নেপলসের এক ক্লাবের ছোট্ট বলবয়। কাজ ছিল খুব সাধারণ-খেলোয়াড়দের বল এগিয়ে দেওয়া, মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা, আর খেলা দেখা। কিন্তু সেই ছোট্ট ছেলেটির চোখ আটকে থাকত একজনের দিকে-ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনা। মাঠে তার বল নিয়ে জাদু, তার নেতৃত্ব, তার উচ্ছ্বাস— সবকিছুই যেন এক স্বপ্ন তৈরি করেছিল সেই শিশুমনে!
সেই বলবয় যখন ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে ইতালির জার্সিতে ম্যারাডোনাকে ফাইনাল খেলতে দেখলেন, তখনই বদলে গেল তার জীবন। ম্যারাডোনার কান্না তাকে কাঁদিয়েছিল, আর সেই কান্নার ভেতরেই জন্ম নিয়েছিল এক প্রতিজ্ঞা-ম্যারাডোনা হতে হবে, নেপোলির হয়ে খেলতে হবে, আর একদিন বিশ্বকাপ জিততে হবে। সেই ছেলেটির নাম ফ্যাবিও ক্যানাভারো!
ক্যানাভারো পরে সত্যিই নেপোলির হয়ে খেলেন। শুরুটা হয় সেখান থেকেই, তারপর ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে এক দীর্ঘ ইউরোপীয় ক্যারিয়ার। তার বড় সময় কাটে পারমায়-১৯৯৫ থেকে ২০০২ পর্যন্ত। সেখানে তিনি জেতেন দুটি কোপা ইতালিয়া, একটি সুপারকোপা ইতালিয়া এবং একটি উয়েফা কাপ। এরপর ২০০২ সালে তিনি যোগ দেন ইন্টার মিলানে, তারপর জুভেন্টাসে দুই মৌসুম খেলেন। ২০০৬ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত তিনি ছিলেন রিয়াল মাদ্রিদের তারকাখচিত দলের অংশ, যেখানে তিনি দুটি লা লিগা শিরোপা এবং একটি স্প্যানিশ সুপার কাপ জেতেন। রিয়ালে তাকে দেওয়া হয়েছিল জিনেদিন জিদানের বিখ্যাত ৫ নম্বর জার্সি, যদিও সেই অধ্যায় শেষ হয় খুব মসৃণভাবে নয়। ২০০৯ সালে আবার জুভেন্টাসে ফিরে এক মৌসুম কাটিয়ে তিনি শেষ করেন ক্যারিয়ার আল আহলি ক্লাবে!
জাতীয় দলের জার্সিতে ক্যানাভারোর পথচলা শুরু ১৯৯৭ সালে। এরপর দীর্ঘ ১৩৬ ম্যাচ খেলে তিনি হয়ে ওঠেন ইতালির হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ফুটবলার-পাওলো মালদিনিকেও ছাড়িয়ে যান তিনি। কিন্তু তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অধ্যায় লেখা হয় ২০০৬ সালে!
২০০৬ বিশ্বকাপে ক্যানাভারো ছিলেন ইতালির অধিনায়ক। তার নেতৃত্বে দলটি ধীর কিন্তু স্থির পারফরম্যান্সে পৌঁছে যায় ফাইনালে। প্রতিপক্ষ ছিল জিনেদিন জিদানের ফ্রান্স। সেই ফাইনাল ছিল নাটকীয়তার এক অনন্য অধ্যায়-মার্কো মাতেরাজ্জির সঙ্গে জিদানের বিতর্কিত ঘটনা, জিদানের লাল কার্ড, তারপর নির্ধারিত সময়ে ড্র ম্যাচ এবং শেষে পেনাল্টি শুটআউট। শেষ পর্যন্ত পেনাল্টিতে জিতে যায় ইতালি, আর ট্রফি হাতে আকাশে উঠে যান ক্যানাভারো। সেই মুহূর্ত বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রতীক হয়ে যায়-কনফেত্তির ঝড়ের মধ্যে অধিনায়কের উচ্ছ্বাস।
সেই বছর ক্যানাভারোর জন্য ছিল স্বর্ণযুগ। তিনি জেতেন ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড় এবং ব্যালন ডি’অরসহ অসংখ্য ব্যক্তিগত পুরস্কার। কারণ ছিল স্পষ্ট-রক্ষণভাগে তার প্রাচীরের মতো উপস্থিতি, নেতৃত্ব এবং ধারাবাহিকতা। তিনি ছিলেন সেই বিশ্বকাপজয়ী ইতালির প্রতিরক্ষা স্তম্ভ!
কিন্তু ফুটবলের গল্প সবসময় সুখের হয় না। ২০০৬ বিশ্বকাপের পর থেকেই শুরু হয় ক্যানাভারোর পতনের সময়। তার পারফরম্যান্স ধীরে ধীরে কমতে থাকে। রিয়াল মাদ্রিদে তিনি হিমশিম খেতে থাকেন লিওনেল মেসি বা ফার্নান্দো তোরেসদের সামলাতে এবং দলও ভোগে একের পর এক গোল হজমে। একসময়ের অবিচল ডিফেন্ডার যেন নিজেকেই খুঁজে পান না মাঠে।
শেষে ২০০৯ সালে আবার তাকে ফিরে যেতে হয় জুভেন্টাসে। তখন বোঝা যাচ্ছিল, তার সেরা সময় পেছনে রয়ে গেছে। এরপর ২০১০ বিশ্বকাপে ইতালি আবারও একই প্রজন্মের খেলোয়াড়দের নিয়ে মাঠে নামে, কিন্তু দলটি প্রথম পর্বেই বিদায় নেয়-তিন ম্যাচে মাত্র দুই পয়েন্ট নিয়ে। শেষ ম্যাচে হারের পর ক্যানাভারোর চোখের জল মুছতে মুছতে মাঠ ছাড়ার দৃশ্য ফুটবলপ্রেমীদের মনে স্থায়ী হয়ে যায়!
এভাবেই শেষ হয় এক বলবয়ের স্বপ্নযাত্রা। যিনি ম্যারাডোনাকে দেখে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তিনিই একদিন বিশ্বকাপ ট্রফি মাথার ওপর তুলেছিলেন, আবার সেই স্বপ্ন ভেঙে বিদায় নিয়েছিলেন কান্নার ভেতর দিয়ে। তার গল্প তাই শুধু জয়ের নয়, পতনেরও-যেখানে গৌরব আর বেদনা পাশাপাশি হাঁটে!
ফ্যাবিও ক্যানাভারো শেষ পর্যন্ত রয়ে যান সেই ফুটবলার হিসেবে, যিনি প্রমাণ করেছিলেন-ডিফেন্ডার হয়েও বিশ্বসেরা হওয়া যায়, আর এক বলবয়ের স্বপ্নও একদিন বিশ্বকাপের আকাশ ছুঁতে পারে!
এক নজরে
পুরো নাম: ফ্যাবিও ক্যানাভারো
জন্ম : ১৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৩
জন্মস্থান : নেপলস দেশ: ইতালি
উচ্চতা : ৫ ফুট ৯.৫ ইঞ্চি
পজিশন : সেন্টার ব্যাক
ক্লাব: নেপোলি, পারমা, ইন্টার মিলান, জুভেন্টাস, রিয়াল মাদ্রিদ, আল আহলি
বিশ্বকাপ জয় : ২০০৬
ফিফা বিশ্বসেরা খেলোয়াড় : ২০০৬