ক্রিকেট টুর্নামেন্টের নামে বিসিবি পরিচালকদের ফ্র্যাঞ্চাইজি!

ক্রীড়া প্রতিবেদক, ঢাকা: নতুন মোড়কে পুরোনো বই, নাকি আর্থিক বৈসাদৃশ্য আড়াল করার নতুন কৌশল— এমন প্রশ্নের মধ্যেই চূড়ান্ত হচ্ছে ডোমেস্টিক থ্রি বা ডি থ্রি নামের ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টের আয়োজন। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) শূন্যতা পূরণের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে তিন ফরম্যাটের এই আসরকে সামনে আনা হলেও ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে টুর্নামেন্টটি কতটা সফল হবে তা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকানা বণ্টন, বিসিবির বিপুল অঙ্কের ব্যয় এবং প্লেয়ার্স ড্রাফটের অস্পষ্ট নিয়ম ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা ধোঁয়াশা!

টুর্নামেন্টটির ফ্র্যাঞ্চাইজি হতে আগ্রহ দেখিয়েছিল মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান। এর বাইরে অংশগ্রহণকারী ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর সঙ্গে বিসিবির পরিচালকদের সম্পৃক্ততা সামনে আসায় স্থানীয় ও বহুজাতিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রিকেটে বিনিয়োগের আগ্রহ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ছয়টি ফ্র্যাঞ্চাইজির মধ্যে পাঁচটির সঙ্গেই কোনো না কোনোভাবে যুক্ত রয়েছেন বিসিবির পরিচালক কিংবা বোর্ড সভাপতির ঘনিষ্ঠজন।

ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর মধ্যে এইচ ব্লুস্টারের সঙ্গে যুক্ত আছেন বিসিবি পরিচালক শাহনিয়ান তানিম। ওয়ালটন গ্রুপ রয়েছে আরেকটি ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে। সিটিজেন ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত বিসিবি পরিচালক মাসুদুজ্জামান মাসুদ। একমি গ্রুপের সঙ্গে রয়েছেন আরেক পরিচালক ফাহিম সিনহা। সেভেন রিংস সিমেন্টের মালিক সাইফ রহমান যিনি বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে ফরচুন গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত আছেন বিসিবি পরিচালক মিজানুর রহমান।

ছয়টি দলের মধ্যে পাঁচটির সঙ্গেই বিসিবির পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। ফলে পরিচালকদের মধ্যে দল বণ্টনের নীতি ও প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। কারা-কীভাবে ফ্র্যাঞ্চাইজি পাওয়ার সুযোগ পেলেন সেই প্রক্রিয়ায় কতটা স্বচ্ছতা ছিল তা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। বিসিবিতে নতুন পরিচালনা পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সংস্থাটির সার্বিক ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। অথচ সেই অনুপাতে আয়ের নতুন উৎস তৈরি হয়েছে— এমন কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই! এর মধ্যেই ডি থ্রি টুর্নামেন্ট আয়োজনের আর্থিক কাঠামো নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

টুর্নামেন্টের প্রতিটি ফ্র্যাঞ্চাইজির জন্য ফি নির্ধারণ করা হয়েছে আড়াই কোটি টাকা। তবে বিস্ময়কর বিষয় হলো, টুর্নামেন্ট পরিচালনার জন্য বিসিবি নিজস্ব তহবিল থেকেও প্রতিটি দলকে সমপরিমাণ অর্থাৎ আড়াই কোটি টাকা করে অনুদান দিচ্ছে। ফলে ফ্র্যাঞ্চাইজি ফি বাবদ অর্থ নেওয়ার পাশাপাশি দলপ্রতি একই পরিমাণ অর্থ বোর্ডের পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে বিসিবির প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত জাতীয় ক্রিকেট লিগ (এনসিএল), বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগ (বিসিএল) ও বিপিএল আয়োজন করতে আগে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয় হতো। বর্তমান বোর্ডের ধারণা, নতুন ব্যবস্থায় সেই ব্যয়ের ঘাটতি কমিয়ে অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। তবে ডি থ্রি আয়োজনের আর্থিক কাঠামো এবং বোর্ডের অনুদানের বিষয়টি সামনে আসায় ব্যয় কমানোর সেই লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়িত হবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

শুধু টুর্নামেন্ট আয়োজন নয়, ঘরোয়া ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফির বিষয়টিও বিসিবির ব্যয়ের আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একদিকে জাতীয় দলের মাঠের পারফরম্যান্স হতাশাজনক, একের পর এক ম্যাচে পরাজয়ের ধারা অব্যাহত। অন্যদিকে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফি বাড়ানো হয়েছে প্রায় তিন গুণ।

বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম ধনী বোর্ড ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই) তাদের মর্যাদাপূর্ণ ঘরোয়া আসর রঞ্জি ট্রফিতে ক্রিকেটারদের যে পরিমাণ ম্যাচ ফি দেয় বর্তমান বিসিবি তার চেয়েও বেশি অর্থ ব্যয় করছে। মাঠের পারফরম্যান্স, রাজস্ব আয় এবং ব্যয়ের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য খুঁজে পাচ্ছেন না ক্রিকেট বিশ্লেষকরা। 

