জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: প্রায় ৫০৭ কোটি ৫১ লাখ টাকার ঋণ জালিয়াতির মামলায় দুর্নীতি দমন কমিশনের আসামি হয়েও একটি তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নীতি নির্ধারক অর্থাৎ স্বতন্ত্র পরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করছেন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম চৌধুরী।
মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসির এই বিশাল পরিমাণ ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে গত ৮ জানুয়ারি ১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০ ও ১০৯ ধারাসহ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের গুরুতর ধারায় তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এমন গুরুতর ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিই বর্তমানে এনআরবি ব্যাংক পিএলসির স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সংবাদমাধ্যমে পাওয়া তথ্য এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ও দুদকের কাছে দেওয়া ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিঠির ভিত্তিতে জানা যায়, যে সময়ের আর্থিক অনিয়মের ওপর ভিত্তি করে দুদক মামলা করেছে, সেই সময় মো. কামরুল ইসলাম চৌধুরী মার্কেন্টাইল ব্যাংকের এমডি ও সিইও পদে দায়িত্বে ছিলেন। পরবর্তীতে গত বছরের মার্চে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক আদেশের পর তিনি এনআরবি ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক পদে যোগ দেন। গত ৩ আগস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পরিচালনা পর্ষদ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও দুদকের কাছে দেওয়া চিঠিতে ব্যাংকের একদল কর্মকর্তা-কর্মচারী এই নিয়োগ এবং করপোরেট সুশাসন নিয়ে মারাত্মক প্রশ্ন তুলেছেন।
দুদকের মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আসামিরা পরস্পরের যোগসাজশে কোনো পর্যাপ্ত জামানত ছাড়াই ঋণ অনুমোদন এবং ব্যাপক অনিয়ম সংগঠিত করেছেন। তদন্তে উঠে এসেছে, ব্যাংকিং আইন স্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করে অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট থেকে নেওয়া দুটি বৈদেশিক মুদ্রার মেয়াদি ঋণকে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে স্থানীয় মুদ্রায় নতুন মেয়াদি ঋণে রূপান্তর করা হয়। পরবর্তীতে শ্রেণিকৃত ঋণের দায় নিষ্পত্তির অজুহাতে নতুন ঋণ সৃষ্টি করে তার মেয়াদ আরও সাত বছর বাড়িয়ে গ্রাহককে অন্যায্য সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
অবশ্য ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, কোনো মামলা বা অভিযোগ উত্থাপিত হওয়াই চূড়ান্ত অপরাধ প্রমাণের সমতুল্য নয় এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বিচার সম্পন্ন হবে। তবে তাদের মূল বক্তব্য হলো—একটি তফসিলি বাণিজ্যিক ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক পদটি চরম আস্থা ও আমানতের জায়গা। যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থ পাচার ও ব্যাংক জালিয়াতির মতো বড় আর্থিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ ঝুলছে, সেখানে একজন ব্যক্তি এমন উচ্চ পদে বহাল থাকা ব্যাংকিং খাতের নৈতিক মানদণ্ড ও আমানতকারীদের আস্থাকে সরাসরি ক্ষুণ্ন করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে দেওয়া আবেদনে কামরুল ইসলাম চৌধুরীর নিয়োগ অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা এবং নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী তা যাচাই করার জোর দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ব্যাংকের সুশাসন ও সুনাম রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
দুদকের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে, যেন কোনো ধরনের বাহ্যিক বা অনৈতিক প্রভাব ছাড়া তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হয়। চিঠিটিতে ইতিপূর্বে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য পদত্যাগ করা অপর স্বতন্ত্র পরিচালক এ কে এম মিজানুর রহমানের উদাহরণ টেনে পুনর্গঠিত ব্যাংকগুলোতে পরিচালক নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়েই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।