অনলাইন ডেস্ক: সুস্থ শরীর ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রামের বিকল্প নেই। ঘুম শরীরের ক্লান্তি দূর করে এবং মস্তিষ্ককে পুনরুজ্জীবিত রাখে। তবে কম ঘুমের মতো প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ঘুমও বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে ঘুমানো এবং শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকার অভ্যাসের সঙ্গে অকালমৃত্যুর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে যারা দিনে নিয়মিত ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা ঘুমান এবং কোনো ধরনের কায়িক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করেন না, তাঁদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন যে, অতিরিক্ত ঘুম সরাসরি মৃত্যুর কারণ না হলেও এর পেছনে থাকা সুপ্ত শারীরিক অসুস্থতা, ঘুমের নিম্নমান এবং অলস জীবনযাপন এই অকাল পরিণতির জন্য দায়ী হতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রতি রাতে সাধারণত সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমকে আদর্শ হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু নিয়মিত নয় ঘণ্টার বেশি ঘুমানো এবং দিনের বেলায় শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্রোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও স্থূলতার মতো প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়ে দেয়। পর্যবেক্ষণমূলক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্রাতিরিক্ত সময় বিছানায় কাটানো ব্যক্তিদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ ও রক্তনালির নানা জটিলতা তৈরির আশঙ্কা বেশি থাকে। দীর্ঘ সময় শুয়ে-বসে থাকার কারণে শরীরের স্বাভাবিক বিপাকক্রিয়া ব্যাহত হয়, যা ধীরে ধীরে কার্ডিওভাসকুলার বা হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্ষমতা দুর্বল করে তোলে।
শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গেও অতিরিক্ত ঘুমের ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র রয়েছে। অতিরিক্ত ঘুমের সঙ্গে অবসাদ ও গভীর বিষণ্নতার পারস্পরিক সম্পর্ক লক্ষ করা যায়; বিষণ্নতার কারণে যেমন মানুষের ঘুমের সময় অস্বাভাবিক বেড়ে যেতে পারে, তেমনি দীর্ঘ সময় বিছানায় পড়ে থাকাও মানসিক জড়তা ও উদ্বেগের জন্ম দেয়। ফলে দীর্ঘ সময় ঘুমানোর পরও অনেকের ক্লান্তি ও ঝিমুনি কাটে না, যা দৈনন্দিন কর্মদক্ষতা, মনোযোগ ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এছাড়া দিনের বেশিরভাগ সময় বিছানায় কাটানোর কারণে শারীরিক সক্রিয়তা কমে গিয়ে দ্রুত ওজন বৃদ্ধি পায় এবং অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাসের কারণে ব্যক্তি জটিল স্থূলতার শিকার হন।
কোনো ব্যক্তি যদি রাতে নিয়মিত ৯ থেকে ১০ ঘণ্টার বেশি ঘুমানোর পরও দিনের বেলায় অতিরিক্ত তন্দ্রাচ্ছন্নতা বা ক্লান্তিতে ভোগেন, তবে সেটিকে স্বাভাবিক অলসতা না ভেবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কারণ অতিরিক্ত ঘুমের এই চাহিদার পেছনে থাইরয়েডের ভারসাম্যহীনতা, ঘুমের মধ্যে শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা বা ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’, দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক সমস্যা কিংবা নিয়মিত সেবন করা কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে। এ ধরনের অন্তর্নিহিত স্বাস্থ্যসমস্যা চিহ্নিত না করে কেবল ঘুমিয়ে সময় পার করলে শারীরিক ক্ষতি আরও স্থায়ী রূপ নিতে পারে।
সুস্থ ও দীর্ঘায়ু পেতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো ঘুমের পরিমাণের চেয়ে ঘুমের গুণগত মান এবং সক্রিয় জীবনযাত্রাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া। প্রতিদিন ছুটির দিনেও একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং সকালে নির্দিষ্ট সময়ে ওঠার অভ্যাস গড়ে তুললে শরীরের জৈবিক ছন্দ ঠিক থাকে। এর সঙ্গে নিয়মিত হাঁটাচলা ও শরীরচর্চা করা, সুষম পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ এবং রাতে শোবার আগে চা-কফি ও অতিরিক্ত মুঠোফোন ব্যবহারের অভ্যাস পরিহার করা অত্যন্ত জরুরি। শরীর সুস্থ রাখতে যেমন পর্যাপ্ত বিশ্রামের প্রয়োজন, তেমনি অকালমৃত্যু ও দীর্ঘমেয়াদি রোগব্যাধি এড়াতে দিনের বেলা শারীরিকভাবে সচল ও কর্মচঞ্চল থাকাও সমানভাবে আবশ্যক।
জেএ/অভি