নিজস্ব প্রতিবেদক: গণপরিবহনের দুর্বলতায় ঢাকায় বাড়ছে ব্যাটারিচালিত রিকশার ওপর নির্ভরতা। এরই মধ্যে রাজধানীর ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকদের বড় একটি অংশই আসছেন প্যাডেল রিকশা থেকে। বুয়েটের এক গবেষণার তথ্য দিয়ে প্ল্যানার্স ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (বিআইপি) জানিয়েছে, ৩০০ চালকের মধ্যে ৫০ দশমিক ৭ শতাংশ আগে প্যাডেল রিকশা চালাতেন। এসব চালকের ভাড়া পরিশোধের পর গড় দৈনিক নিট আয় ১ হাজার ২৪৯ টাকা। গবেষণায় একই সঙ্গে উঠে এসেছে, এক দশকে ঢাকার গণপরিবহনে যাত্রীর অংশ প্রায় ৬১ শতাংশ কমেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাটারিচালিত যান নিষিদ্ধ না করে প্রয়োজন কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং গণপরিবহনভিত্তিক সমন্বিত পরিকল্পনা।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বাংলামোটরে বিআইপির নিজস্ব কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘ব্যাটারি চালিত তিন চাকার যান এবং টেকসই গণপরিবহন পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক সেমিনারের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।
বিআইপির যুগ্ম সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ কাজী সালমান হোসেনের সঞ্চালনায় এবং সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইপি’র সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান, এবং পরিকল্পনাবিদ তাহসিন রেজা। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনার শুরুতে পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, নগর পরিবহন ব্যবস্থার বিভিন্ন ধরন ও পরিবহন পরিকল্পনার মৌলিক বিষয় তুলে ধরা হয়।
এ ধরনের যানের চালকদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, আয়, পূর্ববর্তী পেশা ও বিকল্প জীবিকার সম্ভাবনা এবং ব্যবহারকারীরা কেন এসব যান ব্যবহার করেন; বিশেষ করে নারী ব্যবহারকারীদের স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয় গবেষণায় তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের একটি অপ্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, এসব যানের চালকদের অর্ধেকের বেশি আগে রিকশা বা প্যাডেলচালিত রিকশা চালাতেন। তবে আয় খুব বেশি নয়; ভাড়া পরিশোধের পর তাদের গড় দৈনিক নিট আয় প্রায় ১ হাজার ২৪৯ টাকা।
শুভ চৌহানের ২০২৬ সালের ওই গবেষণায় ঢাকা শহরের ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যানের ৩০০ চালকের ওপর জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা যায়, ৫০.৭ শতাংশ চালক আগে রিকশা বা প্যাডেল রিকশা চালাতেন। অন্যদের মধ্যে ১৬.৭ শতাংশ অন্যান্য পেশায়, ৬.৭ শতাংশ বাস শ্রমিক, ৬ শতাংশ ব্যবসায়ী, ৬ শতাংশ দিনমজুর, ৫.৩ শতাংশ সিএনজি চালক, ৪.৭ শতাংশ শিক্ষার্থী এবং ৪ শতাংশ কৃষিকাজে যুক্ত ছিলেন। জরিপ অনুযায়ী, ভাড়া পরিশোধের পর চালকদের গড় দৈনিক নিট আয় ১ হাজার ২৪৯ টাকা। সর্বনিম্ন আয় ৭৯৮ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ হাজার ৮০১ টাকা।
আয়ের সংকট মোকাবিলায় চালকদের বিভিন্ন কৌশল নেওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে। সবচেয়ে বেশি ৫৫ জন বাড়তি আয়ের জন্য সম্পূরক কর্মসংস্থানের আশ্রয় নিয়েছেন। এরপর ৩৮ জন রুট পরিবর্তন করেছেন, ২৩ জন আবার রিকশায় ফিরে গেছেন এবং ১৫ জন অন্যান্য কৌশল নিয়েছেন।
সেমিনারে উপস্থাপিত আরেকটি গবেষণায় ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যাত্রীদের ওপর জরিপ করে দেখা যায়, এসব যান বেছে নেওয়ার প্রধান কারণ গণপরিবহন সহজলভ্য না থাকা। ৫৩০ যাত্রীর মধ্যে ৭৮.১ শতাংশ এ কারণ উল্লেখ করেছেন। ৬২.২ শতাংশ গণপরিবহনের তুলনায় বেশি আরামদায়ক এবং একই সংখ্যক যাত্রী অভ্যাসগত কারণে এসব যান বেছে নেওয়ার কথা বলেছেন। এছাড়া ৩৬.৯ শতাংশ যাত্রী গণপরিবহনের তুলনায় এটিকে নিরাপদ মনে করেন, ২০ শতাংশ দ্রুত এবং ১১.২ শতাংশ সস্তা মনে করেন।
বিআইপি জানায়, ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যানের যাত্রা মূলত স্বল্প দূরত্বের। আজিমপুর-জিগাতলা করিডোরে ৫৪ শতাংশ যাত্রা ১-২ কিলোমিটারের মধ্যে। গুলিস্তান-ঢাকেশ্বরী করিডোরে ৬৪ শতাংশ যাত্রা ২-৩ কিলোমিটারের মধ্যে। গুলিস্তান-কমলাপুর ও গুলিস্তান-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় করিডোরে অধিকাংশ যাত্রা ১ কিলোমিটারের মধ্যে।
সেমিনারে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলেন, ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া সমাধান নয়। বরং সংখ্যা নিয়ন্ত্রণসহ এসব যানকে কার্যকর ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে চালকদের জীবিকা বিবেচনায় নিয়ে পুনর্বাসনের উদ্যোগ প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, সময়োপযোগী এ সেমিনারে ব্যাটারি চালিত তিন চাকার যানসহ স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতের জন্য জনবান্ধব পরিবহন পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
তিনি জানান, যানজট নিরসনকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে। বৈদ্যুতিক যানবাহন ব্যবহারে উৎসাহ দিতে শুল্ক কমানো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ সুবিধা, গবেষণা এবং ব্যাংক ঋণের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তঃজেলা বাস ঢাকায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, বাস টার্মিনালগুলোকে সিটি বাস টার্মিনাল হিসেবে ব্যবহারের উদ্যোগ, ফিটনেসবিহীন বাস ব্যবস্থাপনা, লেভেল ক্রসিং, ঢাকার আশপাশে ওভারপাস-আন্ডারপাস, কমিউটার ট্রেন, নৌপথ, মেট্রোরেল ও মনোরেল নিয়ে কাজ চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ব্যাটারি চালিত তিন চাকার যান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এগুলো হঠাৎ করে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। এ বিষয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং নীতিমালা প্রণয়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ব্যাটারি চালিত যানবাহনের চলাচলের নির্দিষ্ট পথ, কর প্রদানসহ বিভিন্ন বিষয় নীতিমালার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আনিসুর রহমান, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব পরিকল্পনাবিদ মীর আহমেদ তারিকুল ওমর, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক ড. মো. মশিউর রহমান, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ- পুলিশ কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম এবং বিআইপির উপদেষ্টা পরিষদ আহ্বায়ক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি