কিভাবে সাজানো হলো এবারের পর্তুগাল স্কোয়াড
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

পর্তুগাল জাতীয় ফুটবল দল
ডাকনাম: ওস নাভেগাদোরেস, আ সেলেসাও
কনফেডারেশন: উয়েফা
কোচ: রবার্তো মার্তিনেজ
ফিফা র‍্যাংকিং: পঞ্চম 

কোয়ালিফিকেশন যাত্রা

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের চ্যাম্পিয়ন হয়ে সরাসরি বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে পর্তুগাল। বাছাইপর্বে দুর্দান্ত পারফর্ম করে গ্রুপ সেরা হিসেবে পর্তুগাল নিজেদের নবমবারের মতো বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছে।

খেলার ধরন

পর্তুগাল মূলত পাসিং ও বল দখলের ওপর ভিত্তি করে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে থাকে। লাতিন আমেরিকান ঘরানার এই দলটি স্কিল, নিপুণ পাস এবং দারুণ ড্রিবলিংয়ের মাধ্যমে মাঝমাঠ থেকে খেলা তৈরি করে। রক্ষণ থেকে আক্রমণে যাওয়ার সময় তারা ছোট ছোট পাস ও দ্রুতগতির মুভমেন্ট ব্যবহার করে। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রাখতে তারা মাঝমাঠ দিয়ে বেশি পাস খেলে থাকে। যদিও পর্তুগাল বলের দখল ধরে রাখতেই বেশি পছন্দ করে, তবে প্রয়োজন হলে তারা প্রতি-আক্রমণ থেকেও গোল করার দারুণ দক্ষতা দেখায়।

তারকা খেলোয়াড়

পর্তুগালের সর্বকালের সবচেয়ে বড় ও উজ্জ্বল তারকা হলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। তিনি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। সুপারস্টার সিআর সেভেনে আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সর্বাধিক ম্যাচের রেকর্ডধারী।
উদীয়মান খেলোয়াড়

দলে বর্তমানে একঝাঁক বিশ্বমানের উদীয়মান ও তরুণ প্রতিভা রয়েছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন উদীয়মান খেলোয়াড় হলেন— জোয়াও নেভেস (ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার, পিএসজি), আন্তোনিও সিলভা (সেন্টার ব্যাক, বেনফিকা), নুনো মেন্ডেস (লেফট ব্যাক, পিএসজি) এবং ফ্রান্সেসকো কনসেইসাও (রাইট উইঙ্গার, জুভেন্টাস)।
কোচের কৌশল

পর্তুগাল জাতীয় ফুটবল দলের প্রধান কোচ রবার্তো মার্তিনেজ আক্রমণাত্মক ও নিয়ন্ত্রণভিত্তিক ফুটবলে বিশ্বাসী। ৩-৪-৩ বা ৪-৩-৩ ফর্মেশনে দল সাজান। মাঝমাঠে বলের দখল রেখে প্রতিপক্ষের রক্ষণে চাপ তৈরি করা এবং উইং দিয়ে আক্রমণ গড়ে তোলা তার কৌশলের প্রধান অস্ত্র। 
শক্তি ও দুর্বলতা

পর্তুগাল জাতীয় ফুটবল দলের প্রধান শক্তির জায়গা হলো তাদের বিশ্বমানের আক্রমণ ভাগ, অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার এবং ট্যাকটিক্যাল নমনীয়তা। তবে দলের প্রধান দুর্বলতাগুলোর মধ্যে রয়েছে—ডিফেন্সিভ ট্রানজিশন বা রক্ষণ থেকে আক্রমণে ওঠার সময় কিছুটা ভারসাম্যহীনতা এবং বড় ম্যাচে কখনও কখনও অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক মানসিকতা দেখা যায়।

