উত্তরবঙ্গের পর্যটন: সম্ভাবনা ও বাস্তবতা

মো: সাইফুল্লার রাব্বী

মানুষ স্বভাবতই সুন্দর ও সৌখিন জিনিসের প্রতি আকৃষ্ট। সুন্দরের প্রতি ভালোবাসা ও ভালো লাগা যেন মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। কবি জন কিটসের বিখ্যাত সেই উপলব্ধি—‘সুন্দরই সত্য, সত্যই সুন্দর’— অতঃপর যাহা সত্য তাহাই সুন্দর। পৃথিবীর প্রতিটি সুন্দর স্থানের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক অদৃশ্য মোহ। সেই মোহেই মানুষ ছুটে যায় অচেনা গন্তব্যে, ইতিহাসের কাছে, প্রকৃতির কাছে, মানুষের কাছে।

ভ্রমণ তাই কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া নয়; ভ্রমণ মানে ইতিহাসকে জানা, ঐতিহ্যকে ছোঁয়া, প্রকৃতিকে দেখা এবং মানুষের জীবনকে নতুনভাবে আবিষ্কার করা। আর এই দিক থেকে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল যেন এক অনাবিষ্কৃত সম্ভাবনার বিশাল ভাণ্ডার।

সময়ের পরিবর্তনে কোন সভ্যতা বা কোন অঞ্চল একসময় হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক কেন্দ্রস্থল। আবার সময়ের স্রোতে সেই জৌলুশ অনেকটাই হারিয়ে যায় যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে। তেমনি একটি সভ্যতা হচ্ছে বরেন্দ্রভূমি ও উত্তরবঙ্গের আঞ্চলিক মানবসভ্যতা।

মৌর্য ও গুপ্ত আমলে মহাস্থানগড় ছিল গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। উত্তরবঙ্গের প্রাচীন পুন্ড্রনগর ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী। রাজ্যের সেই জৌলুশ আজ নেই। কিন্তু পর্যটকদের আকর্ষণ করার মত দর্শনীয় স্থান, ভিন্নধর্মী খাবার ও আবেদন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এ অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায়। যা পর্যটকদের ভুলিয়ে দিতে পারে ভ্রমণের সব অবসাদ ও ক্লান্তি।

আম, ইতিহাস আর ঐতিহ্যের চাঁপাইনবাবগঞ্জ

চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের খ্যাতি বাংলাদেশব্যাপী। ভ্রমণপিপাসু মানুষ চাইলে আমের মৌসুমে সেখানে আমবাগানে গিয়ে পাকা আমের স্বাদ নিতে পারেন। এ ছাড়া বিলভাতিয়া, বিলচুড়াইল, বিলহোগলা, ছোট সোনা মসজিদ ও দাসবাড়ি মসজিদও যে কারও নজর কাড়বে।

বরেন্দ্রভূমির রাজশাহী

বরেন্দ্রভূমির রাজধানী হিসেবে খ্যাত রাজশাহী বরাবরই ভ্রমণপিপাসুদের আকৃষ্ট করে। বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর, পুঠিয়া রাজবাড়ি, সারদা পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ভদ্রা পার্ক ও পদ্মার চর ভ্রমণপিপাসুদের পছন্দের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।

নাটোরের কাঁচাগোল্লা থেকে রাজবাড়ি

নাটোরের কাঁচাগোল্লার স্বাদ নিতে কার না মন চায়! খাবারের আকর্ষণের সঙ্গে রয়েছে ইতিহাসের টান। দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি, নাটোরের রাজবাড়ি ও চৌগ্রাম জমিদারবাড়ি ভ্রমণকারীদের সামনে তুলে ধরতে পারে এ অঞ্চলের অতীতের গল্প।
 

নওগাঁয় ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া

নওগাঁর মানুষের সরলতা যেমন মুগ্ধ করে, তেমনি জেলার ইতিহাসও সমৃদ্ধ। কুসুম্বা মসজিদ, পাহাড়পুরের বৌদ্ধবিহার, পালরাজাদের স্মৃতিচিহ্ন, বলিহার রাজবাড়ি, জবাই বিল, জগদ্দল বিহার ও পত্নীতলার দিব্যক জয়স্তম্ভ—এসব স্থান কেবল দর্শনীয় নয়; এগুলো উত্তরবঙ্গের দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষী।

