নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম: প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ঋণের ভারে চাপে পড়েছে জিপিএইচ গ্রুপ। ৩৪টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া এই ঋণের মধ্যে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি জিপিএইচ ইস্পাত। সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা প্রতিষ্ঠানটি ঋণ পুনর্গঠন ও আর্থিক পুনর্বিন্যাসের জন্য চার মাস সময় চেয়েছে। এই সময়ে খেলাপি হিসেবে শ্রেণীকরণ স্থগিত রাখার পাশাপাশি ব্যবসা চালু রাখতে কার্যকরী মূলধন সুবিধাও চেয়েছে কোম্পানিটি।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর জিপিএইচ ইস্পাতের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের কাছে এসব সুবিধা চাওয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, সিআইবি (ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো) প্রতিবেদন, ঋণসংক্রান্ত কিছু প্রক্রিয়াগত বিষয় ও বিধিগত কারণে ঋণ পুনর্গঠনসহ আর্থিক ব্যবস্থাগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে জটিলতা হচ্ছে।
চিঠির তথ্য অনুযায়ী, জিপিএইচ ইস্পাতের বিদ্যমান ঋণ ও ক্রেডিট পুনর্গঠন, পুনঃতফসিল এবং সামগ্রিক আর্থিক পুনর্গঠনের বিষয়ে ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে একটি সভা হয়। সভায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। কোম্পানির পক্ষ থেকে বলা হয়, বিদ্যমান আর্থিক পরিস্থিতি ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম পর্যালোচনা করে ঋণ পুনর্গঠন, তারল্য ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
চার মাসের ছাড় কেন
জিপিএইচ ইস্পাতের ভাষ্য, সিআইবি প্রতিবেদন ও ঋণসংক্রান্ত কিছু প্রক্রিয়াগত এবং বিধিগত প্রয়োজনীয়তার কারণে প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং সুবিধা গ্রহণ ও প্রস্তাবিত ঋণ পুনর্গঠনের কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণে চার মাসের জন্য সিআইবি-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয়তা শিথিল বা অব্যাহতি চেয়েছে তারা। কোম্পানিটির মতে, এই সময় পাওয়া গেলে ঋণদাতা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রয়োজনীয় দলিল, অনুমোদন ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি ঋণ পুনর্গঠন ও আর্থিক পুনর্বিন্যাসের কাজও এগিয়ে নেওয়া যাবে।
ব্যাংক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জিপিএইচ গ্রুপকে ঋণ দেওয়া একটি ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা বলেন, গ্রুপটির চলতি মূলধন ঋণের বিপরীতে যে পরিমাণ মালামাল থাকার কথা, তার একটি অংশ গুদাম বা বাজারে নেই। তার হিসাবে, প্রায় ১০ শতাংশ মালামাল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ঋণের অর্থের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ছাড় দিলেও দীর্ঘ মেয়াদে গ্রুপটির আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
চার মাসে যা করতে চায়
জিপিএইচ ইস্পাতের চিঠিতে চার মাসের মধ্যে কয়েকটি কার্যক্রম শেষ করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে: ১. (ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিল) বিদ্যমান ব্যাংক দায়-দেনার চলমান পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিলের প্রক্রিয়া শেষ করা। ২. (ব্যাংকের আনুষ্ঠানিকতা) সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রয়োজনীয় দলিল, অনুমোদন ও আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা চূড়ান্ত করা। ৩. (কার্যকরী মূলধন সুবিধা) স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালু রাখতে প্রয়োজনীয় কার্যকরী মূলধন সুবিধা গ্রহণ ও তা অব্যাহত রাখা। ৪. (ঋণের বোঝা কমানো) ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আর্থিক পুনর্গঠন ও ঋণের বোঝা কমানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। ৫. (নগদ প্রবাহ বাড়ানো) নগদ প্রবাহের উন্নতি এবং ব্যাংকিং দায়-দেনা পরিশোধ ও নিয়ন্ত্রক পরিপালনের সক্ষমতা বাড়ানো।
নিয়ম মানার প্রতিশ্রুতি
চার মাসের সুবিধা চেয়ে দেওয়া চিঠিতে জিপিএইচ ইস্পাত বলেছে, এর উদ্দেশ্য কোনো নিয়ন্ত্রক প্রয়োজনীয়তা এড়িয়ে যাওয়া বা দুর্বল করা নয়। বরং আর্থিক পুনর্বাসন, ঋণ পুনর্গঠন, তারল্য ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাই এর লক্ষ্য। কোম্পানিটি আরও বলেছে, ব্যাংকিং সম্পর্কের ক্ষেত্রে তারা স্বচ্ছতা বজায় রাখবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রযোজ্য আইন, বিধিবিধান, প্রুডেনশিয়াল প্রয়োজনীয়তা ও নির্দেশনা মেনে চলবে।
৩৪ ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ
ব্যাংক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জিপিএইচ গ্রুপকে দেশের ৩৪টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান মিলে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থায়ন করেছে। এর মধ্যে ইউসিবি ও পূবালী ব্যাংকের অর্থায়ন রয়েছে শীর্ষে।
অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে এবি ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, সিটি ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, মিডল্যান্ড ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, এসবিএসি ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, আইপিডিসি ফাইন্যান্স ও ইউনাইটেড ফাইন্যান্স।
