আধুনিক চেতনার কবি আহসান হাবীব

ত্রিশোত্তর বাংলা কবিতার নতুন ধারার কবিদের মধ্যে অন্যতম প্রধান কবি আহসান হাবীব। তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। একাধারে কবি, সাংবাদিক এবং খ্যাতিমান সাহিত্য সম্পাদক।

কবি আহসান হাবীব কবিতায় নির্মাণ করেছেন স্বদেশ লগ্নতা, জীবন ঘনিষ্ঠতা, মানবিক বেদনাবোধ, প্রেমানুভব ও নিজস্ব আত্মজৈবনিক কাব্যশৈলী। নিজস্ব কাব্যশৈলীর আধুনিকতার সঙ্গে রবীন্দ্র- নজরুল যুগের কাব্যকলার সংমিশ্রণে দেশ ও জীবনবোধের সাহচর্যে আধুনিক কাব্য আন্দোলনের সূচনা হয়েছে আহসান হাবীবের সব সাহিত্যকর্মে। তাই তো আহসান হাবীব শুধু আধুনিক কবি নন, উত্তরাধুনিকতার এক পথপ্রদর্শক। কারণ তিনি কবিতায় তুলে ধরেছেন সমকালীন ইতিহাস, সমাজ, জীবন বাস্তবতা ও দার্শনিকতার নতুনবোধ ও শিল্পরীতি। 
তিরিশের শেষ দিকে লেখা শুরু করা সত্ত্বেও তিরিশ দশকীয় কবিতার আত্মরতি বা নান্দনিকতার প্রভাব তিনি রক্তে ধারণ করেননি। বরং চল্লিশের সমাজচেতনার যুগধর্মকেই আত্মস্থ করে নিয়েছিলেন তিনি। আহসান হাবীব তার কবিতায় নিজস্ব স্বকীয় বৈশিষ্ট্য মুদ্রিত করেছেন। ইউরোপীয় আধুনিকতার প্রভাবে কৃত্রিম নগরযন্ত্রণা জনবচ্ছিন্নতা, নিঃসঙ্গতায় তিরিশের কবিরা হতাশায় আচ্ছন্ন হয়েছিল। আহসান হাবীব সেই কৃত্রিম যন্ত্রণা থেকে মুক্ত থেকে রাত্রিশেষে ভোরের আলো দেখায় উজ্জীবিত হয়েছেন। 

আহসান হাবীবের জন্ম ১৯১৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পিরোজপুরের শংকরপাশা গ্রামে। তার বাবার নাম হামিজুদ্দীন হাওলাদার। মা জমিলা খাতুন। তার পাঁচ ভাই ও চার বোন। অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান তিনি। পারিবারিকভাবে আহসান হাবীব সাহিত্য সংস্কৃতির আবহের মধ্যে বড় হয়েছেন। সেই সূত্রে বাল্যকাল থেকেই লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত হন। সে সময় তার বাড়িতে ছিল আধুনিক সাহিত্যের বইপত্র ও কিছু পুঁথি। এসব পড়তে পড়তে একসময় নিজেই লেখার তাগিদ অনুভব করেন। সাহিত্যের অনুকূল পরিবেশ নিয়ে পিরোজপুর গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে ১৯৩৫ সালে প্রবেশিকা পাস করেন। এরপর চলে আসেন বরিশালে। ভর্তি হন বিখ্যাত বিএম কলেজে। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটের কারণে কলেজের পড়াশোনার পাঠ শেষ পর্যন্ত অসমাপ্ত রাখতে হয় তাকে। বিএম কলেজে দেড় বছর পড়ার পর ১৯৩৬ সালের শেষার্ধে কাজের খোঁজে কলকাতায় পাড়ি জমান। এভাবেই কবি আহসান হাবীব বরিশাল থেকে তৎকালীন রাজধানী কলকাতায় পা রাখেন।

১৯৩৩ সালে কিশোর বয়সে আহসান হাবীবের প্রথম প্রবন্ধ ‘ধরম’ স্কুল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। ১৯৩৪ সালে তার প্রথম কবিতা মায়ের কবর পাড়ে পিরোজপুর গভর্নমেন্ট স্কুল ম্যাগাজিনে ছাপা হয়। পরে ছাত্রাবস্থায় কলকাতার কয়েকটি সাহিত্য পত্রিকায় তার লেখা প্রকাশিত হলে নিজের সম্পর্কে আস্থা বেড়ে যায় কবির।

স্কুলে পড়াকালীন তিনি প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার বিষয়বস্তুকে কবিতায় উপস্থাপিত করে পুরস্কৃত হয়েছিলেন। ততদিনে দেশ, মোহাম্মদী, বিচিত্রার মতো নামিদামি পত্রপত্রিকায় তার বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত হয়েছে। 

কলকাতা গিয়ে শুরু হয় আহসান হাবীবের সংগ্রামমুখর জীবনের পথচলা। ১৯৩৭ সালে দৈনিক তকবির পত্রিকার সহ-সম্পাদক পদে যোগ দেন। বেতন মাত্র ১৭ টাকা। পরে তিনি ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত কলকাতার বুলবুল পত্রিকা ও ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত মাসিক সওগাত পত্রিকায় কাজ করেন। এছাড়া তিনি আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের স্টাফ আর্টিস্ট পদে ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কাজ করেন। 
আহসান হাবীবের কাব্যগ্রন্থ, বড়দের উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, ছোটদের ছড়া ও কবিতার বই সব মিলিয়ে বইয়ের সংখ্যা ২৫টি।

কাব্যগ্রন্থ: রাত্রিশেষ (১৯৪৭), ছায়াহরিণ (১৯৬২), সারা দুপুর (১৯৬৪), আশায় বসতি (১৯৭৪), মেঘ বলে চৈত্রে যাবো (১৯৭৬), দু’হাতে দুই আদিম পাথর (১৯৮০), প্রেমের কবিতা (১৯৮১), বিদীর্ণ দর্পণে মুখ (১৯৮৫)।

উপন্যাস: রানী খালের সাঁকো (১৯৬৫), আরণ্য নীলিমা (১৯৬২), জাফরানী রং পায়রা।

শিশু সাহিত্য: জোছনা রাতের গল্প, ছুটির দিন দুপুরে, বিষ্টি পড়ে টাপুরটুপুর, ছুটির দিন দুপুরে, রেলগাড়ি ঝমাঝম, রানীখালের সাঁকো, জ্যোৎসনা রাতের গল্প, ছোট মামা দি গ্রেট ও পাখিরা ফিরে আসে। 

বাংলা ভাষা সাহিত্যে অবদানের জন্য তাকে বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৮ সালে একুশে পদক পান। ১৯৮৫ সালের ১০ জুলাই আহসান হাবীব মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৯৪ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে।