পুকুর ও কৃষিজমিতে ভূগর্ভের পানি, খাবার পানির সংকটের শঙ্কা
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গিয়ে নলকূপে পানি না ওঠার ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যেই কুলিয়ারচরে কৃষিজমিতে সেচ, মাছের পুকুরসহ বিভিন্ন কাজে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিয়ে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। সাবমার্সিবল পাম্পের পাশাপাশি বিভিন্ন মিল-কারখানা, ইটভাটাসহ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানেও ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার রয়েছে। এখনই উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ ও বিকল্প পানির উৎস বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতে খাবার পানির সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

‎উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, কুলিয়ারচরে ৪৬০টি পুকুর রয়েছে, যার মধ্যে ৩৫০টি আবাদি পুকুর। উপজেলার ২৫ হাজার ৮৯০ একর কৃষিজমির মধ্যে ১৫ হাজার ২৮৯ একর জমি সেচের আওতায়।

‎স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুষ্ক মৌসুমের পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমেও কিছু পুকুরে সাবমার্সিবল পাম্পের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি তোলা হয়। তবে সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ মাসুদ রানা বলেন, কুলিয়ারচরে মাছ চাষে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার খুবই কম। অধিকাংশ পুকুরে বৃষ্টির পানি ও অন্যান্য উৎসের পানি ব্যবহার করা হয়।

‎অন্যদিকে কৃষিতে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার তুলনামূলকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মর্জিনা আক্তার বলেন, সেচের বিষয়টি মূলত বিএডিসি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর দেখভাল করে। তবে সেচের পানির চাহিদা মেটাতে ভূউপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানো গেলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।

‎বিএডিসির সহকারী প্রকৌশলী শাওন মালাকার বলেন, এক কেজি ধান উৎপাদনে প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার লিটার পানি প্রয়োজন হয়। তাই ধান চাষে পানির ব্যবহার কমানো জরুরি। এডব্লিউডি (AWD) পদ্ধতি ব্যবহার করলে সেচের পানি প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ সাশ্রয় করা সম্ভব। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপও কমবে।

‎কৃষি ও মাছ চাষের বাইরে বিভিন্ন মিল-কারখানা, ইটভাটা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানেও উৎপাদন ও অন্যান্য কাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কত পরিমাণ পানি উত্তোলন হচ্ছে, তার সমন্বিত হিসাব ও নিয়মিত নজরদারি রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

‎কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় ২০২৫ সালের মার্চে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গিয়ে পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছিল। বিশেষ করে সদর ও করিমগঞ্জে নলকূপে পানি না ওঠার ঘটনা ঘটে। জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর জানিয়েছিল, জেলার ১৩টি উপজেলাতেই কমবেশি পানির সংকট আছে। এপ্রিলে তাড়াইল ও পাকুন্দিয়াতেও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় নলকূপ ও পাম্পে পানি না ওঠার খবর আসে।

‎চলতি বছরের এপ্রিলেও এক প্রতিবেদনে কিশোরগঞ্জের প্রায় ৩৫ শতাংশ মানুষ নিরাপদ সুপেয় পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত বলে উল্লেখ করা হয়। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

‎বাংলাদেশ পানি আইন, ২০১৩-এ পানি ব্যবহারের অগ্রাধিকারে খাবার পানিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই আইনে ভূগর্ভস্থ পানির নিরাপদ আহরণ সীমা বা ‘সেফ ইয়িল্ড’ বিবেচনায় নিয়ে পানি উত্তোলন নিয়ন্ত্রণের বিধান রয়েছে। বাংলাদেশ পানি বিধিমালা, ২০১৮-এ ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ক্ষেত্রে অনাপত্তিপত্রের ব্যবস্থাও রয়েছে। এ ছাড়া কৃষিকাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনার জন্য ২০১৮ সালের আইন ও ২০১৯ সালের বিধিমালা রয়েছে।

‎অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের প্রভাব শুধু খাবার পানির সংকটেই সীমাবদ্ধ নয়। পানির স্তর নেমে গেলে অগভীর নলকূপ অকেজো হয়ে যেতে পারে, সেচের খরচ বাড়তে পারে এবং ভূগর্ভস্থ ও ভূউপরিস্থ পানির স্বাভাবিক ভারসাম্য ব্যাহত হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে মাটির স্তর সংকুচিত হয়ে ভূমি অবনমন, স্থাপনায় ফাটলসহ বিভিন্ন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ভূ-প্রকৃতি অনুযায়ী আর্সেনিক বা লবণাক্ততার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

‎কুলিয়ারচর উপজেলা জনস্বাস্থ্য উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোঃ ইফতেখার আহমেদ বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে খাবার পানির সংকট তৈরি করতে পারে। ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে ভূউপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। কুলিয়ারচরে সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন করা গেলে নিরাপদ খাবার পানি সরবরাহের পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপও কমানো সম্ভব।

‎উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াসিন খন্দকার বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে খাবার পানির উৎস সংরক্ষণে গুরুত্ব দিতে হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

‎সংশ্লিষ্টদের মতে, কুলিয়ারচরে এখনই ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ও উত্তোলনের পরিমাণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি কোন কাজে কত পানি ব্যবহার হচ্ছে, তার হিসাব করা প্রয়োজন। খাবার পানিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কৃষি, মাছ চাষ ও শিল্পকারখানায় ভূউপরিস্থ পানি ও বৃষ্টির পানি ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো গেলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো সম্ভব।

‎কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার পানির সংকট তাই কুলিয়ারচরের জন্যও সতর্কবার্তা। সংকট দেখা দেওয়ার পর বিকল্প খোঁজার চেয়ে, সংকট আসার আগেই ভূগর্ভের পানি রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়াই এখন সময়ের দাবি।

—জা. অর্থনীতি/এলএটি