ইতিহাস, ঐতিহ্য আর আধ্যাত্মিকতার অনন্য নিদর্শন হযরত শাহজি (রহ.)-এর মোকাম

শফিক আহমদ শফি, সিলেট: সিলেটের জৈন্তাপুর—প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, প্রাচীন ইতিহাস আর সমৃদ্ধ সংস্কৃতির এক অনন্য জনপদ। এই জনপদের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে অতীতের নানা স্মৃতি, লোককথা ও ঐতিহ্যের নিদর্শন। এরই মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হযরত শাহজি (রহ.)-এর মোকাম, যা স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। 

এগুলো জৈন্তিয়া রাজ্যের মুসলমান অধিবাসীদের সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। এসব মোকামের মধ্যে সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ও রাজকীয় মোকাম হচ্ছে হযরত শাহজি (রহ.)-র মোকাম। এটি সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলায় অবস্থিত জৈন্তিয়া রাজ্যের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অন্যতম এক দৃষ্টিনন্দন ও রাজকীয় সমাধিস্থল।জৈন্তাপুর উপজেলা সদর বা বাসস্ট্যান্ডের প্রায় দেড় কিলোমিটার আগে সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের পশ্চিমপাশে ফেরীঘাট ববরবন্দ এলাকায় এর অবস্থান।ফেরীঘাট সেতুর সামান্য আগে একটি মসজিদের উত্তর পার্শ্বে এটি অবস্থিত।

স্হানীয় সুত্রে জানা যায়,হযরত শাহজি (রহ.) ছিলেন জৈন্তিয়ার বিখ্যাত দরবেশ হযরত কাশিম শাহের ছাত্র ও শিষ্য। তিনি তৎকালীন বন্দরহাটি মসজিদের ইমাম ও খতিব ছিলেন। অনেকে তাঁকে হযরত শাহজালাল (রহ.)-র সফরসঙ্গী মনে করলেও তা সঠিক নয়; হযরত শাহজালাল (রহ.) এসেছিলেন  চতুর্দশ শতকে, আর শাহজির মোকাম নির্মিত হয় অষ্টাদশ শতকে।

১৭৮৫ থেকে ১৭৮৮ সালের মধ্যে জৈন্তিয়ার রাজা বিজয়নারায়ণ সিংহ এই ইসলাম ধর্মগুরুর সম্মানে এই নান্দনিক সমাধিঘর বা মোকামটি নির্মাণ করে দেন।এটি নির্মাণ করেছিলেন রাজা বিজয়নারায়ণ সিংহ বা বিজয় সিংহ।

জনশ্রুতি আছে যে, এই রাজা সকল ধর্মের গুরুদেরকেই বেশ সম্মান করতেন। তাঁর আমলে বন্দরহাটি মসজিদের ইমাম ও খতিব ছিলেন হযরত শাহজি । তিনি ছিলেন জৈন্তিয়ার বিখ্যাত দরবেশ হযরত কাশিম শাহের ছাত্র ও শিষ্য। কাশিম শাহের পরে তিনিই জৈন্তিয়ার সবচেয়ে বড় দরবেশ ছিলেন। রাজা বিজয়নারায়ণ এই মুসলমান ধর্মগুরুকে বেশ সম্মান করতেন। তাই তাঁর মৃত্যুর পর রাজা তাঁর সমাধিস্থলে একটি দৃষ্টিনন্দন মোকাম বা সমাধিঘর বানিয়ে দিয়েছিলেন। জৈন্তিয়ার রাজাদের হাতে নির্মিত যেসব স্থাপনা আজও পুরোপুরিভাবে অক্ষত আছে তার মধ্যে এই সমাধিঘরটি অন্যতম। জৈন্তিয়ার অন্যান্য মোকামের মতো এটিতেও মূল ব্যক্তির সাথে আরও কয়েকজন সমাহিত রয়েছেন; সমাধি ঘরটির ভেতরে রয়েছে তিনজনের সমাধি আর বাইরে রয়েছে দুজনের সমাধি।

হযরত শাহজির সমাধিটি ঘরের ভেতরে। সেখানে তাঁর দুজন খাদেমও সমাহিত রয়েছেন। ঘরের মেঝেতে নির্মিত তিনটি সমাধি দেখতে হুবহু একই রকম। এগুলোর নির্মাণশৈলীতে কোন পার্থক্য নেই। দেখে মনে হয় যে, হযরত শাহজির দুই খাদেমও তাঁর মতোই মর্যাদাবান ছিলেন। তাই রাজা বিজয়নারায়ণ একই আকৃতিতেই সমাধিগুলোকে বাঁধাই করেছিলেন এবং একটি রাজকীয় সমাধিঘরের ভেতরে এগুলোকে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। হযরত শাহজির সাথের দুই খাদেমের মৃত্যুর সময়কাল অজ্ঞাত। হতে পারে যে, তারা হযরত শাহজির আগেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। অথবা এমনও হতে পারে যে, তারা শাহজির পরে মৃত্যুবরণ করেছিলেন এবং তাদের মৃত্যুর পরেই মোকামটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল।

রাজা বিজয়নারায়ণের শাসনকাল ছিল ১৭৮৫ সাল থেকে ১৭৮৮ সাল পর্যন্ত। এরই মধ্যবর্তী কোন এক সময়ে তিনি হযরত শাহজির মোকাম বা সমাধিঘরটি বানিয়ে দিয়েছিলেন। তৎকালীন যুগের বিচারে অত্যন্ত নান্দনিক শৈলীতে এটি নির্মিত হয়েছিল। ঘরটির দক্ষিণের দেয়ালের কারুকাজ চোখে পড়ার মতো। এই দেয়ালের মাঝখানে রয়েছে ঘরটির প্রবেশদ্বার। পশ্চিমের দেয়ালেও কিছু কারুকাজ রয়েছে। পূর্বের দেয়ালজুড়ে রয়েছে অত্যন্ত চমৎকার একটি ঘুলঘুলি বা ভেন্টিলেটর। দিনের বেলায় এই ঘুলঘুলি দিয়েই ঘরের ভেতরে আলো প্রবেশ করে। রাতের অন্ধকার দূর করার জন্য একসময় ঘরের ভেতরে প্রদীপ জ্বালানোর প্রচলন ছিল। ঘরের ভেতরের দেয়ালের গায়ে প্রদীপ রাখার কুটুরিগুলো আজও পুরোপুরিভাবে অক্ষত অবস্থায় রয়েছে।

রাজা বিজয় সিংহের শাসনামল কিংবা তাঁর পরবর্তী কোন রাজার শাসনামলে হযরত শাহজির সমাধিঘরটির বাইরে আরও দুজনকে সমাহিত করা হয়েছিল। এদের সমাধিগুলোও রাজকীয় শৈলীতে বাঁধানো রয়েছে। এদের মধ্যে একজন ছিলেন হযরত শাহজির কন্যা। অপর ব্যক্তিটি কে ছিলেন তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে তিনি যে খুবই মর্যাদাসম্পন্ন কেউ ছিলেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। বাইরের দুটো সমাধির নির্মাণশৈলীর সাথে ঘরের ভেতরের সমাধিগুলোর নির্মাণশৈলীর বেশ পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্য থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ঘরের ভেতরের তিনটি সমাধি আর বাইরের দুটো সমাধি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে নির্মিত হয়েছিল। একটি অনুচ্চ দেওয়াল দিয়ে বাইরের দুটো সমাধিকে মূল সমাধিঘরের সাথে যুক্ত করা হয়েছে।এই দেওয়ালটি অবশ্য আগের আমলের দেওয়াল নয়; এটি বর্তমান আমলের। 

সময়ের পরিবর্তনে অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা হারিয়ে যায় অবহেলা ও অযত্নে। অথচ এসব নিদর্শন একটি অঞ্চলের অতীতকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। হযরত শাহজি (রহ.)-এর মোকামের ইতিহাস, স্থাপত্য ও সংশ্লিষ্ট ঐতিহ্য যথাযথভাবে নথিবদ্ধ করা গেলে জৈন্তাপুরের ইতিহাসচর্চা আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।

হযরত শাহজি (রহ.)-এর মোকাম শুধু অতীতের একটি স্মৃতিচিহ্ন নয়; এটি জৈন্তাপুরের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গেও সম্পর্কিত। ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা থেকেই এমন স্থানগুলো সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়।

জৈন্তাপুরের এই ঐতিহাসিক স্থানকে ঘিরে আরও গবেষণা, তথ্যভিত্তিক প্রচার এবং পরিকল্পিত সংরক্ষণ উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হলে এটি স্থানীয় ঐতিহ্যচর্চার পাশাপাশি ইতিহাস ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের কাছেও আরও পরিচিত হয়ে উঠতে পারে।
হযরত শাহজি (রহ.)-এর মোকাম তাই শুধু একটি স্থান নয়—এ যেন জৈন্তাপুরের অতীত, মানুষের শ্রদ্ধা এবং ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার এক নীরব আহ্বান।

—জা.অর্থনীতি/আরএস