সিরাজগঞ্জে তাঁত ও রবীন্দ্রনাথ

যমুনা সেতু সিরাজগঞ্জকে দিয়েছে নতুন অর্থনৈতিক ও যোগাযোগগত মাত্রা। কিন্তু এ জেলার পর্যটন আকর্ষণ শুধু সেতুতে সীমাবদ্ধ নয়। বেলকুচির তাঁতপল্লি ও তাঁতশিল্প, শাহজাদপুরে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি, দরগাহ মসজিদ ও শিবমন্দির ভ্রমণকারীদের ভিন্ন অভিজ্ঞতা দিতে পারে।

জয়পুরহাটে প্রাচীন জনপদের স্মৃতি

জয়পুরহাট বহুদিন গৌড়ের পাল ও সেন রাজাদের রাজ্যভুক্ত ছিল। আছা রাঙ্গাদিঘি, নান্দাইল দিঘি, লাকমা রাজবাড়ি ও পাথরঘাটা দর্শনীয় স্থান হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। এসব স্থানে দিন দিন দর্শনার্থীর সংখ্যাও বাড়ছে।

পাবনার চলনবিলের জলছবি

হাওর-বাঁওড় ও বিল দিয়ে সাজানো পাবনা জেলা। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিল চলনবিলের একটি অংশ এই জেলাকে ঘিরে। বর্ষার সময় ভরা বিলে নৌকা নিয়ে মাছ ধরা এবং টাটকা মাছ দিয়ে খাবার খাওয়া হতে পারে এক নতুন অভিজ্ঞতা। এ ছাড়া পাকশী ও ঈশ্বরদীর চিনিকল দেখার সুযোগও রয়েছে। 

মহাস্থানগড়ের বগুড়া

উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্র নামে পরিচিত বগুড়া। উত্তরবঙ্গের সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেও জেলাটির পরিচিতি রয়েছে। মহাস্থানগড়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল বহু রাজাদের রাজ্য। এখনো সেই রাজাদের রাজ্যের স্মৃতিচিহ্ন চোখে পড়ে। এছাড়া মাজার শরিফ, কাটাবিহীন বড়াইয়ের গাছ, পরশুরামের প্রাসাদ ও প্রাচীর, গোবিন্দভিটা, মহাস্থানগড় জাদুঘর, বেহুলার বাসরঘর, শিলাদেবীর ঘাট, ভাসুবিহার এবং বাংলাদেশের একমাত্র মসলা গবেষণা কেন্দ্র দেখতে অসংখ্য ভ্রমণকারী এখানে আসেন।

গাইবান্ধায় নদী ও চর

কথিত আছে, রাজা গোবিন্দের ষাট হাজার গরুর গোচারণভূমির নাম থেকেই গাইবান্ধা জেলার নামকরণ হয়েছে। এ জেলায় পর্যটকদের মন কাড়ার মতো অনেক স্থান রয়েছে। এর মধ্যে গোবিন্দগঞ্জের কুঠিবাড়ি, পলাশবাড়ী এডুকেশন পার্ক, ড্রিমল্যান্ড পার্ক, মাটির নিচে সবুজ ঘর ফ্রেন্ডশিপ সেন্টার, কষ্টকালী মন্দির, বালাসী ঘাট ও যমুনার চর উল্লেখযোগ্য।

রংপুরে ইতিহাস ও বিনোদন

রংপুর জেলার ভিন্নজগৎ, বেগম রোকেয়ার বাড়ি, নীলদরিয়া বিল, তাজহাট জমিদারবাড়ি, রংপুর চিড়িয়াখানা ও চিকলী বিল বিনোদনের কেন্দ্র হিসেবে বেশ পরিচিতি পাচ্ছে। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রকৃতির সমন্বয়ে এসব স্থান পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে।
দিনাজপুরে লিচু আর মন্দিরের টান
দিনাজপুরের লিচুর স্বাদ এক কথায় অতুলনীয়। বাংলাদেশের লিচুর রাজধানী হিসেবে পরিচিত দিনাজপুরের কান্তজির মন্দির ও রামসাগর দিঘির সৌন্দর্য ভ্রমণপিপাসুদের বিমোহিত করবে।

