দীপু মাহমুদ: বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাদের জীবন যেন একখানা অসমাপ্ত উপন্যাস। তাদের প্রতিভা এত বিস্তৃত, তাদের কাজের পরিধি এত গভীর যে অল্প বয়সে চলে গেলেও তারা সময়কে অতিক্রম করে বেঁচে থাকেন। জহির রায়হান তেমনই এক নাম। তিনি ছিলেন একইসঙ্গে কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, মুক্তিযুদ্ধের দলিল নির্মাতা এবং একজন সাহসী বুদ্ধিজীবী। মাত্র ৩৬ বছরের জীবনে তিনি যে সৃষ্টির স্বাক্ষর রেখে গেছেন, তা তাকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্রষ্টায় পরিণত করেছে।
১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনী জেলার মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জহির রায়হান। তার প্রকৃত নাম ছিল আবু আবদর মোহাম্মদ জহিরউল্লাহ। দেশ ভাগের অস্থিরতা, ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়, পাকিস্তানি শাসনের বৈষম্য এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষা— এসব ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা তার চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
সাহিত্যে ছিল মানুষের অন্তর্গত কষ্টের কথা
জহির রায়হানের প্রথম পরিচয় চলচ্চিত্রকার হিসেবে হলেও তার সৃষ্টিশীল যাত্রার শুরু হয়েছিল সাহিত্য দিয়ে। ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সূর্যগ্রহণ’। এরপর তিনি একে একে লিখেছেন ‘হাজার বছর ধরে’, ‘আরেক ফাল্গুন’, ‘বরফ গলা নদী’, ‘আর কতদিন’-সহ গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস।
তার সাহিত্যিক শক্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তিনি সাধারণ মানুষের জীবনকে দেখতেন গভীর মানবিক দৃষ্টিতে। তার লেখায় শুধু প্রেম বা ব্যক্তিগত সংকট ছিল না; ছিল সমাজের শ্রেণিবৈষম্য, রাজনৈতিক নিপীড়ন, মানুষের স্বপ্ন ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসে তিনি গ্রামীণ বাংলার দীর্ঘ সামাজিক বিবর্তন, মানুষের সুখ-দুঃখ, কুসংস্কার ও অস্তিত্বের সংগ্রামকে তুলে ধরেছেন। এটা শুধু একটি পারিবারিক গল্প নয়; এটা বাংলার সাধারণ মানুষের হাজার বছরের জীবনযাত্রার এক সাহিত্যিক দলিল।
ভাষা আন্দোলন থেকে চলচ্চিত্র: প্রতিবাদের ভাষা ছিল শিল্প
জহির রায়হানের জীবনে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের গভীর প্রভাব ছিল। তিনি ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে তার চলচ্চিত্র ও সাহিত্যে সেই চেতনার প্রতিফলন দেখা যায়।
১৯৭০ সালে নির্মিত তার কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছিল শুধু একটি সিনেমা নয়; এটা ছিল রাজনৈতিক রূপক। একটি পরিবারের স্বৈরাচারী শাসনকে কেন্দ্র করে তিনি তৎকালীন পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি এঁকেছিলেন। চলচ্চিত্রটির মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে একটি পরিবারে যেমন স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়, তেমনি একটি জাতির মধ্যেও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠে।
এই চলচ্চিত্রটি তৎকালীন বাঙালির রাজনৈতিক চেতনায় বড় ভূমিকা রেখেছিল। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, তপন সিংহ ও ঋত্বিক ঘটকের মতো ব্যক্তিত্বও তার কাজের প্রশংসা করেছিলেন।
চলচ্চিত্রে নতুন ভাষার নির্মাতা
জহির রায়হান ছিলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের আধুনিকতার অন্যতম পথিকৃৎ। ১৯৬১ সালে তার পরিচালিত ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এরপর নির্মাণ করেন ‘কাচের দেয়াল’, ‘সঙ্গম’, ‘বাহানা’, ‘বেহুলা’, ‘আনোয়ারা’ এবং ‘জীবন থেকে নেয়া’।
