জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: ব্যাংক খাতে যেন উল্টো চিত্র! কোনো ব্যাংকের হাজার কোটি টাকার মুনাফা, আবার কোনো ব্যাংকের লোকসানও ছাড়িয়েছে তিন হাজার কোটি টাকা। বিশেষ করে প্রথম প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংকগুলো যখন বড় অঙ্কের লোকসানে, তখন দ্বিতীয় প্রজন্মের সব ব্যাংকই রয়েছে মুনাফায়। আর তৃতীয় প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর মধ্যেও দেখা যাচ্ছে ইতিবাচক প্রবণতা। তাহলে কোন ব্যাংক কত টাকা মুনাফা করল, আর কারা পড়ল লোকসানে?
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর-প্রথম নয় মাসের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রথম প্রজন্মের ৯টি বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে পাঁচটি লোকসান করেছে। বিপরীতে দ্বিতীয় প্রজন্মের সাতটি ব্যাংকের সব কটিই মুনাফায় রয়েছে। তৃতীয় প্রজন্মের ১০টি ব্যাংকের মধ্যে আটটি মুনাফা করলেও লোকসান করেছে দুটি।
প্রথম প্রজন্মের পাঁচটি ব্যাংকের সম্মিলিত নিট লোকসান ১১ হাজার ৭১৫ কোটি টাকার বেশি। সবচেয়ে বেশি লোকসান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের, ৩ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। ন্যাশনাল ব্যাংকের লোকসান ৩ হাজার ১৬ কোটি ৭৭ লাখ, এবি ব্যাংকের ২ হাজার ৮১৭ কোটি ৪২ লাখ, আইএফআইসি ব্যাংকের ২ হাজার ৫০৭ কোটি ১৫ লাখ এবং আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের ৭০ কোটি ৯০ লাখ টাকা।
তবে এই প্রজন্মের চারটি ব্যাংক মুনাফা করেছে। শীর্ষে রয়েছে পূবালী ব্যাংক, যার নিট মুনাফা ১ হাজার ৫৮৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। সিটি ব্যাংকের মুনাফা ৮৬৭ কোটি, উত্তরা ব্যাংকের ৪৩০ কোটি ৫৯ লাখ এবং ইউসিবির ৪১ কোটি টাকা।
অন্যদিকে দ্বিতীয় প্রজন্মের সাত ব্যাংকের সম্মিলিত নিট মুনাফা ২ হাজার ৭৯১ কোটি ২৬ লাখ টাকা। এ তালিকায় শীর্ষে প্রাইম ব্যাংক, ৬৮০ কোটি ৪২ লাখ টাকা। ইস্টার্ন ব্যাংক করেছে ৬৬৪ কোটি ১ লাখ এবং ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ৬২৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এছাড়া এনসিসি, সাউথইস্ট, ঢাকা ও আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকও মুনাফা করেছে।
তৃতীয় প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেছে ব্র্যাক ব্যাংক। প্রথম নয় মাসে ব্যাংকটির সমন্বিত নিট মুনাফা ২ হাজার ১২১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৮ শতাংশ বেশি।
যমুনা ব্যাংকের মুনাফা ৫০১ কোটি ৫৭ লাখ, ব্যাংক এশিয়ার ৪৭২ কোটি ১৭ লাখ এবং শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ৪৪৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এ ছাড়া ট্রাস্ট, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, ওয়ান ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকও মুনাফা করেছে।
তবে এই প্রজন্মের স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংকের নিট লোকসান ১৫৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। প্রিমিয়ার ব্যাংকের লোকসান ৩৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রিমিয়ার ব্যাংক প্রথম নয় মাসে ১ হাজার ১১২ কোটি ৮১ লাখ টাকা প্রভিশন সংরক্ষণ করেছে। ফলে পরিচালন মুনাফা থাকলেও শেষ পর্যন্ত নিট লোকসানে পড়েছে ব্যাংকটি।
ব্যাংকগুলোর মুনাফার পেছনে ঋণের সুদ আয়ের পাশাপাশি সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ড, সুকুক, কমিশন, ব্রোকারেজ এবং বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন থেকে আয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
অন্যদিকে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের চাপ ও পরিচালন ব্যয় কয়েকটি ব্যাংককে লোকসানে ঠেলে দিয়েছে।
তবে শুধু মুনাফার অঙ্ক দিয়ে কোনো ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য বিচার করা যাবে না। খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি, মূলধন পর্যাপ্ততা, তারল্য পরিস্থিতি এবং আয়ের স্থায়িত্বও বিবেচনায় নিতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কয়েকটি ব্যাংকের আর্থিক ফলাফল একক এবং কয়েকটির সমন্বিত ভিত্তিতে প্রকাশিত হয়েছে। তাই প্রজন্মভিত্তিক সম্মিলিত হিসাব সরাসরি তুলনাযোগ্য নয়। একীভূত হওয়া কয়েকটি ব্যাংক এবং প্রতিবেদন না পাওয়া একটি ব্যাংকও বিশ্লেষণের বাইরে রয়েছে।
সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতে মুনাফার চিত্রে স্পষ্ট বৈষম্য দেখা যাচ্ছে।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি
