নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: ব্যাংক খাতের সংকট কাটাতে আগামী পাঁচ থেকে আট বছর জাতীয় বাজেট থেকে প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে এসব কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিপুল অঙ্কের এই অর্থের প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা আগে যাচাই করা দরকার। শুধু অর্থ ঢেলে ব্যাংক খাতের সংকট দূর করা যাবে না। অনিয়মের কারণ চিহ্নিত করা, ঋণ আদায়, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং কার্যকর সংস্কার ছাড়া জনগণের করের টাকায় ব্যাংক উদ্ধারের উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল নাও দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক খাতের আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। তবে কোন ব্যাংকের কত ক্ষতি হয়েছে, সেই ক্ষতির জন্য কারা দায়ী এবং কোন ব্যাংককে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন— এসব যাচাই না করে আগাম নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ বরাদ্দের ঘোষণা দেওয়া ঠিক হবে না। এতে দুর্বল ব্যাংক ও ঋণখেলাপিদের মধ্যে নতুন করে সরকারি সহায়তা পাওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএফ) নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী সম্প্রতি এ বিষয়টি নিয়ে জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে কথা বলেছেন। এ সময় তিনজনই ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারে অর্থের পাশাপাশি সংস্কার, জবাবদিহি ও কার্যকর পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তারা বলছেন, জনগণের অর্থ ব্যয়ের আগে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা নিরূপণ এবং অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা লাগবে কেন
ব্যাংকিং খাতের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আগামী পাঁচ থেকে আট বছরে জাতীয় বাজেট থেকে প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে লুটপাটের কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতেই এই অর্থের প্রয়োজন হবে।
গভর্নর জানান, এ বিষয়ে একটি খসড়া প্রস্তাব গত সপ্তাহে সরকারের কাছে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে অর্থ সরবরাহ করে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করছে। এ অর্থও জনগণের করের টাকা থেকে আসছে। সম্প্রতি ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে ওয়ান ব্যাংকের বাংলা কিউআর সেবা চালুর অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন গভর্নর। এ সময় ব্যাংক খাত সংকটের দায় এবং তা থেকে উত্তরণের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
গভর্নর বলেন, ‘এই পরিমাণ (৬০ হাজার কোটি) টাকা দিয়ে বছরে ২ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সহায়তা করা যেত অথবা দুটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা যেত। যে টাকা লুট হয়েছে, সেটা জনগণের টাকা। আবার এই জনগণকেই এখন সেই টাকা ফেরত দিতে হবে। লুট করে নিয়ে গেল একজন, এখন জরিমানা দিচ্ছেন আপনি, আমি।’
‘আগাম অঙ্ক ঘোষণা করলে নৈতিক ঝুঁকি তৈরি হবে’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারে প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা করে আট বছর অর্থ দেওয়ার প্রস্তাবের উদ্দেশ্য খারাপ নয়। ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। তবে এভাবে হঠাৎ করে নির্দিষ্ট একটি অঙ্ক ঘোষণা করা হলে নৈতিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তার মতে, গভর্নর যখন বলেন, ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারে প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন, তখন দুর্বল ব্যাংকগুলো মনে করতে পারে, তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। তারা ভাবতে পারে, সরকার তাদের সহায়তা করবে। এমনকি ঋণখেলাপিরাও এ ধরনের ঘোষণাকে নিজেদের জন্য সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। যারা ঋণখেলাপি নয়, তারাও নতুন কোনো সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশা করতে পারে।
এ কারণে ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারে ঠিক কত টাকা প্রয়োজন, তা আগাম নির্দিষ্ট করে না বলে পরিস্থিতি বিবেচনায় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। পুনঃঅর্থায়নসহ বিভিন্ন নীতিগত কর্মসূচির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া সম্ভব বলেও মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের বিষয়ে আগে যে পরিকল্পনা তৈরি হয়েছিল এবং সরকার যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তা অনুসরণ করেও সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। সেই পরিকল্পনায় ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের দিকনির্দেশনা রয়েছে। তাই নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থের ঘোষণা দেওয়ার পরিবর্তে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করা উচিত।
ব্যাংকগুলোকে সহায়তা দেওয়ার আগে যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, প্রথমে ডিউ ডিলিজেন্স করতে হবে। ফরেনসিক অডিটের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা যাচাই করতে হবে। কোন ব্যাংক কী ধরনের সংকটে রয়েছে, কোন ঋণগুলো খারাপ হয়ে গেছে এবং কোথায় কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এসব যাচাইয়ের পর কোন ব্যাংকের জন্য কী ধরনের সহায়তা দরকার, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
তবে এক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলায় দেরি করা যাবে না। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাইয়ের পাশাপাশি দ্রুত পুনর্গঠন কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে।
রাজস্বের টাকায় ব্যাংক উদ্ধারের উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন
ব্যাংক খাতের সমস্যা সমাধানে প্রতিবছর রাজস্ব থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাবের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, রাজস্ব খাত এমনিতেই ঘাটতিতে থাকে। এর মধ্যে প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক খাতে দেওয়ার কথা বলে লাভ নেই। বরং ব্যাংকগুলোকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে তারা নিজেরাই ঘুরে দাঁড়াতে পারে এবং অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে।
তার মতে, ব্যাংক খাতের সংকট নিরসনে প্রথমেই দেখতে হবে, যারা এই সমস্যা সমাধানের দায়িত্বে রয়েছেন, তারা সত্যিই তা সমাধান করতে চান কি না। সমস্যা সমাধানে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেই সদিচ্ছা থাকলে ব্যাংক খাতের সমস্যাগুলো সমাধান করা কঠিন নয়।
ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, ব্যাংক খাতের সংকটের কারণগুলো চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। জনগণ যখন দেখবে, সমস্যার কারণগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর সমাধান করা হচ্ছে, তখন ব্যাংক খাতের প্রতি তাদের আস্থা ফিরে আসবে। কিন্তু সেটি করা হচ্ছে না বলেই সংকট কাটছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক বিভিন্ন পদক্ষেপের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এসব পদক্ষেপের প্রতিটিই খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের পক্ষে গেছে। যাদের কারণে ব্যাংক খাতের এই দুরবস্থা, তাদের যদি প্রতিটি পর্যায়ে সুরক্ষা দেওয়া হয়, তাহলে জনগণের আস্থা কীভাবে ফিরে আসবে?
