ইবনে সিনা থেকে আল-জাহরাভি চিকিৎসাবিজ্ঞানে মুসলিমদের অবদান (ভিডিও)
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:

 

ফ্রি চিকিৎসা, আলাদা কোয়ারেন্টাইন ওয়ার্ড, কঠোর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল আর ডাক্তারদের সরকারি লাইসেন্স- আজকের আধুনিক হাসপাতাল ব্যবস্থার এই সবকিছু কি পশ্চিমা সভ্যতার অবদান? ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা! ইউরোপ যখন কুসংস্কারে নিমজ্জিত, ঠিক তখন মুসলিম বিশ্বের বাগদাদ, কর্ডোবা আর দামেস্কে গড়ে উঠেছিল চিকিৎসার অনন্য এক স্বর্ণযুগ!

প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসার এই যাত্রার সূচনা হয়েছিল নবীজি মুহাম্মদ (সা.)-এর সময়ে। খন্দকের যুদ্ধের ময়দানে আহতদের সেবা দিতে তিনি স্থাপন করেছিলেন একটি বিশেষ চিকিৎসাতাঁবু, যা ইতিহাসে ফিল্ড হাসপাতালের প্রথম রূপ।

এর ধারাবাহিকতায় অষ্টম শতাব্দীর শুরুতে উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালিক দামেস্কে প্রতিষ্ঠা করেন ইসলামের প্রথম স্থায়ী হাসপাতাল- যার ফারসি নাম ছিল ‘বিমারিস্তান’।

এখানেই প্রথমবারের মতো সংক্রামক কুষ্ঠরোগীদের আলাদা রাখার প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন চালু হয়, নিয়োগ পান নিয়মিত বেতনভুক্ত চিকিৎসক এবং দৃষ্টিহীনদের জন্য বরাদ্দ করা হয় বিশেষ রাষ্ট্রীয় ভাতা।

আব্বাসীয় আমলে খলিফা হারুনুর রশিদের হাত ধরে বাগদাদে গড়ে ওঠে একের পর এক সুবিশাল চিকিৎসাকেন্দ্র।

হাজার খ্রিষ্টাব্দের মধ্যেই মুসলিম বিশ্বজুড়ে সক্রিয় ছিল বহু পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল।

রাষ্ট্রীয় নীতি অনুযায়ী জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের চিকিৎসা নিশ্চিত করা ছিল বাধ্যতামূলক। রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত হাসপাতালে বিনামূল্যে থাকার ও উন্নত খাবার পাওয়ার অধিকার ছিল।

স্পেনের মুসলিম কর্ডোবা শহরেই গড়ে উঠেছিল ৫০টিরও বেশি বড় বড় হাসপাতাল, যার উন্নত ব্যবস্থাপনা তাক লাগিয়ে দিয়েছিল তৎকালীন গোটা পৃথিবীকে।

বিমারিস্তানগুলো কেবল রোগী দেখার জায়গা ছিল না, এগুলো ছিল আধুনিক মেডিকেল কলেজের আদি রূপ।

কঠোর তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষার পর দেওয়া হতো চিকিৎসকদের পেশাগত সনদ বা 'মেডিকেল ইজাজাহ'।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক ইবনে সিনা প্রণয়ন করেছিলেন ওষুধ পরীক্ষার বৈজ্ঞানিক নিয়মাবলি, আর তার রচিত 'দ্য ক্যানন অব মেডিসিন' শতাব্দীর পর শতাব্দী ইউরোপের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ানো হয়েছে। অস্ত্রোপচারে আধুনিক ধারার সূচনা করেছিলেন আল-জাহরাভি।

শুধু মানুষের জন্যই ন- অসুস্থ ও বয়োবৃদ্ধ পশুর বিনামূল্যে চিকিৎসার জন্য দামেস্কে গড়ে উঠেছিল বিশেষ পশু হাসপাতাল ও সবুজ অভয়ারণ্যের মতো অনন্য দাতব্য ওয়াকফ ব্যবস্থা।

প্রাচীন জ্ঞানকে শুধু অনুবাদ নয়, বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ আর মানবিক সহমর্মিতায় এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল ইসলামি সভ্যতা। আজকের আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্র ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে সেই সোনালি অতীতের মজবুত ভিত্তির ওপর। ইতিহাসের এই উজ্জ্বল অধ্যায় মানবজাতিকে আজও আলোর পথ দেখায়।

প্রথম আধুনিক হাসপাতাল কারা বানিয়েছিল?

ইউরোপ যখন রোগ সারাতে তন্ত্রমন্ত্রে বিশ্বাস করত, তখন অষ্টম শতাব্দীতে দামেস্কে তৈরি হয়েছিল প্রথম স্থায়ী হাসপাতাল 'বিমারিস্তান'! সেখানে ছিল সরকারি বেতনভুক্ত ডাক্তার, রোগীদের জন্য ফ্রি খাবার এবং বিশ্বের প্রথম আনুষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে চিকিৎসা পাওয়া ছিল প্রতিটি নাগরিকের অধিকার। চিকিৎসার এই সোনালি ইতিহাস কি আপনি জানতেন?

ডাক্তারদের সরকারি লাইসেন্স দেওয়ার নিয়ম এলো কোথা থেকে?

কঠিন পরীক্ষা ছাড়া কেউ ডাক্তারি করতে পারবে না- এই কঠোর নিয়ম শুরু হয়েছিল আব্বাসীয় যুগে 'মেডিকেল ইজাজাহ' ব্যবস্থার মাধ্যমে! ইবনে সিনার ওষুধ পরীক্ষার বৈজ্ঞানিক ফর্মুলা ও আল-জাহরাভির সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি কয়েক শতাব্দী ধরে গোটা ইউরোপে পাঠ্যপুস্তক হিসেবে পড়ানো হয়েছে। এমনকি অসুস্থ পশুর চিকিৎসার জন্যও তখন ছিল বিশেষ হাসপাতাল! শেয়ার করুন ইতিহাসের এই বিস্ময়কর তথ্য।  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি