আলি হায়দার, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ): কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে বিমানবন্দর থেকে বাড়ি ফেরার পথে ডাকাতির কবলে পড়েছেন ওমানপ্রবাসী এক যুবক ও তার স্বজনেরা। ৬ থেকে ৭ জনের একটি ডাকাত দল মাইক্রোবাসের গতিরোধ করে ৫ বছরের এক শিশুর গলায় ছুরি ধরে ভয় দেখিয়ে গাড়িতে থাকা লাগেজ নিয়ে যায়। ওই লাগেজে প্রবাসীর বিয়ের জন্য কেনা স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান জিনিসপত্র ছিল বলে জানা গেছে।
ডাকাতি শেষে একটি সিএনজিতে করে ছয়সূতি বাসস্ট্যান্ডের দিক দিয়ে পালিয়ে যায় ডাকাত দলের সদস্যরা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়।
ঘটনাটি ঘটে রোববার (১৮ অক্টোবর) দিবাগত রাত আনুমানিক ৪টা ২০ মিনিটের দিকে কুলিয়ারচর উপজেলার দাড়িয়াকান্দি কাঁঠালতলা এলাকায়।
ভুক্তভোগী ওমানপ্রবাসী শরীফুল ইসলাম (২৫) ভৈরব উপজেলার মানিকদী নতুন বাজার এলাকার বাসিন্দা। প্রায় ৪ বছর ওমানে থাকার পর এবারই প্রথম দেশে ফিরেছেন তিনি। দেশে ফেরার মূল উদ্দেশ্য ছিল বিয়ে। ফোনে তার বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল। দেশে ফিরে আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে স্ত্রীকে ঘরে তোলার কথা ছিল তার।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, শরীফুল ইসলামকে বিমানবন্দর থেকে আনতে তার বাবা আপুস মিয়া, বোন ও ৫ বছরের ভাগনে তাকরিম একটি মাইক্রোবাস নিয়ে ঢাকায় যান। তাদের সঙ্গে ছিলেন চালক সাইমন। তিনি শরীফুলের ফুফাতো ভাই এবং পাশাপাশি বাড়ির বাসিন্দা।
গতকাল দিবাগত রাত দেড়টার দিকে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে মাইক্রোবাসটি নিয়ে তারা ভৈরবের উদ্দেশে রওনা হন। ভৈরবের নাভানা পাম্পে ভোর প্রায় ৪টার দিকে গ্যাস নেওয়ার পর কুলিয়ারচরের দিকে রওনা দেন তারা। প্রায় ২০ মিনিট পর দাড়িয়াকান্দি কাঁঠালতলা এলাকায় পৌঁছালে হঠাৎ ৬ থেকে ৭ জনের একটি দল তাদের মাইক্রোবাসের পথরোধ করে।
চালক সাইমনের ভাষ্য, তারা গাড়িতে গল্প করতে করতে আসছিলেন। গাড়ির গতি ছিল আনুমানিক ৪০ কিলোমিটার। বমি করার কারণে গাড়ির সামনের গ্লাসও খোলা ছিল। হঠাৎ ডাকাতরা গাড়ির গতিরোধ করে। এরপর গাড়ি থামতেই পেছনের অংশ থেকে মালামাল বের করে নিয়ে যায় তারা।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, ডাকাত দলের সদস্যরা মাইক্রোবাসে থাকা ৫ বছরের শিশু তাকরিমের গলায় ছুরি ধরে ভয় দেখায়। এ সময় প্রবাসী শরীফুল ইসলামের সঙ্গে ডাকাতদের কিছুটা ধস্তাধস্তিও হয়। পরে ডাকাতরা গাড়ির পেছনে থাকা লাগেজ নিয়ে যায়।
মাইক্রোবাসে থাকা বড় আকারের কয়েকটি মালামালের কার্টনও নেওয়ার চেষ্টা করে ডাকাত দল। তবে সেগুলো ভারী হওয়ায় কিংবা সিএনজিতে তোলা সম্ভব না হওয়ায় রাস্তার পাশে ফেলে যায় তারা। নিয়ে যাওয়া হয় লাগেজগুলো। আর এসব লাগেজেই ছিল শরীফুলের বিয়ের জন্য কেনা অলংকারসহ মূল্যবান সামগ্রী ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র।
ডাকাতি শেষে একটি সিএনজিতে করে ছয়সূতি বাসস্ট্যান্ডের দিকে চলে যায় ডাকাত দলের সদস্যরা। ঘটনাটির সময় পুলিশ ছয়সূতি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থান করছিল বলে জানা গেছে। ডাকাতরা ডাকাতি করে ওই দিকেই চলে গেলেও তাদের আটক করা সম্ভব হয়নি। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়।
শরীফুল ইসলাম বলেন, দেশের অবস্থা এতটা খারাপ হয়েছে, তা বুঝতে পারিনি। ৪ বছর পর দেশে ফিরলাম বিয়ে করার জন্য। বিয়ের অলংকার থেকে শুরু করে মূল্যবান সব জিনিসপত্র যে লাগেজে ছিল, সেটিই নিয়ে গেছে। এমনকি আমার ৫ বছরের ভাগনের গলায় ছুরি ধরেছে। বিয়েসহ সবকিছু ঠিকঠাক ছিল, এখন বাধ্য হয়ে বিয়ের সময়টাও পরিবর্তন করতে হচ্ছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বিমানবন্দর থেকে বাড়ির একেবারে কাছাকাছি চলে এসেছিলেন তারা। দীর্ঘ প্রবাসজীবন শেষে বিয়ের উদ্দেশ্যে দেশে ফিরে এমন ঘটনার শিকার হবেন, তা তাদের কল্পনাতেও ছিল না।
কুলিয়ারচর থানার অফিসার ইনচার্জ ওসি মোজাম্মেল হক বলেন, এই ঘটনায় থানায় কোনো অভিযোগ আসেনি, অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, কুলিয়ারচরের বিভিন্ন সড়কে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ উঠেছে। গত ২৮ আগস্ট দিবাগত রাতে নোয়াগাঁও এলাকায় রিফ্লেক্টিভ ভেস্ট পরা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মাইক্রোবাস থামিয়ে যাত্রীদের মালামাল লুটের অভিযোগ ওঠে।
এর একদিন আগে ২৭ আগস্ট বাজরা বাসস্ট্যান্ড মাইক্রোবাস আটকে একই ভাবে ডাকাতির ঘটনা ঘটে।
গত ১ অক্টোবর দিবাগত রাতে আগরপুর বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন এলাকায় সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে এক মোটরসাইকেলচালককে জখম করে মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেওয়া এবং পরদিন ২ অক্টোবর রাতে উত্তর লক্ষ্মীপুর-রাজগোপাট সড়কে এক যুবককে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে টাকা ও মালামাল লুটের অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনা ছাড়াও গত ২ মাসে আরও একাধিক ডাকাতির অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কুলিয়ারচরের নোয়াগাঁও, আগরপুর, বাজরা ও আশপাশের সড়কে রাতের বেলায় এ ধরনের ঘটনায় আতঙ্ক বাড়ছে।
—জা. অর্থনীতি/এনজে