খুলনা প্রতিনিধি: নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার মাত্র তিন দিনের মাথায় নতুন সড়কের পিচ হাত দিয়ে টানতেই উঠে যাওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে খুলনার কয়রা উপজেলায়। পরে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর হাত দিয়ে পিচ তুলে ফেলার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে জেলাজুড়ে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) বিকেলে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার ও ধুলাবালির ওপর নামমাত্র কার্পেটিংয়ের অভিযোগের কারণে ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা মহারাজপুর ইউনিয়নের মাদারবাড়িয়া-রোনবাগ সড়কের পিচ ঢালাইয়ের কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন।
মঙ্গলবার বিকেলে সরেজমিনে মাদারবাড়িয়া থেকে রোনবাগ গ্রাম পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার সড়কের বিভিন্ন স্থানে নতুন কার্পেটিংয়ে ফাটল দেখা গেছে। অনেক জায়গায় হাতের সামান্য চাপেই উঠে আসছে পিচের আস্তরণ। সড়কের মাঝামাঝি অংশে নতুন একটি আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হলেও তার পাশেই একটি পুরোনো ভাঙাচোরা কালভার্ট বিপজ্জনক অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে। এছাড়া নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্প এলাকায় কাজের বিবরণী সম্বলিত কোনো তথ্যফলক বা সাইনবোর্ডও টাঙানো হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পুরোনো কালভার্ট অপসারণ না করেই তার ওপর দিয়ে পিচ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। তিন দিন আগে দেওয়া পিচ উঠে যেতে শুরু করায় মঙ্গলবার বাকি অংশে কার্পেটিং করার সময় এলাকাবাসী একজোট হয়ে কাজ বন্ধ করে দেন।
মহারাজপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য জামাল ফারুক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "রাস্তার ওপর অত্যন্ত পাতলা করে পিচ দেওয়া হয়েছে। নিচের অংশ পরিষ্কার না করেই ধুলাবালু ও মাটির ওপর ঢালাই দেওয়া হচ্ছিল, যা হাত দিলেই উঠে যাচ্ছে। আজ আবার একই কায়দায় কাজ শুরু হলে এলাকাবাসী বাধা দেয়।"
সড়কের পাশের বাসিন্দা মো. শহিদুল বলেন, "আমার বাড়ির পাশে খালের পাড়ঘেঁষা অংশটা অনেক নিচু। সেখানে আজ পিচ দেওয়ার পর রোলার চালাতেই ফাটল ধরেছে। এই অবস্থায় বর্ষা এলে পুরো সড়ক খালে ধসে পড়বে।"
আরেক বাসিন্দা তরিকুল ইসলাম জানান, শুরু থেকেই নিম্নমানের ইটের খোয়া ব্যবহারের অভিযোগ ছিল। প্রতিবাদের মুখে একবার খোয়া সরালেও দীর্ঘদিন কাজ ফেলে রেখে এখন তড়িঘড়ি করে এই দায়সারা পিচ ঢালাই দেওয়া হচ্ছে।
কয়রা উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, পল্লি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় মাদারবাড়িয়া উত্তর সীমানা থেকে রোনবাগ সড়কের এক কিলোমিটার উন্নয়ন, একটি আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণ এবং বেদকাশী এলাকার প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কের উন্নয়নকাজ একই প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত।
২০২৪ সালের মার্চ মাসে ‘মেসার্স কামরুল অ্যান্ড ব্রাদার্স’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২ কোটি ৬৩ লাখ ৯৯ হাজার টাকার এই কাজটি পায়। ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর কাজের মেয়াদ শেষ হলেও নির্ধারিত সময়ে ঠিকাদার কাজ শেষ করতে পারেনি।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কাজের দায়িত্বে থাকা মো. হাসান সব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, "এলজিইডির নির্দেশনা অনুযায়ীই কাজ করা হচ্ছে। কাজের ওপরের অংশ কিছুটা উঠে যাওয়াটা কাজেরই একটি ধাপ। প্রথমে লেভেলিং করা হয়, পরে সিল কোট দেওয়া হয়। এখনো আরও এক দফা পিচ দেওয়া বাকি আছে। মূলত ভুল-বোঝাবুঝি থেকে এলাকাবাসী কাজ বন্ধ করেছে।"
কয়রা উপজেলা এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী আফজাল হোসেন বলেন, "বিটুমিন ঢালাইয়ের পর রাস্তা পুরোপুরি মজবুত হতে অন্তত সাত দিন সময় লাগে। তবে এই কাজে প্রাইম কোট না দেওয়ার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। তাই পুরোনো প্রাইম কোটের ওপর কার্পেটিং না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিটুমিন দেওয়ার পরও কেন ঢালাই উঠে যাচ্ছে, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সরেজমিন তদন্ত করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
—জা. অর্থনীতি/এলএটি