সিলেট প্রতিনিধি: সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার একটি দৃষ্টিনন্দন রিসোর্টের পতিত জমিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বস্তায় আদা চাষ করে সফলতার মুখ দেখতে শুরু করেছেন ব্যবসায়ী মো. ইউসুফুর রহমান। পরীক্ষামূলক এ উদ্যোগ ইতোমধ্যে উপজেলার কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। কৃষি বিভাগও এটিকে সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হিসেবে দেখছে। তার এ ব্যতিক্রমী উদ্দোগে ইতিমধ্যে এলাকার কৃষকরা আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, জৈন্তাপুর উপজেলার জৈন্তাপুর ইউনিয়নের মোকামবাড়ী আলুবাগান এলাকায় অবস্থিত ‘দ্যা ওয়্যার জৈন্তা রিসোর্ট’-এর বিশাল কয়েক একর নয়নাভিরাম বাগানের এক কোণে দীর্ঘদিনের পতিত থাকা ৩৩ শতক জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে বস্তায় আদা চাষ শুরু করেন আসামপাড়া গ্রামের ব্যবসায়ী মো. ইউসুফুর রহমান। রিসোর্টের চারপাশে বিভিন্ন প্রজাতির শোভাবর্ধনকারী ও ফলদ গাছে ঘেরা সবুজ পরিবেশে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে চলতি মৌসুমে তিনি এ উদ্যোগ গ্রহণ করেন। শুরুতেই আশানুরূপ ফল পাওয়ায় সফলতার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বাস্তবায়নাধীন “আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সিলেট অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প”-এর আওতায় বারি আদা-৪ জাতের প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়। গত ১৫ মার্চ মো. ইউসুফুর রহমান ১ হাজার বস্তায় আদার চারা রোপণ করেন।
কৃষক মো. ইউসুফুর রহমান জানান, রোপণের পর মাত্র ১০ থেকে ১৫টি চারা বাদে প্রায় সবগুলোই সুস্থভাবে বেড়ে উঠেছে। এতে তিনি বেশ আশাবাদী। প্রাথমিকভাবে শ্রমিক, বস্তা, মাটি, নেট ও বাঁশসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ২০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। ফসল সংগ্রহের আগ পর্যন্ত আরও প্রায় ৩০ হাজার টাকা ব্যয় হবে। সব মিলিয়ে মোট উৎপাদন ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ৫০ হাজার টাকা।
তিনি জানান, প্রতিটি বস্তা থেকে গড়ে অন্তত ৩ কেজি করে আদা উৎপাদনের আশা করছেন। সে হিসেবে প্রায় ৩ হাজার কেজি আদা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী সব খরচ বাদ দিয়ে প্রায় আড়াই লাখ টাকা মুনাফা অর্জনের আশা করছেন তিনি।
ইউসুফুর রহমান বলেন, রিসোর্টের অব্যবহৃত জমিকে কাজে লাগিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে বস্তায় আদা চাষ শুরু করি। শুরুতেই চারাগুলোর ভালো বৃদ্ধি আমাকে আশাবাদী করেছে। এবার সফল হলে আগামী মৌসুমে আরও বড় পরিসরে এ চাষ সম্প্রসারণ করব।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, রিসোর্টের মতো প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত জমিকে কৃষি উৎপাদনে কাজে লাগানোর এ উদ্যোগ একদিকে যেমন বাড়তি আয় সৃষ্টি করবে, অন্যদিকে দেশের আদা উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জৈন্তাপুরের ইউসুফুর রহমানের এ উদ্যোগ সফল হলে তা অন্যান্য কৃষকদের জন্যও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে।
জৈন্তাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হুমায়ন দিলদার বলেন, দেশে আদার চাহিদা পূরণে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আদা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। অথচ বাড়ির আঙিনা, ছায়াযুক্ত স্থান কিংবা অব্যবহৃত জমিতে বস্তায় সহজেই আদা চাষ করা সম্ভব। এতে অতিরিক্ত জমির প্রয়োজন হয় না এবং পরিচর্যাও তুলনামূলক কম লাগে। স্বল্প জায়গায় বস্তায় আদা চাষে করা যায়। কম খরচ ও কম পরিশ্রম আদা চাষের সুবিধায় আমাদের জৈন্তাপুর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে বস্তায় আদা চাষ শুরু হয়েছে। এতে চাষি তার নিজের চাহিদা পুরনের পাশাপাশি দেশে আদার সংকট নিরসনে সহায়ক হিসাবে কাজ করবে।
তিনি বলেন, প্রতিটি পরিবার যদি ১০ থেকে ১৫টি বস্তায় আদা চাষ করে, তাহলে ভবিষ্যতে বিদেশ থেকে আদা আমদানির প্রয়োজন অনেকাংশে কমে আসবে। বস্তায় আদা চাষের আরেকটি বড় সুবিধা হলো অতিবৃষ্টি বা বন্যার সময় সহজেই বস্তা নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া যায়। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে।
তিনি আরও বলেন, জৈন্তাপুরের উঁচু ও পাহাড়ি ঢালু জমি আদা চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আগ্রহী কৃষকদের প্রশিক্ষণ, কারিগরি পরামর্শ, মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি এবং বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় বিনামূল্যে বীজ ও প্রদর্শনীর উপকরণ সরবরাহ করা হচ্ছে। ঘরে ঘরে বস্তায় আদা চাষ ছড়িয়ে দিতে কৃষি বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি
