লোকসানে ডুবছে প্রথম প্রজন্মের ৫ ব্যাংক, বিপরীতে মুনাফায় ৪টি (ভিডিও)
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: দেশের ব্যাংক খাতে যেন দুই বিপরীত চিত্র! একদিকে প্রথম প্রজন্মের পাঁচটি বেসরকারি ব্যাংক ডুবছে হাজার হাজার কোটি টাকার লোকসানে। অন্যদিকে একই প্রজন্মের চার ব্যাংক ধরে রেখেছে মুনাফার ধারা। মাত্র নয় মাসে পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত নিট লোকসান প্রায় ১১ হাজার ৭১৫ কোটি টাকা! প্রশ্ন হচ্ছে, কী কারণে এমন বিপর্যয়, আর কীভাবে অন্য ব্যাংকগুলো মুনাফা করছে?

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর-এই নয় মাসের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এমন চিত্র। লোকসানি ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ন্যাশনাল ব্যাংক, এবি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক ও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক। এর মধ্যে প্রথম চার ব্যাংকের লোকসানই ১১ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা।

 

সবচেয়ে বেশি লোকসান করেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। ব্যাংকটির কর-পরবর্তী নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। অথচ গত বছরের একই সময়ে প্রায় ৭৯ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল ব্যাংকটি।

২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন নামে ব্যাংকটি থেকে বিপুল অর্থ বের করে নেওয়ার তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে আসে। এসব অর্থের বড় অংশ খেলাপি হয়ে পড়ায় বিনিয়োগ থেকে আয় কমেছে। পাশাপাশি আমানতকারীদের মুনাফা পরিশোধের ব্যয় বেড়েছে। পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্তির চার মাসের বেশি সময় পার হলেও নতুন পর্ষদ গঠন হয়নি। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ করা প্রশাসকের মাধ্যমে চলছে কার্যক্রম।

দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক। প্রথম নয় মাসে ব্যাংকটির নিট লোকসান ৩ হাজার ১৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। ব্যাংকটির সুদ আয় হয়েছে মাত্র ৪৪৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। বিপরীতে সুদ ব্যয় ৩ হাজার ৫২৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ আয় থেকে প্রায় আট গুণ ব্যয় হয়েছে। ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যও ঋণাত্মক ১৬ টাকা ৮১ পয়সা।

তৃতীয় অবস্থানে থাকা এবি ব্যাংকের নিট লোকসান ২ হাজার ৮১৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা। শেয়ারপ্রতি আয় ঋণাত্মক ৩১ টাকা ৪৬ পয়সা। অন্যদিকে আইএফআইসি ব্যাংকের লোকসান ২ হাজার ৫০৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা। ব্যাংকটির নিট সুদ ক্ষতি ২ হাজার ২৮৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

তুলনামূলক কম লোকসান করলেও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের অবস্থাও নাজুক। নয় মাসে ব্যাংকটির নিট লোকসান হয়েছে ৭০ কোটি ৯০ লাখ টাকা। বিনিয়োগ থেকে আয় মাত্র ৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। অথচ আমানতের মুনাফা বাবদ ব্যয় ৫২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।

কিন্তু একই প্রজন্মের অন্য চার ব্যাংকের চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেছে পূবালী ব্যাংক-১ হাজার ৫৮৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। সিটি ব্যাংক করেছে ৮৬৭ কোটি টাকা, উত্তরা ব্যাংক ৪৩০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা এবং ইউসিবি ৪১ কোটি টাকা।

এসব ব্যাংকের আয়ের বড় উৎস সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ড, ঋণ ও বিনিয়োগ, কমিশন, ব্রোকারেজ এবং বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন। বিশেষ করে সিটি ব্যাংকের সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ড থেকে আয় হয়েছে ৩ হাজার ২ কোটি টাকা। আর পূবালী ব্যাংক কমিশন, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় ও ব্রোকারেজ খাত থেকে আয় করেছে ৪ হাজার ২০৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।

বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, খেলাপি ঋণ, ঋণ আদায়ে ব্যর্থতা, সুদ ও মুনাফা ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রভিশন সংরক্ষণের চাপ লোকসানি ব্যাংকগুলোকে সংকটে ফেলেছে। বিপরীতে সরকারি সিকিউরিটিজ ও বিভিন্ন বিনিয়োগ থেকে আয় মুনাফায় থাকা ব্যাংকগুলোকে এগিয়ে রেখেছে।

অর্থাৎ একই ব্যাংকিং খাতে কেউ হাজার কোটি টাকার লোকসানে ডুবছে, আবার কেউ হাজার কোটি টাকার মুনাফা করছে। প্রথম প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর এই আর্থিক বৈপরীত্য দেশের ব্যাংক খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।

—জা. অর্থনীতি/এলএটি