ব্যাংক ফাঁকা, দুর্নীতি চরমে—তবুও বাংলাদেশ কেন শ্রীলঙ্কা হলো না?
ছবি: এআই জেনারেটড

অনলাইন ডেস্ক:  দুর্নীতি, কোটি কোটি টাকা পাচার, বন্ধ কারখানা আর খেলাপি ঋণের পাহাড় মিলিয়ে একটা দেশের ধসে পড়ার জন্য যথেষ্ট। তবুও দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। সব তথ্যপ্রমাণ, নথিপত্র আর আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান এক জায়গায় রাখলে যেকোনো অর্থনীতিবিদের মাথা ঘুরে যাওয়ার কথা।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের 'করাপশন পারসেপশন ইনডেক্স'-এর গোপন নথি বলছে, ১০০-এর মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর এখন মাত্র ২৩—যা গত ১৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে অবস্থান নেমে গেছে ১৫১-তে।

টিআইবির আন্তর্জাতিক হাউসহোল্ড সার্ভে অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, গত ১৫ বছরে সাধারণ মানুষ শুধু সরকারি সেবা পাওয়ার নাম করে ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৫২ কোটি টাকা!

আরও পড়ুন: পে-স্কেলে সুখবরের আড়ালে বড় শর্ত

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—পাসপোর্ট পাওয়ার ক্ষেত্রে ৮৬ শতাংশ পরিবার দুর্নীতির শিকার, বিআরটিএ-তে ৮৫.২ শতাংশ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থায় ৭৪.৫ শতাংশ, বিচার বিভাগে ৬২.৩ শতাংশ, আর সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় ৪৯.১ শতাংশ। অর্থাৎ এই দেশে নাগরিক অধিকার বা সেবা পেতে হলে প্রতি দুটি পরিবারের একটিকে ঘুষের থলি হাতে দাঁড়াতে হয়েছে।

ব্যাঙ্কিং খাত

নথিপত্র বলছে, ২০২৪-এর শেষে মোট ঋণের ২০.২ শতাংশই ছিল খেলাপির খাতায়, যার পরিমাণ ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা! রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে পরিস্থিতি আরও করুণ—সেখানে খেলাপি ঋণ ৪২.৮ শতাংশ, যা গোটা এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। ভারতের যেখানে মাত্র আড়াই শতাংশ আর ভিয়েতনামে ৫ শতাংশের কম। 

নথিপত্র বিশ্লেষণ করলে একটি স্পষ্ট সত্য বেরিয়ে আসে—যাদের হাতে নীতি নির্ধারণ ও ক্ষমতার চাবি ছিল, তারা দেশকে বাঁচায়নি। দেশ বাঁচিয়েছে তারাই, যাদের হাতে কোনোদিন কোনো ক্ষমতা ছিল না।

আরও পড়ুন: ‘নাবিল গ্রুপের ফাঁদে’ ইউসিবি

তথ্য বলছে, এক বছরে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ৩০.৩২ বিলিয়ন ডলার—যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিটেন্স। ২৫ শতাংশের বেশি এই বৃদ্ধির পেছনে নেই কোনো সুশীল সমাজের মাস্টারপ্ল্যান। মধ্যপ্রাচ্যের ধূলিঝড়, মালয়েশিয়ার বিষাক্ত রাসায়নিক আর সিঙ্গাপুরের উঁচুতলার কনস্ট্রাকশন সাইটে দিন-রাত এক করা প্রবাসীরা এই টাকা পাঠিয়েছেন।

রপ্তানি

৮১ শতাংশ রপ্তানি আয় আসে পোশাক খাত থেকে। আর এই অর্থনীতির আসল ভিত্তি সেই ৪০ লাখ পোশাক শ্রমিক—যাদের সিংহভাগই গ্রাম থেকে আসা কম আয়ের নারী, যাদের রক্তে-ঘামে বেঁচে আছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ।

রাষ্ট্র যখন পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে, সাধারণ মানুষ তখন দেশের পুরো ভার নিজেদের ঘাড়ে তুলে নিয়েছে।

আরও পড়ুন: বাজার স্থিতিশীল রাখতে টিসিবির বড় উদ্যোগ

কিন্তু এই কাঠামোর ভবিষ্যৎ কী?

ইউএনএফপিএর তথ্য সতর্ক করছে—বাংলাদেশের 'ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড' অর্থাৎ তরুণ জনগোষ্ঠীর সুবর্ণ সময় এখন শেষের দিকে। সামনে টিকে থাকতে দরকার ছিল প্রযুক্তি, দক্ষতা আর নতুন শিল্পে বিনিয়োগ। কিন্তু সেই বিনিয়োগ হয়নি; টাকা গায়েব হয়েছে ঘুষে, পাচারে আর খেলাপির খাতায়।

মানুষের সহ্য এবং সক্ষমতার একটি শেষ সীমা থাকে। অনুসন্ধানের চূড়ান্ত প্রশ্ন এটাই—রাষ্ট্রের এই ব্যর্থতা আর কতদিন টেনে নিয়ে যাবে সাধারণ মানুষ?