১৯৬৪ সালে নির্মিত ‘সঙ্গম’ পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেয়। পরের বছর ‘বাহানা’ ছিল পাকিস্তানের প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র। এই অর্জনগুলো প্রমাণ করে, প্রযুক্তি ও শিল্প– দুই ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা একজন নির্মাতা।
মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র দলিল: ‘স্টপ জেনোসাইড’
জহির রায়হানের সবচেয়ে ঐতিহাসিক অবদান হলো ১৯৭১ সালে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড।
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা, নির্যাতন এবং শরণার্থীদের দুর্দশার চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার জন্য তিনি এই চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। মাত্র প্রায় ২০ মিনিটের এই প্রামাণ্যচিত্র আজ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিজ্যুয়াল দলিল হিসেবে বিবেচিত।
একজন শিল্পী যখন শুধু সৌন্দর্যের নির্মাতা না হয়ে সত্যের সাক্ষী হয়ে ওঠেন, তখন তার শিল্প ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। ‘স্টপ জেনোসাইড’ ঠিক সেই ধরনের সৃষ্টি।
এটা শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়; এটা ছিল একটি জাতির আর্তনাদকে পৃথিবীর সামনে পৌঁছে দেওয়ার অস্ত্র।
স্বাধীনতার পর হারিয়ে যাওয়া এক নক্ষত্র
১৯৭১ সালের বিজয়ের পরও জহির রায়হানের জীবন শান্ত হয়নি। তার বড় ভাই, প্রখ্যাত সাহিত্যিক শহীদুল্লাহ কায়সার, মুক্তিযুদ্ধের শেষ সময়ে আলবদরদের হাতে অপহৃত হন এবং আর ফিরে আসেননি। ভাইয়ের সন্ধানে ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি জহির রায়হান মিরপুরে যান। এরপর তিনি আর ফিরে আসেননি। ধারণা করা হয়, মিরপুরের সংঘর্ষপূর্ণ পরিস্থিতিতে তিনি নিহত হন। তার অন্তর্ধান বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে আছে।
একজন মানুষ, যিনি মাত্র কয়েক মাস আগে নিজের জীবন বাজি রেখে একটি জাতির গণহত্যার দলিল তৈরি করেছিলেন, স্বাধীন দেশের মাটিতেই হারিয়ে গেলেন– এ যেন ইতিহাসের এক নির্মম ব্যঙ্গ।
জহির রায়হানের প্রাসঙ্গিকতা আজও কেন!
আজকের বাংলাদেশে জহির রায়হানকে নতুন করে পড়া ও দেখা প্রয়োজন। কারণ তার সৃষ্টির কেন্দ্রে ছিল মানুষ।
তিনি বিশ্বাস করতেন, শিল্প শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; শিল্প মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তোলে।
যে সময়ে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা কঠিন ছিল, সে সময়ে তিনি কলম ধরেছেন, ক্যামেরা ধরেছেন। তার সাহিত্য মানুষকে বুঝিয়েছে সমাজের অন্ধকার; তার চলচ্চিত্র মানুষকে দেখিয়েছে মুক্তির স্বপ্ন।
জহির রায়হান আমাদের শেখান একজন শিল্পী তার সময়ের কাছে দায়বদ্ধ। একজন লেখক শুধু গল্প বলেন না, তিনি ইতিহাসের সাক্ষ্যও রেখে যান।
অসমাপ্ত জীবনের পূর্ণ উত্তরাধিকার
জহির রায়হানের জীবন ছিল ছোট, কিন্তু তার সৃষ্টি ছিল বিশাল। তিনি হয়তো আরও বহু উপন্যাস লিখতে পারতেন, আরও বহু চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারতেন, বাংলা চলচ্চিত্রকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু ইতিহাসে কিছু মানুষ তাদের অসমাপ্ত কাজ দিয়েই অমর হয়ে যান।
জহির রায়হান তেমনই একজন
তিনি হারিয়ে গেছেন, কিন্তু তার ক্যামেরার চোখ এখনও আমাদের দেখায় গণহত্যার ভয়াবহতা। তার কলম এখনও প্রশ্ন করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে। তার চলচ্চিত্র এখনও মনে করিয়ে দেয় স্বাধীনতা শুধু একটি ভূখণ্ডের নাম নয়, এটি মানুষের মর্যাদা ও স্বপ্নের নাম।
বাংলাদেশ যতদিন তার ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ধারণ করবে, ততদিন জহির রায়হান বেঁচে থাকবেন একজন শিল্পী হিসেবে, একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে, একজন স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে।