জাবি প্রতিনিধি: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ক্যাম্পাসে প্রথমবারের মতো মেরুন বেনেবউ পাখির উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়েছে। সাধারণত পাহাড়ি বনাঞ্চলে বসবাসকারী এ পাখিটির দেখা মিলেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন এলাকার একটি গাছে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দুপুরে পাখিটি শনাক্ত করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকর্মী অরিত্র সাত্তার।
পাখিবিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে প্রজাতিটি মূলত সিলেট ও চট্টগ্রামের পাহাড়ি বনাঞ্চলে দেখা যায়। পাহাড়ের বাইরে এর উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বিরল। ফলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সমতল এলাকার ক্যাম্পাসে পাখিটির দেখা পাওয়া স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।
মেরুন বেনেবউয়ের ইংরেজি নাম Maroon Oriole এবং বৈজ্ঞানিক নাম Oriolus traillii। গাঢ় তামাটে-মেরুন দেহ ও কালো মাথার কারণে পাখিটি সহজেই শনাক্ত করা যায়। আকারে এটি ময়নার চেয়ে কিছুটা বড়। তবে গাছের উঁচু ডালে এবং পাতার আড়ালে থাকার প্রবণতার কারণে সচরাচর চোখে পড়ে না।
প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ পাখির দেহের অধিকাংশ পালক গাঢ় মেরুন রঙের। মাথা, ঘাড় ও ডানা কালো; ঠোঁট নীলাভ-কালো। স্ত্রী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ পাখির দেহের নিচের অংশ ধূসর-সাদা এবং তাতে কালো দাগ থাকে।
পাখিটি সাধারণত একা কিংবা জোড়ায় বিচরণ করে। কখনো ফিঙে ও মিনিভেটের মতো পাখির সঙ্গে দলেও দেখা যায়। গাছের পাতা ও ডালপালার আড়ালে থাকলেও ফুলের মধু সংগ্রহের সময় তুলনামূলক সহজে নজরে আসে। এর ডাকের মধ্যে কর্কশ শব্দের পাশাপাশি শিসের মতো ধ্বনিও শোনা যায়।
মেরুন বেনেবউয়ের প্রধান আবাসস্থল হিমালয়ের পাদদেশের আর্দ্র পর্ণমোচী ও চিরসবুজ বন এবং এর আশপাশের এলাকা। ভারতীয় উপমহাদেশে হিমাচল প্রদেশ থেকে অরুণাচল প্রদেশ পর্যন্ত হিমালয়সংলগ্ন অঞ্চল এবং মণিপুরসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন এলাকায় পাখিটির বিস্তৃতি রয়েছে। বাংলাদেশে মূলত সিলেট ও চট্টগ্রামের পাহাড়ি বনাঞ্চলে এর দেখা মেলে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও পাখিবিশেষজ্ঞ ড. এম মনিরুল এইচ খান বলেন, তাম্ররঙা বেনেবউ মূলত সিলেট ও চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করে। তবে সেসব এলাকাতেও পাখিটি খুব বেশি দেখা যায় না।
তিনি বলেন, “শহর বা শহরতলির বনাঞ্চলে এ প্রজাতির পাখি দেখা যাওয়া একেবারেই স্বাভাবিক ঘটনা নয়।”
মনিরুল এইচ খানের ভাষ্য অনুযায়ী, পাহাড়ি এলাকার বাইরে বাংলাদেশে এর আগে মাত্র দুবার পাখিটির উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়েছিল। এর মধ্যে একবার ঢাকার মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে এবং অন্যবার দিনাজপুরের উত্তর নবাবগঞ্জে পাখিটির দেখা পাওয়া যায়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আশপাশের অনেক এলাকায় একসময় প্রচুর গাছপালা থাকলেও সেগুলোর বড় একটি অংশ এখন আর নেই। তুলনামূলকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এখনো পাখির জন্য অনুকূল আবাসস্থল হিসেবে টিকে আছে।
মেরুন বেনেবউয়ের খাদ্যতালিকায় রয়েছে বিভিন্ন ধরনের কীটপতঙ্গ, শুঁয়োপোকা, ক্ষুদ্র অমেরুদণ্ডী প্রাণী, জামজাতীয় ফল, বুনো ডুমুর, বেরি ও ফুলের মধু। গাছের পাতা ও ডালে খাবার খোঁজার কারণে খাদ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে এটি অনেকটাই বৃক্ষনির্ভর।
প্রজনন মৌসুমে সাধারণত এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে পাখিটি বাসা তৈরি করে। গাছের ডালের সংযোগস্থলে তন্তু ও মাকড়সার জাল ব্যবহার করে কাপের মতো বাসা বানায়। সেখানে সাধারণত দুটি থেকে তিনটি গোলাপি-সাদা ডিম পাড়ে, যেগুলোর গায়ে কালো বা লালচে-বাদামি দাগ থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের পাখির আবাসস্থল টিকিয়ে রাখতে বড় গাছ, ঘন বৃক্ষরাজি ও প্রাকৃতিক বন সংরক্ষণ জরুরি। নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ করার পাশাপাশি পাখির বিচরণস্থলে অপ্রয়োজনীয় মানুষের আনাগোনা ও হস্তক্ষেপ কমানোও গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যাম্পাসে মেরুন বেনেবউয়ের উপস্থিতি নিয়ে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকর্মী অরিত্র সাত্তার বলেন, এ ঘটনা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থানের সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে।আমাদের জাহাঙ্গীরনগরে এই নিয়ে চার প্রজাতির বেনে বউ দেখা গেল যার মধ্যে তামা রং, নতুন। এছাড়াও কালো ঘার হলদে পাখি (Black napped oriole), সোনা বউ (Indian Golden oriole ) এর এক্টিভিটি আমরা পাই যারা এই অঞ্চলে পরিযায়ী। এদের স্থায়ী প্রজাতি যেটা জাহাঙ্গীরনগরে বাস করে তার নাম বেনে বউ Black hooded oriole।
তিনি মনে করেন, মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত প্রাকৃতিক আবাসস্থল পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। এ জন্য নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপ করে প্রকৃতিকে মানুষের বিরক্তি ও হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে পাখিবিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছর পরিযায়ী পাখিরা নির্ধারিত সময়েই আসতে শুরু করেছে। আগের বছরগুলোতে কিছু প্রজাতির আগমনে বিলম্ব দেখা গেলেও এবার তাদের আগমন সময়মতো হচ্ছে বলে তারা জানিয়েছেন।
ক্যাম্পাসে মেরুন বেনেবউয়ের উপস্থিতি তাই কেবল বিরল একটি পাখির দেখা পাওয়ার ঘটনা নয়; এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে। গাছপালা ও পাখির বিচরণস্থল সুরক্ষিত রাখা গেলে ভবিষ্যতেও এমন বিরল প্রজাতির পাখির জন্য অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখার সম্ভাবনা থাকবে।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি