ওয়াটার বাস সার্ভিস ব্যর্থ ১২ কারণে

ইবরাহীম মাহমুদ আকাশ, ঢাকা: ঢাকার চারপাশের নৌপথে ১২টি কারণে ব্যর্থ হয় ওয়াটার বাস সার্ভিস। এর প্রধান ও অন্যতম কারণ ছিল স্থানীয় প্রভাশালী ও ট্রলার মালিকদের বাধায় বেশিদিন চলতে পারেনি এই সার্ভিসটি। যাত্রীদের কাছে জনপ্রিয় হলেও বুড়িগঙ্গা নদীতে ওয়াটার বাস দিয়ে খেয়া পারাপার সার্ভিসও স্থায়ী হয়নি। ২০১০ সালের আগস্টে প্রথম চালু হয় ওয়াটার বাস সার্ভিস। ২০২০ সালের মার্চে এই সার্ভিসটি বন্ধ হয়। ১০ বছর ওয়াটার বাস পরিচালনা করতে ব্যয় হয় ৩৭ কোটি ৮৬ লাখ ৭৯ হাজার টাকা। আয় হয় মাত্র ২ কোটি ৫২ লাখ ৮ হাজার টাকা। ওয়াটার বাস পরিচালনা করে ৩৫ কোটি ৩৪ লাখ ৭১ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে বলে নৌ-মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

আরো পড়ুন

প্রথম পর্ব: ২৬ বছরে ভুল পরিকল্পনায় ব্যয় ২ হাজার কোটি টাকার বেশি

দ্বিতীয় পর্ব: ৪২৪টি ড্রেনের মাধ্যমে দূষিত হচ্ছে ঢাকার ৫ নদী

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার চারপাশের এত সুন্দর নৌপথ বিশ্বের অনেক দেশেই নেই। কিন্তু অযত্ন ও অবহেলায় এই নৌপথ আমরা নষ্ট করে ফেলছি। তাই ১১০ কিলোমিটার নৌপথে আধুনিক নৌযান চালু হলে সড়কে যানবাহনের চাপ ৩০ শতাংশ কমে যাবে। এজন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে সমন্বিত মহাপরিকল্পনা নেওয়ার পরামর্শ তাদের।

এ বিষয়ে পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘বিশ্বের অনেক দেশেই ওয়াটার বাস সার্ভিস অনেক জনপ্রিয়। তারা কৃত্রিমভাবে চ্যানেল তৈরি করে ওয়াটার বাস পরিচালনা করে। আমরা প্রাকৃতিক আশীর্বাদ হিসেবে ঢাকার চারপাশে বৃত্তাকার নৌপথ পেয়েছি। এত সুন্দর নৌপথ বিশ্বের অনেক দেশেই নেই। এখনও সময় আছে ঢাকার বৃত্তাকার নৌপথ ব্যবহারের উপযোগী করা। এজন্য সমন্বিতভাবে একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।’ 

ওয়াটার বাসে লোকসান ৩৫ কোটি টাকার বেশি
নৌ-মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রাজধানী ঢাকার চারপাশে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, বালু ও ধলেশ্বরী নদী সমন্বয়ে বৃত্তাকার নৌপথের দৈর্ঘ্য ১১০ কিলোমিটার। এই নৌপথে অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)’র ১২টি ওয়াটার বাসের সমন্বয়ে ‘ওয়াটার বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছিল। এর মধ্যে ঢাকার বাদামতলী-গাবতলী নৌরুটে ২০১০ সালের ২৮ আগস্ট এবং নারায়ণগঞ্জ-টঙ্গী নৌরুটে ২০১৪ সালের ২২ নভেম্বর ওয়াটার বাস চালু করা হয়। আর্থিকভাবে লাভ না হওয়ায় ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নারায়ণগঞ্জ-টঙ্গি নৌরুটে এবং ২০২০ সালের মার্চ মাসে বাদামতলী-গাবতলী নৌরুটে ওয়াটার বাস সার্ভিস বন্ধ করা হয়।

ঢাকা শহরের যানজট নিরসনের লক্ষ্যে ঢাকার চারদিকে বৃত্তাকার নৌপথে যাত্রী সাধারণের যাতায়াতের সুবিধার্থে সরকারি নির্দেশনায় ওয়াটার বাস ২০১০, ২০১৩ ও ২০১৪ সালে নির্মাণ করা হয়। প্রথম দফায় ২টি, দ্বিতীয় দফায় ৪টি এবং সর্বশেষ ৬টিসহ সর্বমোট ১২টি। নির্মাণ ব্যয় হয় ৯ কোটি ২০ লাখ ৩২ হাজার ৩০৬ টাকা। ওয়াটার বাস পরিচালনা করে আয় হয়েছে ২ কোটি ৫২ লাখ ৮ হাজার টাকা। মোট ব্যয় ৩৭ কোটি ৮৬ লাখ ৭৯ হাজার টাকা। ওয়াটার বাস পরিচালনা করে ১০ বছরে  ৩৫ কোটি ৩৪ লাখ ৭১ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে বলে সংশ্লিস্টরা জানান।  

এ বিষয়ে নৌ-মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘আজকে (রোববার) মন্ত্রণালয়ে ঢাকার চারপাশের নৌপথে ওয়াটার বাস সার্ভিস চালুর বিষয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে আগের ওয়াটার বাসের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে। এ ছাড়া বিআইডব্লিউটিসির পক্ষ থেকে বৈদ্যুতিক ওয়াটার চালুর একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই প্রস্তাবগুলো যাচাই-বাচাই করার জন্য একটি কমিটি কাজ করছে। সরকার বৃত্তাকার নৌপথ দখল-দূষণমুক্ত করার পাশাপাশি আধুনিক নৌযান চালুর পরিকল্পনা করছে।’

১২ কারণে ব্যর্থ ওয়াটার বাস সার্ভিস
নৌ-মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ১২টি ওয়াটার বাসের মধ্যে বর্তমানে সচল আছে ৩টি ওয়াটার বাস। এ ছাড়া পরিত্যক্ত অবস্থায় বিক্রয়ের জন্য ৯টি ওয়াটার বাস তালিকাভুক্ত রয়েছে। সচল ওয়াটার বাসের মধ্যে ওয়াটার বাস ৬ এবং ওয়াটার বাস ১০ বর্তমানে আরিচা-কাজির হাট নৌরুটে ভাড়ায় রয়েছে। একই রুটে অপর একটি ওয়াটার বাস ১২ চার্টারে পরিচালনার লক্ষ্যে হস্তান্তরের অপেক্ষায় রয়েছে বলে বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তারা জানান।

নৌমন্ত্রণালয়ের সংস্থা নৌপথে অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) ওয়াটার বাস বন্ধের জন্য ১২ কারণ চিহ্নিত করেছে। এগুলো হলো —গাবতলী-সদরঘাট বেড়িবাঁধ সড়কে বাসে যাতায়াতে সময় কম লাগে; দূষিত বুড়িগঙ্গা নদীর পানির দুর্গন্ধের কারণে যাত্রীরা ওয়াটার বাসে উঠত না; সদরঘাট এলাকায় সার্বক্ষণিক সড়কে যানজট থাকায় ওয়াটার বাসে যাত্রীদের আগ্রহ কমে যায়; গাবতলী ল্যান্ডিং স্টেশনের যাতায়াতব্যবস্থা ভালো ছিলো না; খোলামুড়া বসিলা স্টেশনে স্থানীয় লোক ও ট্রলার মালিকদের বাধা প্রদান; সদরঘাট-গাবতলী রুটে বালুর ট্রলার চলাচল কারণে ওয়াটার বাসে গতি কম থাকত; যানজটের কারণে ওয়াটার বাসের ঘাট যাত্রীদের পৌঁছতে দেরি হত; তাই মধ্যবর্তী স্টেশনগুলো তেমন যাত্রী পাওয়া যেতো না; বাদামতলী ব্রিজের নিচ হতে সড়ক পথে স্বল্প সময়ে যাত্রীরা সাম্ভাব্য গন্তব্যে পৌঁছাতে পারত; ওয়াইজঘাট-গাবতলী নৌ রুটের ওয়াটার বাসে যাত্রীদের ওঠানামার পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা না থাকা; নারায়ণগঞ্জ-টঙ্গী নৌ-রুটে মধ্যবর্তী ল্যান্ডিং স্টেশনগুলো অবকাঠামো না থাকায় ওয়াটার বাস ভেড়ানো সম্ভব হয়নি; নারায়ণগঞ্জ ও টঙ্গিতে ট্রেনের যাত্রীরা দ্রুততম সময়ে গন্তব্য পৌঁছাতে পারত; বাদামতলী ব্রিজের নিচ থেকে গাবতলী পর্যন্ত বিআরটিসি বাস সার্ভিসে দ্রুত যাতায়াত করতো যাত্রীরা। তাই ওয়াটার বাসে সময় বেশি লাগায় যাত্রী পাওয়া যেতো না। তবে ঢাকার ১১০ কিলোমিটার বৃত্তাকার নৌপথের বিভিন্ন স্থানে একাধিক নিচু সেতুর কারণে পুরো অংশে ওয়াটার বাস সার্ভিস চালু করা সম্ভাব্য হয়নি বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

আধুনিক নৌযান চালু হলে সড়কে ৩০ শতাংশ চাপ কমবে
সম্প্রতি ওয়াটার বাস নিয়ে নৌ-মন্ত্রণালয়ে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠক সূত্র জানায়, বর্তমানে সদরঘাট থেকে নৌপথে ট্রলার সার্ভিসে সোয়ারীঘাট, খোলামুড়া, কামরাঙ্গীরচর, বসিলা, পোস্তগোলা, পাগলা, ফতুল্লা ও হাসনাবাদ নৌরুটে যাত্রী চলাচল করছে। তাই ঢাকার বৃত্তাকার নৌপথে আধুনিক নৌযান চালু হলে সড়কে যানবাহনের চাপ ৩০ শতাংশ কমে যাবে বলে জানান সংশ্লিস্টরা।

তাই ঢাকা শহরের চারিদিকে সার্কুলার ওয়াটার ওয়েজ বা বৃত্তাকার নৌপথ চালু করার লক্ষ্যে বৃত্তাকার নৌপথে দ্রুতগামী লঞ্চ বা স্পিডবোট, যাত্রীবাহী ক্যাটামেরিন, পর্যটকবাহী নৌযান পরিচালনায় আগ্রহী মালিক বা অপারেটরদের সমন্বয়ে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান সভাপতিত্বে গত ১৪ জুলাই একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয়— ঢাকার নদী দখল ও দূষণমুক্ত করা; ট্যুরিস্ট ও যাত্রী পরিবহনে আধুনিক ল্যান্ডিং স্টেশন স্থাপন করা; ঘাট ব্যবহারে যাত্রীদের হতে প্রবেশ ফি আদায় না করা এবং ঘাটে কুলি হয়রানি বন্ধ করা; বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে নৌযান ডিজাইন করে একই ধরনের নৌযান নির্মাণ; প্রয়োজনে যাত্রীবাহী নৌযান ও ট্যুরিস্ট বোটের জন্য আলাদা ল্যান্ডিং সুবিধা; ল্যান্ডিং স্টেশনের সঙ্গে যুক্ত সংযোগ সড়ক সংস্কার ও প্রশস্ত করাসহ সড়কে পর্যাপ্ত পাবলিক সার্ভিসের ব্যবস্থা রাখা; স্বল্প খরচে উন্নত যাত্রী সেবা নিশ্চিত করা; প্রতিটি নৌযানে ও ঘাট বা পয়েন্টে যাত্রী নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। 

এ বিষয়ে বুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, আধুনিক নৌযান চালু করতে নৌপথ সঙ্গে সড়ক পথের আন্তঃসংযোগ করতে। আমার মতামত বেসরকারি উদ্যোগে এটা ছেড়ে দেওয়া উচিত। কারণ শুধু ওয়াটার বাস চালু করলেই হবে না। ভালো মানের ওয়াটার বাস দিতে হবে। আগের ওয়াটার বাসগুলো ছিলো অনেকটা বয়লারের মতো। ইঞ্জিনের শব্দ ও গরমে যাত্রীরা ভেতরে কষ্ট পেত। তাই ওয়াটার বাসগুলো আধুনিক ক্যাটামেরিনের মতো হতে হবে।

তিনি আরও বলেন, নৌপথ যাতে দূষিত না হয় এজন্য ইলেকট্রিক নৌযান চালাতে হবে। শব্দ দূষণ যাতে না হয় দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। একইসঙ্গে বৃত্তাকার নৌপথের দূষণমুক্ত করতে। এ ছাড়া এলোমেলোভাবে চলাচল করা অন্যান্য নৌযানও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাই ঢাকার চারপাশে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ট্যুরিস্ট ও যাত্রী পরিবহনে ওয়াটার বাস সার্ভিস চালু হলে সড়কপথে ৩০ শতাংশ যানবাহনের চাপ কমে যাবে।