আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতের মধ্যপ্রদেশের একটি সরকারি হাসপাতালে প্রথম সন্তান জন্ম দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই মারা গেছেন ২৫ বছর বয়সী এক নারী। বাঁচেনি তার নবজাতক সন্তানও।
এ ঘটনার আগে ওই নারীকে কাঁদতে ও চিৎকার করতে দেখা যায়। ‘এভাবে চিকিৎসা চলতে থাকলে এই মানুষগুলো আমাকে মেরে ফেলবে’ বলে পরিবারকে উদ্দেশ করে তিনি বারবার তাকে সেখান থেকে নিয়ে যাওয়ার আকুতি জানান।
পরিবারের অভিযোগ, সময়মতো যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ায় মা ও শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
দেশটির সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি বলছে, সন্তান জন্ম দেওয়ার পর মারা যাওয়া ওই নারীর নাম কল্পনা মিশ্র। তিনি মধ্যপ্রদেশের রেওয়া জেলার হাতওয়া এলাকার বাসিন্দা।
‘আমরা পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরও দখল করে নেব’
নতুন সদস্যকে স্বাগত জানাতে হাসপাতালে গিয়েছিল পরিবারটি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের ঘরে ফিরতে হয় ২ জনকে হারিয়ে। মূলত সন্তান জন্মের কিছুক্ষণ পরই কল্পনা ও তার নবজাতকের মৃত্যু হয়।
এখন তদন্তের মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে- কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে এই দুইজনের মৃত্যু হলো।
কল্পনার চাচা ধর্মেন্দ্র মিশ্র বলেন, মঙ্গলবার তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রসবের সময় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার তার মৃত্যু হয়।
কল্পনার মৃত্যুর আগে ধারণ করা একটি ভিডিও এরই মধ্যে সামনে এসেছে এবং ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে চরম অসুস্থ ও অস্থির অবস্থায় এক তরুণীকে দেখা যায়। নারী ওয়ার্ডের ভেতরে কল্পনাকে কাঁদতে ও চিৎকার করতে দেখা যায়। তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন এবং স্বজনদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এ সময় নার্সিং বিভাগের কর্মীদের তাকে আটকে রাখেন এবং হাসপাতালে থাকার জন্য বোঝানোর চেষ্টা করেন।
ভারতে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত, ২ পাইলট নিহত
কল্পনার বাবা রামশরণ মিশ্রের অভিযোগ, কল্পনাকে পরীক্ষা করে তার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য তিনি একাধিকবার চিকিৎসকদের কাছে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তার অনুরোধকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
রামশরণের দাবি, সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পাওয়ায় কল্পনার অবস্থার আরও অবনতি ঘটে।চিকিৎসায় যারা অবহেলা করেছে, পুলিশকে তাদের বিরুদ্ধে এফআইআর করতে হবে। দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ও কর্মীদের বরখাস্ত করতে হবে। আমাদের দাবি পূরণ না হলে আমরা ময়নাতদন্ত করতে দেব না।
পরিবারের সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি অ্যানেসথেশিয়া নিয়ে। স্বজনদের দাবি, অ্যানেসথেশিয়া দেওয়ার পর কল্পনা আর জ্ঞান ফিরে পাননি। অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যানেসথেশিয়া দেওয়া হয়েছিল কি না এবং সেটিই তার মৃত্যুর পেছনে ভূমিকা রেখেছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তারা।
কলকাতার ‘শিখা ইন’ হোটেলের মালিক বীরেশ্বর মিত্র গ্রেপ্তার
এদিকে মা ও নবজাতকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে কল্পনার স্বজনেরা হাসপাতালের প্রধান ফটকে জড়ো হয়ে অবস্থান নেন। এ সময় প্রায় ৪ ঘণ্টা ধরে হাসপাতালে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি বিরাজ করে।
পরিবারের সদস্যরা শুরুতে ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত ময়নাতদন্ত করতে দিতে অস্বীকৃতি জানান। পরে হাসপাতালের ডিন চিকিৎসক সুনীল আগরওয়াল এবং হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট চিকিৎসক রাহুল মিশ্র ঘটনাস্থলে পৌঁছালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও কল্পনার পরিবারের মধ্যে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়।
পরে সিদ্ধান্ত হয়, জেলা হাসপাতালের চিকিৎসকদের দিয়ে কল্পনার ময়নাতদন্ত করা হবে। একই সঙ্গে প্রশাসন প্রাথমিকভাবে দুটি শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেয়। দায়িত্বে থাকা দুই নার্সিং কর্মকর্তা সাধনা ভার্মা ও সীমা মুজালদেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
প্রশাসন জানিয়েছে, তদন্তে কেউ দায়ী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চিকিৎসা নিতে কলকাতায় গিয়েছিলেন নিহত বাংলাদেশিরা
হাসপাতালের ডিন চিকিৎসক সুনীল আগরওয়াল এই মৃত্যুকে অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, পরিবারের করা অভিযোগগুলো তদন্ত করে দেখা হবে।
তবে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ নাকচ করে হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট চিকিৎসক রাহুল মিশ্র বলেন, ‘ওই নারীকে চিকিৎসার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে কোনও অবহেলা ছিল না। তবে পরিবারের করা অভিযোগগুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’
এনডিটিভি বলছে, মধ্যপ্রদেশে চিকিৎসকের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। ২০২৫-২৬ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রদেশে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের জন্য অনুমোদিত চারটি পদের মধ্যে প্রায় তিনটিই খালি। রাজ্যটিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের জন্য অনুমোদিত পদ রয়েছে ৫ হাজার ৪৪৩টি। এর মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ১ হাজার ৪৯৫ জন। অর্থাৎ ৩ হাজার ৯৪৮টি পদই খালি।
—জা. অর্থনীতি/এনজে