তার মতে, খেলাপি ঋণগ্রহীতারাও এতে এমন বার্তা পাচ্ছেন যে তারা যাই করেন না কেন, তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব সরকারের। এভাবে ব্যাংক খাতকে ঘুরে দাঁড় করানোর লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
শুধু অর্থ দিয়ে ব্যাংক সুস্থ হবে না
বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, ব্যাংকিং খাতের বর্তমান দুরবস্থা থেকে উত্তরণে সংস্কার জরুরি। শুধু ৬০ হাজার কোটি টাকা দিলেই একটি ব্যাংক সুস্থ হয়ে যাবে, বিষয়টি এমন নয়। যেসব কারণে ব্যাংকগুলো রুগ্ন অবস্থায় পৌঁছেছে, সেসব সমস্যার সমাধান করতে হবে।
তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর দুরবস্থার পেছনে ঋণসংক্রান্ত অনিয়ম, আইনের শাসনের অভাব, রাজনৈতিক প্রভাবসহ অসংখ্য কারণ রয়েছে। শুধু অর্থ দিয়ে এসব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। সমস্যাগুলো দূর করতে যৌক্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে, প্রয়োজনীয় নীতি গ্রহণ করতে হবে এবং সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে।
ড. মুস্তফা কামাল মুজেরীর মতে, এজন্য প্রথমেই একটি যৌক্তিক সংস্কার পরিকল্পনা বা নীলনকশা তৈরি করা প্রয়োজন। কী ধরনের সংস্কার করা হবে, কীভাবে সমস্যাগুলোর সমাধান হবে এবং কীভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকতে হবে। এরপর সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য অর্থের প্রয়োজনীয়তার প্রশ্ন আসবে।
সরকারের কাছ থেকে প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা করে পাঁচ থেকে সাত বছর বা তারও বেশি সময় ধরে নেওয়ার প্রস্তাবের ক্ষেত্রে সুযোগ ব্যয় বিবেচনা করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এই অর্থ অন্য খাতে ব্যয় করা হলে জনগণের অনেক কল্যাণ হতে পারত বলে মনে করেন তিনি।
ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, সরকারের রাজস্ব খাতে এমনিতেই অর্থের অভাব রয়েছে। এ কারণে সরকারকে অনেক বেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক খাতে ব্যয় করতে হলে নিশ্চিত করতে হবে, জনগণের এই অর্থ যথাযথভাবে কাজে লাগছে কি না।
বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থ ব্যয়ের তুলনায় ব্যাংকিং খাতে এই অর্থ ব্যয় করা বেশি যৌক্তিক কি না, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। ব্যাংকগুলোকে জনগণের অর্থ দেওয়ার ফলে যে সুফল পাওয়া যাবে, তা অন্য খাতে ব্যয়ের তুলনায় বেশি কার্যকর হবে কি না, সেটিও যাচাই করতে হবে। তা নিশ্চিত করা না গেলে জনগণের অর্থ অপচয়ের আশঙ্কা থাকবে।
তার মতে, শুধু অর্থ বরাদ্দ দিলেই ব্যাংকিং খাতের সমস্যার মূল কারণগুলো দূর হবে না। সমস্যার সমাধানে সমন্বিত সংস্কার নীতিমালা, সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী অর্থ ব্যয় এবং অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে তবেই এ ধরনের অর্থায়নের যৌক্তিকতা থাকবে।
সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলায় রাজস্বের অর্থ ব্যয়ের প্রস্তাবের যৌক্তিকতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি অর্থের ব্যবহার ও সংস্কারের ফলাফল নিশ্চিত করা জরুরি। ব্যাংকগুলোর আর্থিক ক্ষতির প্রকৃত হিসাব নিরূপণ, অনিয়মের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট ঠেকানোর ব্যবস্থা ছাড়া বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় কতটা ফলপ্রসূ হবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।