নিউরালিংক সফল হলে মানুষের মস্তিষ্কের সংকেতেই চলবে কম্পিউটার? (ভিডিও)
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: কম্পিউটার চালাতে আর কিবোর্ড বা মাউসের দরকারই হলো না, শুধু ভাবলেই কাজ হয়ে গেল! মস্তিষ্কের সংকেত সরাসরি কম্পিউটারে পৌঁছে গেলে মানুষ আর প্রযুক্তির দূরত্ব কতটা কমবে? নিউরালিংক ও ব্রেইন কম্পিউটার ইন্টারফেস সেই ভবিষ্যতের দিকেই এগোচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটি কি সত্যিই মানুষের মস্তিষ্ককে নতুন কম্পিউটারে পরিণত করবে, নাকি তৈরি করবে মানুষ ও মেশিনের নতুন সংযোগ?

 

কম্পিউটার চালাতে এতদিন প্রয়োজন হয়েছে কিবোর্ড, মাউস, টাচস্ক্রিন কিংবা ভয়েস কমান্ড। কিন্তু ভবিষ্যতে হয়তো কম্পিউটারকে নির্দেশ দিতে হবে না মুখে বলেও। শুধু মস্তিষ্কের সংকেতই হতে পারে নতুন ইনপুট সিস্টেম।

এই ধারণার নাম ব্রেইন কম্পিউটার ইন্টারফেস বা বিসিআই। সহজ ভাষায়, এটি এমন একটি প্রযুক্তি যা মস্তিষ্কের নিউরাল সিগন্যাল শনাক্ত করে সেগুলোকে কম্পিউটার বা অন্য কোনো যন্ত্রের নির্দেশে রূপান্তর করতে পারে। অর্থাৎ মানুষ ভাবছে একটি নির্দিষ্ট নড়াচড়া বা কাজের কথা, আর প্রযুক্তি সেই মস্তিষ্কের সংকেতকে কমান্ড হিসেবে ব্যাখ্যা করছে।

এই প্রযুক্তির সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি নিউরালিংক। ইলন মাস্কের কোম্পানিটি একটি পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর ওয়ারলেস বিসিআই তৈরি করছে। নিউরালিংক-এর বর্তমান ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে মস্তিষ্কের সংকেত ব্যবহার করে কম্পিউটার ও রোবোটিক আর্ম নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। নিউরালিংক সফল হলেও মানুষের মস্তিষ্ক নিজে কম্পিউটারে পরিণত হবে না। বরং মস্তিষ্ক ও কম্পিউটারের মধ্যে তৈরি হবে একটি নতুন যোগাযোগের সেতু। মানুষের মস্তিষ্ক থাকবে সিদ্ধান্ত ও চিন্তার কেন্দ্র হিসেবে, আর বিসিআই সেই সংকেতকে ডিজিটাল কমান্ডে অনুবাদ করবে।

এর সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবহার হতে পারে চিকিৎসাক্ষেত্রে। পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তি হাত নাড়াতে না পারলেও কম্পিউটার কার্সর নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, যোগাযোগ করতে পারেন বা ভবিষ্যতে রোবোটিক অঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন-এটাই বিসিআই গবেষণার অন্যতম বড় লক্ষ্য। নিউরালিংক-এর একটি সক্রিয় ট্রায়ালে কম্পিউটার ও রোবোটিক আর্ম নিয়ন্ত্রণ এবং আরেকটিতে চিন্তার সংকেত থেকে শব্দ ডিকোড করার সম্ভাবনা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

এখানেই তৈরি হচ্ছে বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। প্রথমত, তৈরি হতে পারে নতুন ধরনের মেডিকেল ডিভাইস ও নিউরোটেকনোলজি শিল্প। দ্বিতীয়ত, রোবোটিক্স ও সহায়ক প্রযুক্তিগুলো আরও উন্নত হতে পারে। তৃতীয়ত, ভবিষ্যতে গেমিং, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, স্মার্ট ডিভাইস এবং মানব-কম্পিউটার ইন্টারঅ্যাকশনেও বিসিআইয়ের ব্যবহার বাড়তে পারে।

বাজারের পূর্বাভাসও এই আগ্রহের প্রতিফলন দেখাচ্ছে। একটি সাম্প্রতিক বাজার গবেষণা অনুযায়ী, বৈশ্বিক বিসিআই বাজার ২০২৬ সালে প্রায় ২৯৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার থেকে ২০৩৪ সালে প্রায় ৯৬০ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।  তবে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হিসাবের মধ্যে বড় পার্থক্য আছে, কারণ বিসিআই-এর সংজ্ঞা ও বাজারের পরিধি একেক গবেষণায় একেক রকম।

আর নিউরালিংক একা নয়। চীনও বিসিআই প্রযুক্তিতে দ্রুত এগোচ্ছে এবং সেখানে বাণিজ্যিক ব্যবহারের দিকে যাওয়ার চেষ্টা চলছে। ফলে এটি শুধু একটি প্রযুক্তি কোম্পানির প্রতিযোগিতা নয়, বরং ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য, রোবোটিক্স ও কম্পিউটিং শিল্পের একটি বড় প্রযুক্তিগত দৌড়।
 
তবে পথটা একেবারেই সহজ নয়। মস্তিষ্কে স্থাপনযোগ্য ডিভাইসের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি, ডেটা সুরক্ষা, ব্যক্তিগত চিন্তার গোপনীয়তা এবং প্রযুক্তির খরচ-সবই বড় প্রশ্ন।

তাই নিউরালিংক সফল হলেই রাতারাতি সবাই মাথায় চিপ নিয়ে ঘুরবে, এমনটা ভাবার কারণ নেই। বরং প্রথম বিপ্লবটি সম্ভবত আসবে চিকিৎসাক্ষেত্রে। এরপর প্রযুক্তি যত নিরাপদ, সস্তা ও নির্ভরযোগ্য হবে, ততই এর ব্যবহার ছড়িয়ে যেতে পারে।

শেষ পর্যন্ত বিসিআই হয়তো মানুষের মস্তিষ্ককে কম্পিউটার বানাবে না। বরং কম্পিউটারকে মানুষের মস্তিষ্কের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসবে। আর সেই পরিবর্তন সফল হলে, ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কম্পিউটার হয়তো ডেস্কে থাকবে না, থাকবে মানুষের সঙ্গে আরও সরাসরি সংযুক্ত।

মস্তিষ্কের সংকেতেই কি নতুন অর্থনীতি?

কিবোর্ড, মাউস কিংবা টাচস্ক্রিন ছাড়াই কম্পিউটার চালানো সম্ভব হলে কেমন হবে? ব্রেইন কম্পিউটার ইন্টারফেস বা বিসিআই মস্তিষ্কের নিউরাল সিগন্যালকে কম্পিউটারের কমান্ডে রূপান্তর করতে পারে। নিউরালিংক এখন মানুষের মস্তিষ্কের সংকেত দিয়ে কম্পিউটার ও রোবোটিক আর্ম নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি পরীক্ষা করছে। এর সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষের যোগাযোগ ও স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা। ভবিষ্যতে চিকিৎসার পাশাপাশি রোবোটিক্স, গেমিং ও মানব কম্পিউটার ইন্টারঅ্যাকশনেও তৈরি হতে পারে বিশাল নতুন বাজার।

মস্তিষ্ক কি সত্যিই নতুন কম্পিউটার হতে যাচ্ছে? আসলে মস্তিষ্ক কম্পিউটারে পরিণত হবে না, বরং দুটির মধ্যে তৈরি হবে সরাসরি যোগাযোগের সেতু। নিউরালিংক-এর মতো বিসিআই প্রযুক্তি মস্তিষ্কের সংকেত পড়ে সেটিকে ডিজিটাল নির্দেশে পরিণত করার চেষ্টা করছে। আজ যার লক্ষ্য মূলত পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষের কম্পিউটার বা রোবোটিক ডিভাইস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করা, ভবিষ্যতে সেটিই হয়ে উঠতে পারে নতুন প্রযুক্তি শিল্পের ভিত্তি। তবে নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও খরচের প্রশ্নের উত্তর এখনও পুরোপুরি মেলেনি।

—জা. অর্থনীতি/এলএটি