ক্যামেরার লাইট না জ্বালিয়ে যেভাবে গোপনে ভিডিও রেকর্ড করা হয় (ভিডিও)
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: ল্যাপটপ বা ফোনের স্ক্রিন বন্ধ করে নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়েছেন? কিংবা সিসিটিভি ক্যামেরার সুইচ অফ করে ভেবেছেন কেউ দেখছে না? বিশাল ভুল করছেন! প্রযুক্তির এই অন্ধকার জগতে ক্যামেরা দৃশ্যত অফ থাকলেও কিন্তু ব্যাকগ্রাউন্ডে রেকর্ড হয়ে যাচ্ছে আপনার সব ব্যক্তিগত মুহূর্ত। কীভাবে ক্যামেরার ইন্ডিকেটর লাইট না জ্বালিয়েও গোপনে চলছে রেকর্ড?

ঘরের ভেতর আপনি যখন ক্যামেরা বা স্মার্টফোনের স্ক্রিন বন্ধ করে নিজের মতো সময় কাটাচ্ছেন, তখন হয়তো আপনি ভেবে নিচ্ছেন আপনি সম্পূর্ণ নিরাপদে আছেন। কিন্তু অনুসন্ধানী গবেষণা বলছে, 'ক্যামেরা বন্ধ থাকা'র আধুনিক ধারণাটি সম্পূর্ণ একটি বিভ্রম বা ইলিউশন। আজকের সাইবার দুনিয়ায় ডিভাইসের স্ক্রিন বন্ধ কিংবা ক্যামেরার এলইডি লাইট অফ থাকার মানেই এই নয় যে ক্যামেরা কাজ করছে না।

 

আমরা সাধারণত ডিভাইসের লেন্সের পাশে থাকা ছোট ইন্ডিকেটর লাইটটি দেখে নিশ্চিত হই যে ক্যামেরা চালু আছে নাকি বন্ধ। কিন্তু আধুনিক সাইবার অপরাধীরা তৈরি করেছে এমন সব 'জিরো-ক্লিক এক্সপ্লয়েট' এবং 'ফার্মওয়্যার রুটকিট', যা সরাসরি হার্ডওয়্যার বা ড্রাইভারের লেভেলে আঘাত করে। এর ফলে সাইবার অ্যাটাকাররা আপনার ডিভাইসের ক্যামেরা চালু করলেও লেন্সের পাশের নোটিফিকেশন বা গ্রিন লাইটটি জ্বলবে না। অর্থাৎ ক্যামেরা ১০০% অ্যাক্টিভ থাকবে এবং ফুল এইচডি ফুটেজ রেকর্ড করবে, অথচ আপনি ভাববেন সেটা বন্ধ রয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও একটি চাঞ্চল্যকর দিক সামনে এসেছে, তা হলো 'স্ট্যান্ডবাই মোড' বা ব্যাটারি সেভিং মোডের ফাঁদ। অনেক স্মার্ট টেলিভিশন, ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট, আইপি ক্যামেরা এবং স্মার্টফোনের সেন্সরগুলোকে কোম্পানিগুলো এমনভাবে ডিজাইন করে যাতে ডিভাইস অফ থাকলেও ভেতরের কিছু চিপসেট সারাক্ষণ সক্রিয় থাকে। ব্যাকগ্রাউন্ডে থাকা গোপন ম্যালওয়্যার এই মোডটিকে ব্যবহার করে সাইলেন্টলি অডিও এবং ভিডিও স্ট্রিম তৈরি করে হ্যাকারদের রিমোট সার্ভারে পাঠাতে থাকে।

ল্যাপটপ বা কম্পিউটারের অপারেটিং সিস্টেমে যখন কোনো স্পাইওয়্যার প্রবেশ করে, তখন তা ডিভাইসের স্লিপ মোড বা স্ক্রিনশট ফাংশনকে ব্যবহার করে প্রতি কয়েক সেকেন্ড পর পর ব্যাকগ্রাউন্ডে ঘরের ছবি ও ফুটেজ স্ন্যাপ করে। এরপর সংগৃহীত ফাইলগুলো এনক্রিপ্ট করে সাইবার সিন্ডিকেটের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে এসব ফুটেজ ব্যবহার করা হয় সাইবার স্ট্যাকিং, ব্ল্যাকমেইলিং কিংবা ডার্ক ওয়েবের প্রিমিয়াম মেম্বারশিপ সার্ভিসগুলোতে লাইভ কন্টেন্ট হিসেবে বিক্রি করার জন্য।

ডিভাইসের এই ছদ্মবেশী নজরদারি থেকে নিজেকে বাঁচানোর কার্যকর উপায়গুলো কী?

প্রথমত, প্রযুক্তির ওপর অন্ধবিশ্বাস রাখা বন্ধ করুন। ল্যাপটপ বা ডেস্কটপের ওয়েবক্যামে সস্তা কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর 'ফিজিক্যাল প্রাইভেসি কভার' ব্যবহার করুন।

দ্বিতীয়ত, কাজ শেষে বা ঘুমানোর সময় ঘরের সিকিউরিটি আইপি ক্যামেরার সকেট থেকে সরাসরি পাওয়ার ক্যাবল খুলে দিন, স্রেফ রিমোট দিয়ে বন্ধ করে রাখবেন না।

তৃতীয়ত, ফোনের ওএস এবং সিকিউরিটি প্যাচ সবসময় আপ-টু-ডেট রাখুন, কারণ এগুলো সফটওয়্যার লেভেলের নতুন এক্সপ্লয়েটগুলোকে ব্লক করে।

এবং চতুর্থত, ফোনে 'ক্যামেরা এক্সেস অ্যালার্ট' অপশন চালু রাখুন যাতে কোনো সিস্টেম লাইট ছাড়া ক্যামেরা ট্রিগার হলেও ডিসপ্লেতে পপ-আপ অ্যালার্ট আসে।

আপনি স্ক্রিন বন্ধ করলেই যে প্রযুক্তি আপনাকে দেখা বন্ধ করে দেয়-এই ধারণা থেকে বের হয়ে আসাই এখন সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। সতর্কতাই একমাত্র ঢাল যা আপনার একান্ত ব্যক্তিগত পরিসরকে সাইবার শকুনের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। নিজের ঘরের ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতেই রাখুন, নিরাপদ থাকুন।

—জা. অর্থনীতি/এলএটি