বিশ্বকাপ ইতিহাস 

পর্তুগাল জাতীয় ফুটবল দল এ পর্যন্ত ৯ বার ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের মূল মঞ্চে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ আসরটি হবে তাদের অংশগ্রহণের নবম আসর। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর আগমনের আগে পর্তুগাল ১৭ বার বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব খেলে মাত্র তিনবার চূড়ান্ত পর্বে জায়গা পেয়েছিল। কিন্তু তার অভিষেকের পর থেকে দলটি বিশ্বকাপের পাশাপাশি প্রতিটি ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপেও নিয়মিত অংশগ্রহণ করছে। পর্তুগাল আজ পর্যন্ত কোনো ফিফা বিশ্বকাপ শিরোপা জেতেনি। তাদের সেরা সাফল্য ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান অর্জন। কিংবদন্তি ইউসেবিওর হাত ধরে প্রথমবার বিশ্বকাপে এসেই তারা এই অবিস্মরণীয় কীর্তি গড়েছিল।

স্মরণীয় মুহূর্ত

১৯৬৬ বিশ্বকাপ (তৃতীয় স্থান): ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে কিংবদন্তি ইউসেবিওর অসাধারণ নৈপুণ্যে পর্তুগাল প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠে এবং তৃতীয় স্থান অর্জন করে।

সংস্কৃতি ও সমর্থক

পর্তুগালের ফুটবল সংস্কৃতি দেশটির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে আছে। পর্তুগিজদের কাছে ফুটবল নিছক কোনো খেলা নয়, এটি একটি আবেগের জায়গা যা তাদের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে কাজ করে। পর্তুগিজ ফুটবলের মূল চালিকাশক্তি হলো ‘সাউদাদে’—যা মূলত এক ধরনের নস্টালজিয়া, আকাঙ্ক্ষা এবং না-পাওয়ার বেদনার সংমিশ্রণ। ফুটবলে এই নস্টালজিয়াই আবেগ হিসেবে মাঠে ও গ্যালারিতে প্রতিফলিত হয়। 

মজার তথ্য

পর্তুগাল জাতীয় ফুটবল দলের হোম জার্সির মূল রঙ হলো গাঢ় লাল বা মেরুন, যার সঙ্গে সবুজ রঙের সংমিশ্রণ থাকে। অন্যদিকে অ্যাওয়ে জার্সির মূল রঙ সাদা এবং তাতে সবুজ ও লালের আইকনিক ছোঁয়া থাকে। তাদের এই জার্সির নকশা ও রঙ মূলত পর্তুগালের জাতীয় পতাকার প্রতিনিধিত্ব করে।

সম্ভাব্য ফরমেশন

রবার্তো মার্তিনেজের অধীনে পর্তুগাল সাধারণত ৪-২-৩-১ ফরমেশনে খেলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, যা ম্যাচের পরিস্থিতি ও প্রতিপক্ষের শক্তি অনুযায়ী আক্রমণাত্মক ৪-৩-৩ ফরমেশনে রূপান্তরিত হতে পারে। মাঝমাঠ ও উইংয়ে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের আধিপত্যের ওপর ভিত্তি করে দলটির ফরমেশন ও লাইনআপ পাল্টে যায়।

গ্রুপ বিশ্লেষণ

পর্তুগাল ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে ‘কে’ গ্রুপে ড্র করেছে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়েছে কলম্বিয়া, উজবেকিস্তান এবং ডিআর কঙ্গো। অভিজ্ঞ কোচ রবার্তো মার্তিনেজের অধীনে এটি পর্তুগালের অন্যতম সুষম ও শক্তিশালী দল।

ভবিষ্যদ্বাণী

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে পর্তুগালকে শিরোপা জেতার অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার এবং ডার্ক হর্স হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। রবার্তো মার্তিনেজের অধীনে দলটিতে যেমন অভিজ্ঞতার মিশেল রয়েছে, তেমনি তরুণ প্রতিভারও দারুণ ভারসাম্য রয়েছে। ৪১ বছর বয়সি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর জন্য এটিই হতে যাচ্ছে তার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ।

উক্তি

‘অতীত হলো ইতিহাস, ভবিষ্যৎ জয়’