সুই-সুতা থেকে বিশ্ববাজার, ই-কমার্সে স্বাবলম্বী ফরিদপুরের নারীরা
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

ফরিদপুর প্রতিনিধি: ঘরের কোণে অবসরের সঙ্গী হয়ে থাকা সুই-সুতার কাজ এখন পাড়ি দিচ্ছে দেশের গণ্ডি। রান্নাঘরের চেনা গণ্ডি পেরিয়ে ইন্টারনেট ও ই-কমার্সের হাত ধরে নতুন পরিচয় তৈরি করছেন ফরিদপুরের নারী উদ্যোক্তারা। নকশিকাঁথা, কুশি কাটার পুতুল, মাটি-কাঠের গহনা, সুপারি পাতার পরিবেশবান্ধব শোপিস কিংবা কেমিক্যালমুক্ত ড্রাই ফ্রুটস- ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এসব দেশীয় পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, এমনকি ইউরোপের প্রবাসী বাংলাদেশিদের ঘরেও।

জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ফরিদপুরে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ নারী উদ্যোক্তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অনলাইন মার্কেটিংয়ের সঙ্গে যুক্ত। শুধু সদর উপজেলাতেই বিভিন্ন খাতে পাঁচ শতাধিক নারী নিয়মিত ই-কমার্স ব্যবসা পরিচালনা করছেন।

নকশিকাঁথা ও কুশি কাটার বাহারি পুতুলের চাহিদা এখন আর দেশের বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই। আন্তর্জাতিক বাজারেও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে এসব পণ্য। বিশেষ করে ইউরোপে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা এসব দেশীয় কারুশিল্পের অন্যতম প্রধান ক্রেতা। ফলে ফরিদপুরের উদ্যোক্তাদের হাত ধরে বাংলার ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প পৌঁছে যাচ্ছে প্রবাসীদের কাছেও।

নকশিকাঁথাকে সঙ্গী করে উদ্যোক্তা হিসেবে পথচলা শুরু করা লুবাবা তুল জান্নাত বলেন, শুরুটা হয়েছিল শখ থেকে। ই-কমার্সের কারণে এখন ঘরের বাইরে না গিয়েও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের গ্রাহকদের কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। অনলাইনে না এলে হাতের কাজের এতটা চাহিদা রয়েছে তা বুঝতে পারতেন না। এ কাজ তাকে মানসিকভাবে স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক আত্মবিশ্বাসও দিয়েছে।

কুশি কাটার সুই ও উল দিয়ে পুতুল এবং ঘর সাজানোর সামগ্রী তৈরি করেন তানজিয়া আক্তার তমা। তিনি জানান, একসময় অবসর কাটানোর জন্য কুশি কাটার কাজ করতেন। পরিবার ও বন্ধুদের প্রশংসায় উৎসাহিত হয়ে অনলাইনে পেজ খোলেন। এখন নিয়মিত অর্ডার আসছে, যার কিছু পণ্য বিদেশেও যাচ্ছে। শখের কাজটাই এখন তার আয়ের অন্যতম নির্ভরযোগ্য উৎস।

কাঠ, মাটি ও বিভিন্ন উপকরণে রং-তুলির কারুকাজে নেকলেস ও চুড়ি তৈরি করেন তাবাচ্ছুম ইসলাম। তার লক্ষ্য দেশীয় শিল্পকে আধুনিক রূপে তুলে ধরা। তিনি বলেন, হ্যান্ডমেড গহনার প্রতি তরুণ প্রজন্মের বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। সঠিক প্রচার ও সততা ধরে রাখতে পারলে এ খাত থেকেও ভালো ক্যারিয়ার গড়ে তোলা সম্ভব।

সুপারিগাছের ফেলে দেওয়া পাতার খোলস দিয়ে পরিবেশবান্ধব শোপিস তৈরি করছেন সাজিয়া জিনাত আরেফিন শান্তা। তিনি বলেন, ফেলে দেওয়া সুপারি পাতা ব্যবহার করে তৈরি এসব শোপিস একদিকে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখছে, অন্যদিকে ঘরের সৌন্দর্যও বাড়াচ্ছে। ই-কমার্সের কারণে পরিবেশ সচেতন ক্রেতাদের কাছেও এসব পণ্যের চাহিদা তৈরি হয়েছে।

হস্তশিল্পের পাশাপাশি খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণেও এগিয়ে এসেছেন নারী উদ্যোক্তারা। কোনো রাসায়নিক বা প্রিজারভেটিভ ছাড়াই আধুনিক প্রযুক্তিতে আম, আনারস, লেবু ও ড্রাগন ফল শুকিয়ে ড্রাই ফ্রুটস তৈরি করছেন মুনিয়া আফরোজ লুবনা। তিনি বলেন, ভেজালমুক্ত ও পুষ্টিকর খাবারের চাহিদা বাড়ছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসচেতন গ্রাহকদের কাছে দ্রুত এসব পণ্য পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছে এবং বিক্রিও দিন দিন বাড়ছে।

সফল এসব উদ্যোক্তা এখন জেলার বিভিন্ন মেলা ও প্রদর্শনীতেও অংশ নিচ্ছেন। তবে ব্যবসার পরিধি আরও বাড়াতে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে প্রশাসনিক সহযোগিতা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন তারা।

ফরিদপুর জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মাশউদা হোসেন বলেন, ফরিদপুরের নারী উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ ও মেধা প্রশংসনীয়। তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ও দক্ষ করে তুলতে পাঁচটি পৃথক ট্রেডে প্রতিবছর অন্তত ৪০০ জন নতুন নারী উদ্যোক্তাকে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ২৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা এবং ক্ষেত্রবিশেষে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষুদ্রঋণ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। মাত্র ৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জে দীর্ঘমেয়াদে পরিশোধের সুযোগ থাকায় উদ্যোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে না। প্রতিটি নারীকে নিজ পরিচয়ে আত্মনির্ভরশীল করে তোলাই তাদের লক্ষ্য।

একসময় যে কাজ ছিল অবসর কাটানোর সঙ্গী, সেটিই এখন অনেক নারীর আয়ের পথ। ই-কমার্সের হাত ধরে ফরিদপুরের এসব নারী উদ্যোক্তার স্বপ্ন পৌঁছে যাচ্ছে দেশের সীমানা পেরিয়ে। প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে তাদের এই উদ্যোগ স্থানীয় অর্থনীতিতে আরও বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

—জা. অর্থনীতি/এলএটি