ঠাকুরগাঁওয়ের গ্রামীণ সৌন্দর্য

ঠাকুরগাঁও জেলার কিছু স্থানও পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়তে শুরু করেছে। এখানকার গ্রামগুলো যেন ছবিতে আঁকা চিত্রের মতো। কুমিল্লা হাড়িপিকনিক কর্নার ও খুনিয়া দিঘিতে লোকসমাগম দিন দিন বাড়ছে।

নীলফামারীর নীলের ইতিহাস

নীলফামারী জেলাকে বলা হয় নীলের দেশ। একসময় ব্রিটিশরা এখানকার চাষিদের নীল চাষে বাধ্য করত। এই জেলার প্রত্যেকটি স্থান যেন একেকটি ইতিহাসের সাক্ষী। ইতিহাস জানার পাশাপাশি ভ্রমণকারীরা দেখতে পারবেন নীলসাগর, ময়নামতি দুর্গ, সিন্ধুরমতি দিঘি ও মীরজুমলার মসজিদ। 

কুড়িগ্রামে ছিটমহলের স্মৃতি

মহারাজা বিশ্বসিংহের কুড়িটি পরিবারের দেশ থেকেই কুড়িগ্রাম জেলার নামকরণ হয়েছে বলে কথিত আছে। বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোই এখনকার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। এ ছাড়া শাহী মসজিদ, বীর প্রতীক তারামন বিবির বাড়ি, নাওডাঙ্গা জমিদারবাড়ি ও চিলমারী বন্দর পর্যটকদের আকৃষ্ট করবে।

লালমনিরহাটে হারানো ভূখণ্ডের গল্প

বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি ছিটমহল ছিল লালমনিরহাট জেলায়, যা এখন বিলুপ্ত। ছিটমহলগুলোর বৈশিষ্ট্য ছিল আলাদা। সেগুলো দেখে মনে হতো বাংলাদেশের মাঝে আরেকটি ছোট্ট বাংলাদেশ। বিলুপ্ত ছিটমহলগুলো ঘুরে পর্যটকেরা নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন।

হিমালয়ের কন্যা পঞ্চগড়

পাঁচটি গড়ের সমন্বয়ে গঠিত পঞ্চগড় জেলা। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এই জেলায় রয়েছে অসাধারণ অতিথিপরায়ণ মানুষ, চা-বাগান ও পাথরসমৃদ্ধ বিস্তীর্ণ এলাকা। হিমালয়ের কন্যা পঞ্চগড় যেন হিমালয়ের কৃপায় পাওয়া এক অনন্য ভূখণ্ড। বাংলাবান্ধা পর্যটকদের কাছে হয়ে উঠেছে অন্য রকম আকর্ষণের স্থান।

প্রচার ও পরিকল্পনাই হতে পারে পরিবর্তনের চাবিকাঠি

উত্তরবঙ্গের পর্যটনের উন্নয়ন ও পরিকল্পনা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। প্রয়োজন শুধু প্রচার-প্রসার ও যথাযথ ব্যবস্থাপনা। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি দেশের গণমাধ্যমগুলো যদি উত্তরবঙ্গের পর্যটন স্থাপনা ও স্থানগুলোর প্রচার-প্রসারে কাজ করে, তাহলে উত্তরবঙ্গের পর্যটনে নতুন একটি দিগন্তের উন্মোচন হতে পারে। এর ফলে বাড়তে পারে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি।

কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটনের মাধ্যমে স্থানীয় বেকারত্বের সমস্যাও কমানো সম্ভব। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের পর্যটনবান্ধব মনোভাব উত্তরবঙ্গের পর্যটন উন্নয়নের দুয়ার খুলে দিতে পারে। প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ, যথাযথ ব্যবস্থাপনা এবং ঐতিহ্য ও প্রকৃতিকে সংরক্ষণ করে পর্যটনকে মানুষের কাছে তুলে ধরা। উত্তরবঙ্গের বিস্তৃত ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রকৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রা মিলিয়ে এ অঞ্চল হয়ে উঠতে পারে দেশের পর্যটনের অন্যতম সম্ভাবনাময় গন্তব্য।

লেখক: এসিস্টেন্ট ম্যানেজার, কাস্টমার সাপোর্ট এন্ড ট্রেনিং ডিপার্টমেন্ট, সেবার বাংলাদেশ।