মায়ের গর্ভেই শিশুর চিকিৎসা, যুগান্তকারী সাফল্য

অনলাইন ডেস্ক: মায়ের গর্ভেই শিশুর ফুসফুসে ৫ সেন্টিমিটারের টিউমার, হুমকিতে ছিল হৃৎপিণ্ডও! প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিতে সমাধান সম্ভব না হওয়ায় বিশেষ সুচ ও মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তির সাহায্য নেন চিকিৎসকেরা। মাত্র দুই মিনিটের তাপ প্রয়োগে টিউমারটির আকার কমে আসে, তিন দিনের মধ্যে সরে যায় শিশুর পেটে জমে থাকা তরলও! এরপর ৩৭ সপ্তাহে জন্ম নেওয়া শিশুটি পায় অ্যাপগার স্কোরে সর্বোচ্চ ১০। গর্ভেই এমন জটিল টিউমারের চিকিৎসা কি ভবিষ্যতে হাজারও শিশুর জীবন বাঁচানোর নতুন পথ খুলে দেবে? 

গবেষণাটি গত ২০ আগস্ট প্রকাশিত হয় ‘আল্ট্রাসাউন্ড ইন অবস্টেট্রিকস অ্যান্ড গাইনোকোলজি’সাময়িকীতে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এই সাফল্যকে গর্ভস্থ শিশুর জটিল টিউমারের চিকিৎসায় নতুন অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। 

গবেষণাপত্র অনুযায়ী, ৪০ বছর বয়সী এক নারী ২২ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা থাকাকালে তার গর্ভের শিশুর ফুসফুসে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি শনাক্ত হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ অবস্থাকে বলা হয় মাইক্রোসিস্টিক কনজেনিটাল পালমোনারি এয়ারওয়ে ম্যালফরমেশন বা সিপিএএম। এটি একটি বিরল জন্মগত সমস্যা। এতে ফুসফুসের টিস্যু অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে। টিস্যুটি ক্যানসারবিহীন হলেও দ্রুত বড় হয়ে হৃৎপিণ্ডের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে এবং শরীরে বিপজ্জনকভাবে তরল জমার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। 

পরীক্ষায় দেখা যায়, শিশুটির বুকের ডান পাশে প্রায় পাঁচ সেন্টিমিটার আকারের টিউমার! এটি হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসকে চেপে ধরছিল! একইসঙ্গে শিশুটির পেটেও তরল জমতে শুরু করে। 

সাধারণত এ ধরণের সমস্যায় অতিরিক্ত তরল বের করে দেওয়া হয় অথবা টিউমারে রক্ত সরবরাহকারী প্রধান রক্তনালির প্রবাহ বন্ধ করা হয়। কিন্তু এই টিউমারটি ছিল অসংখ্য ক্ষুদ্র সিস্ট দিয়ে গঠিত। এতে রক্ত সরবরাহকারী কোনো কেন্দ্রীয় রক্তনালি না থাকায় প্রচলিত পদ্ধতিতে চিকিৎসা করা সম্ভব হচ্ছিল না।
এ অবস্থায় চিকিৎসকেরা উচ্চমানের আলট্রাসাউন্ডের সাহায্যে টিউমারে পৌঁছানোর পথ নির্ধারণ করেন। এরপর মায়ের পেট, জরায়ুর দেয়াল ও গর্ভস্থ শিশুর বুকের দেয়াল ভেদ করে একটি বিশেষ সরু সুচ টিউমারের কেন্দ্রে প্রবেশ করানো হয়। সেখানে প্রয়োগ করা হয় মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তিতে তাপ সৃষ্টি করে টিউমারের টিস্যু ধ্বংস করা হয়। 

চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে সক্রিয়ভাবে তাপ প্রয়োগ করতে সময় লাগে মাত্র দুই মিনিট। আলট্রাসাউন্ডের পর্দায় তাপের বিস্তার পর্যবেক্ষণ করা হয়, যাতে শিশুর সুস্থ অঙ্গগুলোর ক্ষতি না হয়। 

অস্ত্রোপচারের মাত্র তিন দিনের মধ্যে টিউমারের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। একইসঙ্গে শিশুটির পেটে জমে থাকা তরলও পুরোপুরি সরে যায়। গর্ভাবস্থার ৩৭ সপ্তাহে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশুটির জন্ম হয়। 

জন্মের সময় তার ওজন ছিল ২ দশমিক ৯ কেজি। নবজাতকের শারীরিক অবস্থা মূল্যায়নের অ্যাপগার স্কোরে সে পায় ১০, যা সর্বোচ্চ স্কোর! তবে, চিকিৎসকেরা সতর্ক করেছেন, একটি ঘটনার ভিত্তিতে এই পদ্ধতির নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে এটি নিরাপদ, পুনরায় প্রয়োগযোগ্য ও কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হলে সিপিএএমের মতো জটিল সমস্যার চিকিৎসায় নতুন বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।

জা. অর্থনীতি/এনএ/এআর