ঘরোয়া ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফির ক্ষেত্রেও ব্যয় বাড়িয়েছে বিসিবি। বর্তমানে চার দিনের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ম্যাচপ্রতি দেড় লাখ টাকা, ওয়ানডেতে ১ লাখ এবং টি-টোয়েন্টিতে ৮০ হাজার টাকা পাচ্ছেন ক্রিকেটাররা। অন্যদিকে ভারতের মর্যাদাপূর্ণ রঞ্জি ট্রফিতে ক্রিকেটারদের অভিজ্ঞতাভেদে দিনপ্রতি ম্যাচ ফি ৪০ হাজার থেকে ৬০ হাজার রুপি। বিসিবির ম্যাচ ফি বৃদ্ধির বিষয়টি ইতিবাচক হলেও বোর্ডের রাজস্ব আয়, সামগ্রিক ব্যয় এবং মাঠের পারফরম্যান্সের সঙ্গে এই ব্যয়ের সামঞ্জস্য কতটা রয়েছে সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে!

এদিকে ডি থ্রি টুর্নামেন্টের প্লেয়ার্স ড্রাফটে যুক্ত করা হয়েছে অভিনব এক পয়েন্ট সিস্টেম। তবে এই পদ্ধতি কীভাবে কাজ করবে, খেলোয়াড়দের দল পাওয়ার ক্ষেত্রে এর প্রভাব কী হবে কিংবা ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো কীভাবে পয়েন্টের হিসাব করবে—এসব বিষয়ে এখনও স্পষ্ট ধারণা নেই সংশ্লিষ্টদের। ড্রাফট আজ রাতে। অথচ খেলোয়াড়, গণমাধ্যমকর্মী, এমনকি ফ্র্যাঞ্চাইজি কর্তৃপক্ষের কাছেও পয়েন্ট সিস্টেমের কার্যপদ্ধতি পরিষ্কার নয়! একটি টুর্নামেন্টের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে এমন অস্পষ্টতা আয়োজনের স্বচ্ছতা ও প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।

পয়েন্ট সিস্টেমের জটিলতা নিয়ে বিস্তারিত জানতে টুর্নামেন্ট কমিটির চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি বেশ জটিল বলে স্বীকার করেন। তবে এ বিষয়ে পরিষ্কার কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে তিনি ক্রিকেট অপারেশনস ম্যানেজার শাহরিয়ার নাফিসের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। তার মন্তব্য জানার জন্য যোগাযোগ করা হলেও প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত তিনি জাতীয় অর্থনীতির ফোন ধরেননি।

সব মিলিয়ে ড্রাফটের ঠিক আগমুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ একটি নিয়ম নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। সংশ্লিষ্টদের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার করার দায়িত্ব কার, সেই প্রশ্নেরও কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর মেলেনি।

সম্প্রতি টেলিভিশন সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রির ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সহায়তা চেয়েছে বিসিবি। গত সোমবার দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আইসিসি বাংলাদেশের ক্রিকেট সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রির জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সেই তালিকায় রয়েছে যুদ্ধাবস্থার মধ্য দিয়ে যাওয়া আফগানিস্তান ও নেপালের মতো সদস্য দেশও।

সিরিজপ্রতি সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রির জন্য মরিয়া বিসিবি এখন বিভিন্ন সম্ভাব্য পথেই হাত বাড়াচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ডি থ্রি টুর্নামেন্টকে নতুন পণ্য হিসেবে বাজারজাত করার উদ্যোগ কতটা নতুন ব্যবসায়িক সম্ভাবনা তৈরি করবে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

তিন ফরম্যাটের নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টকে ঘিরে যে প্রত্যাশা তৈরি করা হয়েছে বাস্তবে তার আর্থিক কাঠামো কতটা টেকসই সেটিই এখন বড় আলোচনার বিষয়। ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকানা বণ্টনে পরিচালকদের সংশ্লিষ্টতা, দলপ্রতি বিসিবির আড়াই কোটি টাকা অনুদান, বাড়তি ম্যাচ ফি এবং প্লেয়ার্স ড্রাফটের অস্পষ্ট নিয়ম- ডি থ্রি ঘিরে তৈরি হয়েছে একাধিক প্রশ্ন!

নতুন মোড়কে নতুন একটি ক্রিকেট পণ্য তৈরি করার বদলে পুরোনো ব্যবস্থার আর্থিক ঘাটতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হিসেবেই কি ডি থ্রি আয়োজন করা হচ্ছে? আয় বাড়ানোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া ব্যয় বাড়তে থাকলে এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে?

শেষ পর্যন্ত এই আয়োজনের ব্যর্থতা কিংবা আর্থিক ঘাটতির দায় কার কাঁধে পড়বে? যারা ফ্র্যাঞ্চাইজি পরিচালনা করবেন, যারা বোর্ডের অর্থ ব্যয় করবেন, নাকি যারা মাঠে খেলবেন? ডি থ্রি শুরুর আগেই এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পাওয়া জরুরি। কারণ ক্রিকেটের নতুন আয়োজনের নামে পুরোনো আর্থিক বোঝা তৈরি হলে তার মাশুল শেষ পর্যন্ত দিতে হবে দেশের ক্রিকেটকেই!