নৌকা তৈরি করে স্বাবলম্বী তাড়াইলের শতাধিক পরিবার
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

তাড়াইল (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার ধলা ইউনিয়নের সেকান্দরনগর বাজারে নতুন নৌকা তৈরি ও পুরোনো নৌকা মেরামতের কাজ করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন শতাধিক পরিবার। বর্ষা মৌসুমে এ অঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের প্রধান বাহন নৌকা, যা স্থানীয়ভাবে ‘কোষা নৌকা’ নামে পরিচিত। বর্ষাকে সামনে রেখে এ অঞ্চলের কারিগররা এখন ছোট-বড় বিভিন্ন আকারের নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। সারা বছর কাজ না থাকলেও এই বিশেষ মৌসুমটির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন স্থানীয় কারিগরেরা।

সম্প্রতি সরেজমিনে সেকান্দরনগর বাজার ঘুরে দেখা গেছে, উৎসবমুখর পরিবেশে চলছে নৌকা তৈরির কাজ। কেউ কাঠ কাটছেন, কেউ মাপজোখ করছেন, আবার কেউবা হাতুড়ি-তারকাটা নিয়ে ব্যস্ত। স্থানীয় কারিগর শাহরিয়া জানান, বাজারে বড় নৌকার চেয়ে ছোট নৌকার চাহিদা বেশি। শিমুল, কাঁঠাল, চাম্বল, আম, গাব, কদম ও রঙিন কাঠ দিয়ে এসব নৌকা তৈরি করা হয়। কাঠের মানভেদে নৌকার দামের তারতম্য ঘটে। এর মধ্যে রঙিন কাঠের নৌকা সবচেয়ে টেকসই ও জনপ্রিয়। একটি ১৪ হাতের ডিঙ্গি নৌকা তৈরি করতে দুজন মিস্ত্রির ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা সময় লাগে, যা বিক্রি হয় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকায়। অন্যদিকে, রঙিন কাঠের ১১ হাতের একটি কোষা নৌকা ৮ হাজার টাকায় বিক্রি হয়, যা প্রায় ৫ বছর পর্যন্ত অনায়াসে ব্যবহার করা যায়।

বর্ষা মৌসুমে হাওরাঞ্চলের মানুষের কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়ে পড়ায় এসব কোষা নৌকা মাছ শিকার, গো-খাদ্য সংগ্রহ ও যাতায়াতের প্রধান অবলম্বন হয়ে ওঠে। সেকান্দরনগর বাজারের কাঠের ব্যবসায়ী সোহানুর রহমান জানান, বছরের অন্য সময়ে তারা ঘরের আসবাবপত্র তৈরি করলেও বর্ষায় পুরোপুরি নৌকা তৈরিতে মনোনিবেশ করেন। এই বাজারের তৈরি নৌকার সুনাম এতটাই যে, পার্শ্ববর্তী জেলা ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ, নান্দাইল এবং নেত্রকোণার কেন্দুয়া, মদনসহ হাওরের ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও করিমগঞ্জ থেকেও ক্রেতারা এখানে নৌকা কিনতে ছুটে আসেন।

তবে চলতি বছর কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় এবং নদী-নালায় দেরিতে পানি আসায় নৌকা বিক্রিতে কিছুটা মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। কারিগররা জানান, বিগত বছরগুলোতে এই বাজারের ২০টি দোকানে দৈনিক গড়ে প্রায় ২০০টি নৌকা বিক্রি হতো। কিন্তু এবার বিক্রি নেমে এসেছে প্রতিদিন ৫ থেকে ৭টিতে। ফলে অনেক কারিগরকে অলস সময় পার করতে হচ্ছে। একটি নৌকা তৈরি করে তারা ৮০০ টাকা মজুরি পান। ভালো বিক্রি থাকলে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করে দৈনিক ৫ থেকে ৬টি নৌকা তৈরি করা সম্ভব হতো বলে জানান তারা।

উপজেলার কালনা গ্রামের মুজিবুর রহমান জানান, বর্ষায় নিচু এলাকার রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গেলে যাতায়াত, হাট-বাজার এবং ছেলেমেয়েদের স্কুল-কলেজে যাতায়াতের একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে এই কোষা নৌকা। তাই সাময়িক মন্দাভাব থাকলেও জীবনযাত্রার তাগিদে এবং জীবিকার প্রয়োজনে সেকান্দরনগর বাজারের এই ঐতিহ্যবাহী নৌকা শিল্পের কদর এখনো অপরিসীম।

—জা. অর্থনীতি/এলএটি