মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: শত বছরের ঐতিহ্য ও শ্রমিকের ঘামে গড়ে ওঠা দেশের চা শিল্প এখন বিদ্যুৎ সংকটে বিপর্যস্ত। বাগানে পাতা আছে, শ্রমিকও আছেন; কিন্তু নেই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যাহত হচ্ছে চা পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণ। এতে নষ্ট হচ্ছে কাঁচা পাতা, কমছে গুণগত মান, বাড়ছে উৎপাদন খরচ।
দেশের প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো চা শিল্পের বড় একটি অংশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মৌলভীবাজার। জেলার ৯২টি চা-বাগান থেকে দেশের মোট চা উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য অংশ আসে। সম্ভাবনাময় এই শিল্পে বর্তমানে বিদ্যুৎ সংকট নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
চা-বাগান সংশ্লিষ্টরা জানান, গত দুই সপ্তাহ ধরে জেলার বিভিন্ন চা-বাগানে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। এতে দিনের বড় একটি সময় কারখানার যন্ত্রপাতি বন্ধ থাকছে। প্রতিদিন বাগান থেকে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চা পাতা কারখানায় নেওয়া হলেও বিদ্যুৎ না থাকায় সময়মতো সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হচ্ছে না।
চা পাতা উত্তোলনের পর দ্রুত প্রক্রিয়াজাত করা না হলে এর গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়। ফলে নিলামে ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জেনারেটর চালাতে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ হচ্ছে।
চাতলাপুর চা-বাগানের ব্যবস্থাপক শুভঙ্কর চন্দ্র নাথ বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে চা পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসচালিত জেনারেটর থাকলেও তা দিয়ে পুরো কারখানা চালানো সম্ভব নয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে পাতার গুণগত মান নষ্ট হওয়া।’
শমশেরনগর চা-বাগানের ব্যবস্থাপক মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘মেশিন চালু করার পরই বিদ্যুৎ চলে যায়। এতে সময়ও নষ্ট হচ্ছে, চাও নষ্ট হচ্ছে।’
ন্যাশনাল টি কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘লাখ লাখ টাকার যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জেনারেটর চালিয়েও কারখানার সব ইউনিট সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না।’
চা-বাগানের শ্রমিক রমেশ দাস ও নেপাল গোয়ালা জানান, লোডশেডিংয়ের কারণে কাজ বন্ধ থাকায় অনেক সময় অলস বসে থাকতে হচ্ছে তাদের।
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের কমলগঞ্জ জোনাল অফিসের ডিজিএম প্রকৌশলী রঞ্জন কুমার ঘোষ বলেন, জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ১১৬ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৮০ থেকে ৮৫ মেগাওয়াট। ফলে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
চা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্ধারিত সময়ে কাঁচা পাতা প্রক্রিয়াজাত করা না গেলে উৎপাদন ও গুণগত মান—দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে চা শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও কমবে। শতাব্দীপ্রাচীন এ শিল্পকে সংকট থেকে রক্ষা করতে দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি
