংস্থার মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে ২০২০ সাল থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত ২৬ জন শনাক্তের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, অন্যদিকে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় একই সময়ে শনাক্তের সংখ্যা শূন্য। ফলে এই দুই হিসাবের পদ্ধতি, পরীক্ষা, শনাক্তকরণ এবং তথ্য আদান-প্রদানের প্রক্রিয়া স্পষ্ট করা গেলে জেলার এইচআইভি পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হবে।
—জা. অর্থনীতি/এনজে