পরিশোধিত মূলধনের সাড়ে ১৪ গুণ ঋণ
জিপিএইচ ইস্পাত কয়েক বছর আগে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন প্রযুক্তির স্টিল মিল স্থাপন করে। কারখানাটি স্থাপন ও পরিচালনার জন্য দেশি-বিদেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে। কোম্পানি সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জিপিএইচ ইস্পাতের ব্যাংকঋণ প্রায় ৭ হাজার ৮ কোটি টাকা। কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ৪৮৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ পরিশোধিত মূলধনের তুলনায় ব্যাংকঋণের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১৪ গুণ।
দুই বছর আগে কোম্পানিটির ব্যাংকঋণ ছিল ৫ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা। সে হিসাবে দুই বছরে ঋণ বেড়েছে ১ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। তবে দুই সময়ের ঋণের হিসাব একই ভিত্তিতে করা হয়েছে কি না, তা কোম্পানির আর্থিক নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে জিপিএইচ ইস্পাতের ফাইন্যান্স ব্যয় হয়েছে ৩৮৭ কোটি টাকা। একই সময়ে কোম্পানিটি ১০ কোটি ৬৪ লাখ টাকা নিট লোকসান করেছে। এই সময়ে দেশের বাজারে বিক্রিও আগের বছরের তুলনায় কমেছে।
উৎপাদন সক্ষমতার ২৫-৩০ শতাংশ
ব্যবসায় লোকসান ও আর্থিক চাপের বিষয়ে জিপিএইচ ইস্পাতের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, করোনার সময় নতুন কারখানায় উৎপাদন শুরু করতে প্রায় দেড় বছর সময় লেগেছিল। এরপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও ব্যাংক খাতে ডলার-সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় ঋণপত্র (এলসি) পাওয়া যায়নি। জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ওই সময় ডলারের বিনিময় হার প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় তাদের প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা লোকসান হয়। এরপর ২০২৪ সালে সরকার পতনের আগে থেকেই সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যক্রম কমে যাওয়া, ব্যাংক খাতের সংকট, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি এবং সর্বশেষ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে ব্যবসায় চাপ তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে তারা মাত্র ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহার করে কারখানা চালাচ্ছেন। এ কারণে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে নীতিগত সহায়তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
জিপিএইচ ইস্পাতের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা মোকতার তালুকদার জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ নিয়ে কোম্পানি আর্থিক চাপে রয়েছে। সময়মতো ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ করতে পারছে না তারা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও বিভিন্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সামনে ডিসেম্বরের ব্যাংক হিসাব সমাপনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ঋণ পুনর্গঠন ও আর্থিক পুনর্বিন্যাসের কাজ শেষ করতে চার মাস সময় চাওয়া হয়েছে। এ সময় পর্যন্ত খেলাপি হিসেবে শ্রেণীকরণ স্থগিত রাখার আবেদন করা হয়েছে।
ঋণ পরিশোধে রাইট শেয়ার
ঋণের চাপ সামলাতে জিপিএইচ ইস্পাত নতুন করে প্রায় ৯৬৮ কোটি টাকা সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ ৯৬৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা সংগ্রহের জন্য রাইট শেয়ার ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাইট শেয়ারের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের বড় অংশ ব্যাংকঋণ পরিশোধে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ঋণের চাপ কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে এ জন্য শেয়ারহোল্ডার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন।
শেয়ারবাজারে জিপিএইচ ইস্পাত
২০১২ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত জিপিএইচ ইস্পাতের অনুমোদিত মূলধন ১ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৪৮৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এ ক্যাটাগরির কোম্পানিটির পুঞ্জীভূত মুনাফা রয়েছে ৪৭৯ কোটি টাকা। মোট শেয়ার ৪৮ কোটি ৩৮ লাখ ৮৩ হাজার ৪৫৬টি। এর মধ্যে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে ৩০ দশমিক ২২ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ১৯ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৫০ দশমিক ৭৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।
ডিএসইতে গতকাল জিপিএইচ ইস্পাতের শেয়ারের সমাপনী দর ছিল ১৫ টাকা ৭০ পয়সা। গত এক বছরে শেয়ারটির দর ১৪ টাকা ৬০ পয়সা থেকে ২০ টাকা ৭০ পয়সার মধ্যে ওঠানামা করেছে। গত অর্থবছরে মাত্র ৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়ায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ‘এ’ ক্যাটাগরিতে থাকা জিপিএইচ ইস্পাত ‘বি’ ক্যাটাগরিতে নেমে যায়।