যশোরে আমনের উৎপাদন খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক
ছবি: সংগৃহীত

যশোর প্রতিনিধি: যশোরের সদর উপজেলায় আমন ধানের ফলন ভালো হলেও উৎপাদন খরচ ও বাজারদর নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষকেরা। মাঠে ধানের অবস্থা ভালো এবং সারের সরবরাহও মোটামুটি স্বাভাবিক। তবে সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমসহ বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এর বিপরীতে ধানের দাম কম থাকায় কাঙ্ক্ষিত লাভ পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন কৃষকেরা।

সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও কোথাও বাকিতে সার কিনলে বেশি দাম নেওয়ার অভিযোগ থাকলেও সার সংকট তেমন নেই বলে জানিয়েছেন অধিকাংশ কৃষক। তাদের মূল উদ্বেগ এখন উৎপাদিত ধানের ন্যায্য দাম নিয়ে।

সদর উপজেলার কৃষক মামুন হোসেন ৫ বিঘা জমিতে আমন ধানের আবাদ করেছেন। এর মধ্যে দুই বিঘা জমি বৃষ্টির পানিতে ডুবে গেলেও বাকি ৩ বিঘায় ধানের অবস্থা ভালো। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত সারের সংকট অনুভব করেননি। কয়েক দিন আগে সার কিনেছেন। জমি নিড়ানোর পর আবার সার কিনতে গেলে তখন সরবরাহ পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হবে।

হাওরে ধরা পড়ছে রূপালী ইলিশ, স্বস্তি ফিরল জেলেদের

ধানের বর্তমান বাজারদর নিয়ে হতাশ আরেক কৃষক। তার ভাষ্য, সার, কীটনাশক, সেচসহ প্রায় সব কৃষি উপকরণের দাম বেড়েছে। অথচ ধানের দাম সে তুলনায় কম। ফলে ধান চাষ করে লাভের পরিবর্তে লোকসান গুনতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে পরিবারের খাদ্য চাহিদা পূরণের বাইরে বাণিজ্যিকভাবে ধান চাষ না করার কথাও ভাবছেন তিনি।

কৃষক আলাউদ্দিন বলেন, নিয়মিত সার পাওয়া যাচ্ছে এবং এলাকায় সারের সংকট নেই। তবে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়েছে। ধানের পাশাপাশি কীটনাশকের দামও বেশি। মাজরা, পচন ও কারেন্ট পোকার আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষা করতে প্রয়োজন অনুযায়ী কীটনাশক ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে উৎপাদন খরচ।

আলাউদ্দিনের মতে, প্রতি মণ ধানের দাম অন্তত ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা হলে কৃষকেরা কিছুটা লাভ করতে পারবেন।

ইউটিউব দেখে হলুদ তরমুজ চাষ, ৩ মাসে আয় ৫ লাখ

কৃষক নজরুল ইসলামও ধানের ন্যায্য দাম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সারের দাম কিছুটা বেশি হলেও সার কিনেই আবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। মাঠে ধানের অবস্থাও ভালো। কিন্তু উৎপাদন খরচের তুলনায় ধানের দাম কম হওয়ায় কৃষকেরা সমস্যায় পড়েছেন। প্রতি মণ ধানের দাম ১ হাজার ৪০০ টাকা হলে কিছুটা স্বস্তি মিলবে।

নজরুল ইসলামের অভিযোগ, কোথাও কোথাও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতি কেজি সারে ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে।

তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সার ডিলার বশির আহমেদ। তিনি বলেন, যশোর সদরে পর্যাপ্ত পরিমাণ সার রয়েছে। তার দোকান থেকে কোনো কৃষক সার না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন না। তার অধীনে থাকা নয়জন সাব-ডিলারও নিয়ম অনুযায়ী সার সংগ্রহ করে কৃষকদের কাছে বিক্রি করছেন। সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করা হচ্ছে না বলেও দাবি করেন তিনি।

পতিত জমিতে সবজি চাষ করে লাখ টাকা আয়

বশির আহমেদ জানান, সরকার নির্ধারিত দামে ইউরিয়া সার প্রতি ৫০ কেজির বস্তা ১ হাজার ৩৫০ টাকা, টিএসপি সার প্রতি ৫০ কেজির বস্তা ১ হাজার ৩৫০ টাকা, ডিএপি সার প্রতি ৫০ কেজির বস্তা ১ হাজার ৫০ টাকা এবং এমওপি সার প্রতি ৫০ কেজির বস্তা ১ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কোনো কৃষকের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে না। এ ছাড়া সন্ধ্যার পর সার বিক্রির নিয়ম নেই।

কৃষক ইকরাম হোসেন বলেন, এলাকায় সারের সংকটের কথা শোনা গেলেও বাস্তবে তেমন কোনো সংকট নেই। কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে ডিলারের কাছ থেকে নির্ধারিত চার্ট অনুযায়ী সরকার নির্ধারিত দামে সার কিনছেন তারা। মাঠে ধানের ভালো অবস্থাই প্রমাণ করে, সারের ঘাটতি নেই।

যশোর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজিয়া সুলতানা বলেন, উপজেলায় পর্যাপ্ত পরিমাণ সার মজুত রয়েছে। কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ করা হচ্ছে। ডিলারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কোনো কৃষকের কাছ থেকে নির্ধারিত মূল্যের বেশি দাম নেওয়া যাবে না এবং চাহিদা অনুযায়ী সার দিতে হবে।

তিনি বলেন, কোনো ডিলার বেশি দামে সার বিক্রি করছেন—এমন অভিযোগ পাওয়া গেলে এবং তা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ডিলারের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সবুজ পাতার আড়ালে যেন বঞ্চনার গল্প

মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, যশোর সদর উপজেলায় চলতি আমন মৌসুমে ধানের অবস্থা ভালো। সারের সরবরাহও এ পর্যন্ত স্বাভাবিক রয়েছে। তবে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে ধানের বাজারদর সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় লাভের হিসাব মিলছে না কৃষকদের।

কৃষকদের আশঙ্কা, উৎপাদন খরচের তুলনায় ধানের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে ধান চাষে তাদের আগ্রহ কমে যেতে পারে।

তাদের দাবি, শুধু সারের সরবরাহ নিশ্চিত করলেই হবে না; সার, কীটনাশক, সেচসহ কৃষি উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উৎপাদিত ধানের ন্যায্য বাজারমূল্যও নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে পরিবারের খাদ্য চাহিদা মেটানোর পর বাড়তি ধান উৎপাদনে অনেক কৃষকই আগ্রহ হারাতে পারেন।

—জা.অর্থনীতি/এনজে