সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, রাজধানীর একটি নামিদামি বৃদ্ধাশ্রমে সন্তানের পথ চেয়ে অঝোরে কাঁদছেন এক বৃদ্ধ মা। যে সন্তানকে তিল তিল করে মানুষ করতে নিজের জীবনের সব সুখ বিসর্জন দিয়েছিলেন, সেই সন্তানই আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে মা-বাবাকে বোঝা মনে করছে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও সামাজিক পরিবর্তনের হাওয়ায় যখন তরুণ প্রজন্ম নতুন এক দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছে, ঠিক তখনই পরিবার নামক রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোটি যেন এক চরম নৈতিক সংকটের মুখোমুখি।
আজকের আধুনিক যুগে আমরা যখন জিপিএ-৫ আর কর্পোরেট ক্যারিয়ারের পেছনে অন্ধের মতো ছুটছি, তখন জীবনের প্রথম পাঠশালা—পরিবার এবং তার কারিগর মা-বাবাকে কতটুকু আগলে রাখছি? অথচ ইসলামের অমোঘ বিধান অনুযায়ী, মা-বাবার অবাধ্যতা কেবল পরকালেই নয়, বরং ইহকালেই মানুষের জীবনে চরম অশান্তি ও ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ইসলামে মা-বাবার প্রতি দায়িত্বকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট হয় পবিত্র কোরআনের সূরা বনি ইসরাঈলের ২৩ নম্বর আয়াতে। যেখানে মহান আল্লাহ নিজের ইবাদতের পরেই মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি তারা বার্ধক্যে পৌঁছালে তাদের বিরক্ত হয়ে ‘উফ’ শব্দটুকু পর্যন্ত বলতে নিষেধ করা হয়েছে।
আজকের সমাজে সামান্য পারিবারিক কলহ বা মতের অমিল হলেই মা-বাবার সঙ্গে উচ্চবাচ্য করা কিংবা তাদের ধমক দেওয়া নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ সহিহ মুসলিমের হাদিস অনুযায়ী, আল্লাহর কাছে সময়মতো নামাজের পরেই সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো মা-বাবার সেবা করা।
এমনকি মা-বাবা যদি অমুসলিমও হন, তবুও দুনিয়াবি জীবনে তাদের সঙ্গে সর্বোচ্চ সদাচরণ ও মার্জিত ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। সুরা লুকমানে বলা হয়েছে, যদি মা-বাবা সন্তানকে আল্লাহর সাথে শিরক করার মতো কুফরি কাজের আদেশও দেয়, তবে সেই আদেশ মানা যাবে না, কিন্তু পৃথিবীর বুকে তাদের সাথে সম্পর্ক রাখতে হবে অত্যন্ত সুন্দর ও সম্মানজনক উপায়ে।
মা-বাবার সন্তুষ্টির মাঝেই লুকিয়ে আছে সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের তরুণরা যেভাবে সমাজ সংস্কারে এগিয়ে এসেছে, সেই একই উদ্দীপনা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে পরিবারের সংস্কারেও। মা-বাবার অবাধ্য হয়ে কোনো সন্তান কখনো টেকসই সফলতা অর্জন করতে পারে না।
তাই আসুন, নতুন বাংলাদেশ গড়ার এই সন্ধিক্ষণে আমরা যেন নিজের মা-বাবাকে ভুলে না যাই। তাদের জীবদ্দশায় সর্বোচ্চ যত্ন নেওয়া এবং মৃত্যুর পর তাদের জন্য দোয়ার মাধ্যমে একজন আদর্শ সান্তান ও প্রকৃত মানুষ হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলি। কারণ, মা-বাবার দোয়াই হলো ইহকাল ও পরকালের প্রকৃত সফলতার মূল চাবিকাঠি।
জা. অর্থনীতি/ উমার