জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: বাংলাদেশের প্রতিবেশী মিয়ানমারের হাতে যদি সত্যিই পারমাণবিক অস্ত্র চলে আসে, তাহলে কী হতে পারে? বাংলাদেশের নিরাপত্তা কি আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে? আর দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক ভারসাম্যেই বা কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে?
প্রশ্নগুলো শুনতে ভয়ংকর। তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। মিয়ানমার গোপনে পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে, এমন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশ্যে নেই। কিন্তু দেশটি থেকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহারযোগ্য উপাদান পাচারের ঘটনা, অতীতের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সন্দেহ এবং রাশিয়ার সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
ঘটনাটি বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে ২০২৪ সালে। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জানায়, জাপানের অপরাধী চক্রের নেতা তাকেশি এবিসাওয়া মিয়ানমার থেকে পারমাণবিক উপাদান পাচারের ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। এসব উপাদান অন্য দেশে বিক্রির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তকারীরা থাইল্যান্ডে নমুনা সংগ্রহ করেন। পরীক্ষায় সেগুলোর মধ্যে ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম এবং অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহারযোগ্য মানের প্লুটোনিয়ামের উপস্থিতি পাওয়া যায়।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি কেবল গুজব ছিল না। ঘটনাটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে মামলা হয়েছিল। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এবিসাওয়া পারমাণবিক উপাদান পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধে দোষ স্বীকার করেন। ২০২৬ সালের মার্চে তাঁকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে মিয়ানমারের সামরিক সরকার পারমাণবিক বোমা তৈরি করে ফেলেছে। বরং এই ঘটনা দেখিয়েছে, দেশটি থেকে বিপজ্জনক পারমাণবিক উপাদান সংগ্রহ এবং তা আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রের মাধ্যমে পাচারের চেষ্টা হয়েছিল। আর এ কারণেই বিষয়টি শুধু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়। কিন্তু মিয়ানমারের সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্রের সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলো কীভাবে?
২০০০-এর দশক থেকেই মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা হয়েছে। ২০০৯ সালে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানায়, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে মিয়ানমারের সামরিক সহযোগিতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন ছিল। কিছু বিশেষজ্ঞ সন্দেহজনক সরঞ্জাম কেনাকাটা এবং দুই দেশের যোগাযোগের বিষয়টি সামনে এনেছিলেন। তবে তখনও মিয়ানমারের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি থাকার নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, দীর্ঘদিন ধরে সন্দেহ রয়েছে, কিন্তু সন্দেহ আর প্রমাণ এক বিষয় নয়।
এরপর আসে রাশিয়ার সঙ্গে মিয়ানমারের পারমাণবিক সহযোগিতার বিষয়টি। মিয়ানমারের সামরিক সরকার বেসামরিক কাজে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন, চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার মতো ক্ষেত্র রয়েছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের সঙ্গেও সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বুঝতে হবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করা আর পারমাণবিক বোমা তৈরি করা এক বিষয় নয়। শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায়। তবে সেই প্রযুক্তির কিছু অংশের অপব্যবহারের ঝুঁকি থাকায় আন্তর্জাতিক নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে বাংলাদেশের জন্য বিপদটা কোথায়?
প্রথমত, সীমান্ত নিরাপত্তা। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের সময় গোলা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে এসে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। রোহিঙ্গা সংকটও দুই দেশের সম্পর্ককে দীর্ঘদিন ধরে জটিল করে রেখেছে। এমন পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন কোনো উদ্বেগ তৈরি হলে বাংলাদেশকে নিরাপত্তা পরিকল্পনায় আরও সতর্ক হতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পারমাণবিক উপাদান পাচার। ইউরেনিয়াম বা প্লুটোনিয়ামের মতো উপাদান অবৈধভাবে হাতবদল হলে তা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অপরাধী চক্র বা সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে এসব উপাদান পৌঁছানোর আশঙ্কা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। তবে তেজস্ক্রিয় উপাদান পাওয়া মানেই কেউ পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেলতে পারবে, এমন নয়।
তৃতীয়ত, আঞ্চলিক সামরিক প্রতিযোগিতা। মিয়ানমার যদি ভবিষ্যতে সত্যিই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে এগোয়, তাহলে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস বাড়তে পারে। সামরিক ব্যয় এবং কূটনৈতিক উত্তেজনাও বাড়ার আশঙ্কা থাকবে।
কিন্তু মিয়ানমার কি চাইলেই পারমাণবিক বোমা বানাতে পারবে? না। এর জন্য প্রয়োজন উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ বিজ্ঞানী, বিপুল অর্থ, বিশেষায়িত অবকাঠামো এবং অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। শুধু ইউরেনিয়াম বা অন্য কোনো পারমাণবিক উপাদান হাতে থাকলেই বোমা তৈরি করা যায় না। তার ওপর মিয়ানমার দীর্ঘদিন ধরে গৃহযুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট এবং সামরিক চাপের মধ্যে রয়েছে। এসব বাস্তবতা দেশটির জন্য বিশাল একটি পারমাণবিক অস্ত্র প্রকল্প পরিচালনাকে আরও কঠিন করে তোলে। তবে এসব বাধা থাকলেই ভবিষ্যতে কোনো ঝুঁকি একেবারে অসম্ভব হয়ে যায় না।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আতঙ্ক ছড়ানো নয়; বরং বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা। মিয়ানমার পারমাণবিক বোমা তৈরি করে ফেলেছে, এমন দাবি করার মতো নিশ্চিত তথ্য নেই। কিন্তু দেশটি থেকে পারমাণবিক উপাদান পাচারের ঘটনায় যে গুরুতর নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। বাংলাদেশের উচিত সীমান্ত নজরদারি জোরদার করা, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময় বাড়ানো এবং কূটনৈতিকভাবে মিয়ানমারের পারমাণবিক কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পক্ষে অবস্থান নেওয়া।
কারণ, বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখনই মিয়ানমারের হাতে পারমাণবিক বোমা আছে কি না, শুধু তা নয়। প্রশ্ন হলো, বিপজ্জনক পারমাণবিক উপাদানের অবৈধ বাণিজ্য ঠেকানো যাচ্ছে কি না, আর ভবিষ্যতে কোনো সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা যেন পুরো অঞ্চলকে ঝুঁকিতে না ফেলে, তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে কি না।
মিয়ানমারের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে সন্দেহ বহুদিনের। কিন্তু সন্দেহকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে প্রচার করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি বাস্তব ঘটনাগুলোকে অবহেলা করাও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
মিয়ানমার পারমাণবিক বোমা বানালে বিপদে পড়বে বাংলাদেশ?
মিয়ানমার যদি ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করে, তাহলে বাংলাদেশের জন্য কী বিপদ তৈরি হতে পারে?
প্রথমত, দুই দেশের সীমান্তে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে। দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সামরিক প্রতিযোগিতা তীব্র হতে পারে। তৃতীয়ত, পারমাণবিক উপাদান পাচারের ঝুঁকি পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, মিয়ানমার পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে, এমন নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশ্যে নেই। রাশিয়ার সঙ্গে দেশটির পারমাণবিক সহযোগিতার ঘোষিত লক্ষ্য শান্তিপূর্ণভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও প্রযুক্তির ব্যবহার। তাই আতঙ্ক নয়, বাংলাদেশের প্রয়োজন সতর্ক নজরদারি, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি