স্বাদের টানে পরিচিতি বাড়ছে শেরপুরের ছানার পায়েসের
ছবি সংগৃহীত

আমানুল্লাহ আসিফ, নালিতাবাড়ী (শেরপুর): শেরপুর গেলে কী খাওয়াবেন? অতিথিরা এমন প্রশ্ন করলে এককথায় উত্তর আসে—ছানার পায়েস। ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্থান করে নেওয়া ছানার পায়েসের স্বাদের টানে দেশের বিভিন্ন স্থানের মানুষ ছুটে আসেন।

এক প্রকার গুটিগুটি রসালো মিষ্টির নাম ছানার পায়েস। দুধ, ময়দা ও চিনি দিয়ে তৈরি করা হয় এই মিষ্টান্ন। স্বাদে ও ঘ্রাণে ছানার পায়েস যেন অনন্য।

সূত্র জানায়, ব্রিটিশ আমলে শেরপুর জেলা সদরের ঘোষপট্টিতে প্রথম ছানার পায়েস তৈরি শুরু হয়। তখন হাতেগোনা দুই-একটি দোকানে এই মিষ্টি পাওয়া যেত। বর্তমানে সদরেই অর্ধশতাধিক দোকানে ছানার পায়েস পাওয়া যাচ্ছে। এসব দোকানে প্রতিদিন ২০০-২৫০ কেজি ছানার পায়েস বিক্রি হয় বলে জানা গেছে। এছাড়াও নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী, শ্রীবরদী ও নকলা—সব উপজেলাতেই কমবেশি ছানার পায়েস পাওয়া যায়।

তবে জেলা শহরের অনুরাধা মিষ্টান্ন ভান্ডারের ছানার পায়েসের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। জেলা শহরের বাইরে, বিশেষ করে নালিতাবাড়ী উপজেলার দে মিষ্টান্ন ভান্ডারের ও নকলা উপজেলার বারোমাইসা গ্রামের অজপাড়া গাঁয়ে মানিক মিষ্টান্ন ভান্ডারের সুনাম ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন অঞ্চলে।

ঝিনাইগাতীর গারো পাহাড়ের পর্যটনকেন্দ্র গজনী অবকাশ বা নালিতাবাড়ীর মধুটিলা ইকোপার্কে বেড়াতে এসে অনেকেই এই মিষ্টি নিয়ে ফিরেন। বিয়ে, জন্মদিন, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, দুর্গাপূজাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব ও যেকোনো অনুষ্ঠানে আপ্যায়নের জন্য শেরপুরের মানুষের কাছে পছন্দের মিষ্টি ছানার পায়েস। বছরের পর বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে এই মিষ্টির সুনাম এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও জায়গা করে নিয়েছে।

কারিগরদের দেওয়া তথ্যমতে, ছানার পায়েস তৈরি করতে দুধ, চিনি, ময়দা ও এলাচ লাগে। প্রথমে দুধ জ্বাল দিয়ে ক্ষীর করা হয়। এরপর আলাদাভাবে দুধ থেকে ছানা কেটে তাতে সামান্য ময়দা মিশিয়ে ছোট ছোট গুটি করা হয়। এই গুটিগুলো চিনিমিশ্রিত শিরায় ভিজিয়ে আগে তৈরি করা ক্ষীরে ছেড়ে হালকা আঁচে জ্বাল দেওয়া হয়। এভাবেই তৈরি হয় সুস্বাদু এই মিষ্টি।

এক কেজি ছানার পায়েস তৈরি করার জন্য দুই কেজি দুধ, আধা কেজি চিনি, সামান্য পরিমাণ ময়দা ও ১০ থেকে ১৫ গ্রাম এলাচ লাগে। শেরপুর জেলা ও বিভিন্ন উপজেলা শহরের মিষ্টির দোকানগুলোতে প্রতি কেজি ছানার পায়েস ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়।

মানিক মিষ্টান্ন ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী মো. মানিক মিয়া বলেন, ছানার পায়েসের চাহিদা অন্যান্য মিষ্টির চেয়ে অনেক বেশি। এই মিষ্টির জন্য প্রতিনিয়ত দূর-দূরান্তের ক্রেতারা ভিড় করেন।

দে মিষ্টান্ন ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী অরুণ চন্দ্র দের বড় ছেলে বিপ্লব দে কেটু বলেন, আমরা শত বছর ধরে মিষ্টির ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ছানার পায়েস ও দে মিষ্টান্ন ভান্ডারের সুনাম রয়েছে জেলাজুড়ে। আমরা সবসময় খাঁটি দুধ দিয়ে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এই পায়েস তৈরি করে থাকি। ছানার পায়েস জিআই পণ্য হওয়ায় আমরা এটিকে আরও বেশি গুরুত্ব দিই। পাশাপাশি এর চাহিদাও অন্যান্য মিষ্টির চেয়ে অনেক বেশি।

বরিশাল থেকে আগত শেরপুর পৌরসভায় কর্মরত মাইনুল ইসলাম বলেন, শেরপুরের ছানার পায়েস অনেক সুস্বাদু। বিশেষ করে জেলা শহরের অনুরাধা মিষ্টান্ন ভান্ডারের পায়েস অতুলনীয়।

আল আমিন নামে স্থানীয় একজন বলেন, শেরপুরের ছানার পায়েস শুধু একটি মিষ্টান্ন নয়, এটি আমাদের অঞ্চলের ঐতিহ্য ও গর্বের প্রতীক। খাঁটি ছানা, দুধ ও যত্নের সঙ্গে তৈরি এই পায়েসের স্বাদ অন্য কোথাও সহজে পাওয়া যায় না। একবার যিনি এটি খেয়েছেন, তিনি এর স্বাদ দীর্ঘদিন মনে রাখবেন। দেশজুড়ে শেরপুরের এই ঐতিহ্যবাহী পায়েসের পরিচিতি আরও ছড়িয়ে পড়ুক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

ছানার পায়েস শেরপুরের একটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী খাবার হওয়ায় বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরে জেলা প্রশাসন। শেরপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে এবং তৎকালীন জেলা প্রশাসক মাহমুদুর রহমানের তত্ত্বাবধানে ২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে ছানার পায়েসকে জিআই পণ্যের মর্যাদা দেওয়া হয়।

শেরপুর পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সাবেক নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আক্তার ববি বলেন, শেরপুরের ঐতিহ্যবাহী ছানার পায়েস শুধু একটি মিষ্টান্ন নয়, এটি এ জেলার সংস্কৃতি ও আতিথেয়তার অনন্য পরিচয় বহন করে। দেড় বছর ধরে শেরপুরে কর্মরত থাকার সুবাদে বহুবার এই পায়েস খাওয়ার সুযোগ হয়েছে। এর স্বাদ, মান ও প্রস্তুত প্রণালি সত্যিই প্রশংসনীয়। আমি মনে করি, যথাযথ প্রচার ও ব্র্যান্ডিং করা গেলে শেরপুরের ছানার পায়েস দেশজুড়ে আরও ব্যাপক পরিচিতি লাভ করবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

—জা. অর্থনীতি/এনজে