৪২৪টি ড্রেনের  মাধ্যমে দূষিত হচ্ছে ঢাকার ৫ নদী

ইবরাহীম মাহমুদ আকাশ, ঢাকা: সরকারি ও বেসরকারি চার শতাধিক ড্রেনের মাধ্যমে দূষিত হচ্ছে ঢাকার নদীগুলো। এসব ড্রেন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার কেজি বিষাক্ত তরল ও কঠিন বর্জ্য পড়ছে বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার অন্য নদীতে। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ শিল্প বর্জ্য। এছাড়া সিটি করপোরেশন, ওয়াসা ও ইউনিয়ন পরিষদের সৃষ্ট ড্রেনেজের মাধ্যমে ৩০ শতাংশ কঠিন বর্জ্য পড়ছে নদীতে। পাশাপাশি ১০ শতাংশ গৃহস্থালি ও অন্যান্য বর্জ্যের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে ঢাকার চারপাশের নদীগুলো।

প্রথম পর্ব: ২৬ বছরে ভুল পরিকল্পনায় ব্যয় ২ হাজার কোটি টাকার বেশি


দূষণের ফলে নদীর পানি তার স্বাভাবিক রঙ হারিয়ে ফেলেছে। বুড়িগঙ্গার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ শূন্যের কোটায় মেনে এসেছে। অথচ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-২০০৭ অনুযায়ী মৎস্য ও জলজ প্রাণীর জন্য প্রতি লিটার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন থাকা প্রয়োজন ৫ মিলিগ্রাম বা তার বেশি। তাই বুড়িগঙ্গার পানিতে মাছ-পোকামাকড়সহ কোনো প্রাণীই বেঁচে থাকতে পারছে না বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

এজন্য ঢাকার নদীগুলো বাঁচাতে সবার আগে দূষণ বন্ধ করার পরামর্শ পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞদের। তাদের মতে, নদী দূষিত হওয়ার উৎসমুখ চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং নদীতে দূষিত বর্জ্য বন্ধ করতে তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) চালু করা। পাশাপাশি শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে সরাসরি তরল বর্জ্য যাতে নদীতে না ফেলে সেজন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

এ বিষয়ে পরিবেশবিদ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘ঢাকার নদীগুলো দূষণের এক নম্বর ক্রিমিনাল হলো ঢাকা ওয়াসা। ঢাকা শহরের যত পয়োবর্জ্য আছে, সব ড্রেনের মাধ্যমে নদীতে ফেলা হচ্ছে। অথচ এসব পয়োবর্জ্য শোধন করার জন্য ঢাকায় চারটি পয়োশোধনাগার স্থাপনের কথা ছিল। ইতোমধ্যে দাশেরকান্দি পয়োশোধনাগার নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু তা-ও যথাযথভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না। এ রকম আরও তিনটি পয়োশোধনাগার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো বাস্তবায়িত হলে নদী দূষণ অনেকটা কমে যাবে। পাশাপাশি নদীর সঙ্গে ঢাকার খালগুলোর সংযোগ স্থাপন করতে হবে। এজন্য পরিবেশ অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংস্থাগুলো একটি সমীক্ষা করছে। এই সমীক্ষার মাধ্যমে একাধিক প্রকল্প নেওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু এসব প্রকল্প জনসম্মুখে প্রকাশ করে সবার মতামত নিতে হবে। তা না হলে শুধু হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও ঢাকার নদীর রক্ষা হবে না।’

৪২৪টি ড্রেনে দিয়ে দূষিত হচ্ছে নদী 
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ঢাকার চারটি বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা দূষিত হচ্ছে সরকারি ও বেসরকারি ৪২৪টি ড্রেনের মাধ্যমে। এসব ড্রেন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার কেজি বিষাক্ত তরল ও কঠিন বর্জ্য পড়ছে ঢাকার নদীতে। 

নৌমন্ত্রণালয়ের সংস্থা অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) এক জরিপে উল্লেখ করা হয়, ঢাকার চারপাশের নদীতে তরল বর্জ্যের উৎসমুখ বা ড্রেনের সংখ্যা মোট ৪২৪টি। এর মধ্যে ঢাকা ওয়াসার ৬৬টি ড্রেন দিয়ে দূষিত হচ্ছে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদী। বুড়িগঙ্গা নদীতে ওয়াসার ড্রেন যুক্ত রয়েছে ৫৭টি ও তুরাগ নদীতে রয়েছে ৯টি ড্রেন।

এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ২১টি ড্রেন দিয়ে দূষিত তরল বর্জ্য পড়ছে নদীতে। এর মধ্যে সরাসরি ১৯টি ড্রেন দিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে ও দুটি ড্রেন দিয়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে ময়লা পানি ফেলছে ডিএসসিসি। একইভাবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ১৬টি ড্রেনের মাধ্যমে নদীতে ময়লা পানি ফেলছে। এর মধ্যে একটি ড্রেন দিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে ও ১৫টি ড্রেন দিয়ে তুরাগ নদী দূষিত করছে ডিএনসিসি। একইভাবে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৩৭টি ড্রেন দিয়ে তরল ময়লা পড়ছে শীতলক্ষ্যা নদীতে। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের দূষিত তরল ময়লা চারটি ড্রেন দিয়ে পড়ছে তুরাগ নদীতে। পোস্তগোলা সেনানিবাসের দুটি ড্রেন বুড়িগঙ্গা নদীর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।

সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভায় ড্রেনগুলো দূষিত করছে ঢাকার নদীগুলো। এর মধ্যে কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদের তিনটি, জিনজিরা ইউনিয়ন পরিষদ একটি,  কালিন্দী ইউনিয়ন পরিষদের দুটি ও শাক্তা ইউনিয়ন পরিষদ দুটি ড্রেনের মাধ্যমে তরল বর্জ্য ফেলছে বুড়িগঙ্গা নদীতে। এছাড়া কাউন্দিয়া ইউনিয়ন পরিষদের তিনটি ড্রেনের মাধ্যমে দূষিত হচ্ছে তুরাগ নদী। একইভাবে রূপগঞ্জ পৌরসভার ১০টি, তাবারো পৌরসভার পাঁচটি, কাঞ্চন পৌরসভার একটি, ঘোড়াশাল পৌরসভার একটি, বালিগাঁও ও কালীগঞ্জ পৌরসভার দুটি ড্রেনের মাধ্যমে দূষিত হচ্ছে শীতলক্ষ্যা নদী।

এছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি ড্রেন দিয়ে তরল ও দূষিত বর্জ্য পড়ছে তুরাগ নদীতে। পাশাপাশি কাঁচপুর ইউনিয়ন পরিষদের দুটি ও রূপগঞ্জ পৌরসভার একটি ড্রেনের মাধ্যমে দূষিত হচ্ছে শীতলক্ষ্যা নদী। পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি ও ব্যক্তি মালকানাধীন কল-কারখানা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের ২৪৪টি ড্রেনের মাধ্যমে তরল ও দূষিত বর্জ্য পড়ছে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যা নদীতে। 

এ বিষয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘ঢাকার নদীগুলো দূষণের উৎসমুখ চিহ্নিত করতে সরেজমিন একটি জরিপ করা হয়। এই জরিপের মাধ্যমে ৪২৪টি বর্জ্যের উৎসমুখ চিহ্নিত করা হয়। যেগুলো দিয়ে প্রতিদিন তরল দূষিত বর্জ্য নদীতে পড়ছে। এগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা নদী দূষণ বন্ধ করে।’ এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দুই-একদিনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের সঙ্গে বৈঠক করা হবে বলে জানান তিনি। 

৬০ শতাংশ শিল্প বর্জ্য পড়ছে ঢাকার নদীতে
ঢাকার চারপাশের নদীগুলো দূষণের কারণ হিসেবে বিআইডব্লিউটিএর এক কর্মপরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়, রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকাগুলোতে ছোট বড় মিলে নদীর পাড়ে প্রায় ৭ হাজার শিল্প-কারখানা রয়েছে। এসব শিল্প-কারখানার ৯৯ ভাগেরই তরল বর্জ্য পানি শোধনাগার (ইটিপি) নেই। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে ৬০ শতাংশ শিল্প বর্জ্য নদীতে পড়ছে। এছাড়া ইটভাটা, পলিথিন, ডকইয়ার্ড ও পোড়া মোবিলসহ ৩০ শর্তাংশ কঠিন বর্জ্য ও ১০ শতাংশ নৌযান ও গৃহস্থালি বর্জ্য দ্বারা ঢাকার চারপাশের নদীগুলো দূষিত হচ্ছে।

শিল্প বর্জ্যের আউটলেটগুলো স্যুয়ারেজের সঙ্গে সংযোগ করে দেওয়ায় সরাসরি বর্জ্য নদী পড়ে পানি দূষিত হচ্ছে। কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ ও ট্যানারির বর্জ্য নদীর পানি সরাসরি পড়ায় তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পানি দূষিত করছে। এছাড়া হাসপাতার বর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ায় অ্যান্টিবায়টিক, এমক্সসিলিন, পেনিসিলিন, সিপ্রোফ্লাসিলিন ও অ্যাজিথ্রোমাইসিনের মতো উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়টিক পাওয়া গেছে বুড়িগঙ্গার পানিতে। এছাড়া নদীতে চলাচলরত নৌযানের কালো তেল, পোড়া মবিল এবং মানব সৃষ্ট বর্জ্য সরাসরি নদীর পানিকে দূষিত করছে। প্রতিদিন নদীর তীরে বিভিন্ন এলাকায় হাট-বাজার ও মার্কেট থেকে পচা ফলমূল এবং দূষিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলার কারণে পানি দূষিত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।