ফুটবল ইতিহাসে কিছু নাম সময়ের সীমানা পেরিয়ে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়। দিনো জফ তেমনই এক নাম। গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে তিনি শুধু বল ঠেকাননি, তৈরি করেছেন এক অনন্য উত্তরাধিকার। ইতালির ফুটবল ইতিহাসে যেমন তার অবস্থান আকাশছোঁয়া, তেমনি বিশ্ব ফুটবলেও তিনি সর্বকালের অন্যতম সেরা গোলকিপার হিসেবে স্বীকৃত।
সবচেয়ে বেশি বয়সে বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড আজও যার হাতে, তিনি এই ইতালিয়ান গোলরক্ষক। ১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপে ইতালিকে শিরোপা এনে দেন ৪০ বছর ৪ মাস ১৩ দিন বয়সে। একজন অধিনায়ক ও গোলকিপার হিসেবে বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি ফুটবল ইতিহাসে খুব কম মানুষের ভাগ্যে জুটেছে। ১৯৩৪ সালে ইতালির জিয়ান পিয়েরো কোম্বির পর দ্বিতীয় গোলকিপার-অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপ জেতেন দিনো জফ। পরে ২০১০ সালে সেই তালিকায় যোগ দেন স্পেনের ইকার ক্যাসিয়াস।
তবে শুধু বিশ্বকাপ জয়ই নয়, টুর্নামেন্টের সেরা গোলকিপারের স্বীকৃতিও পেয়েছিলেন জফ। গোলপোস্টের নিচে তার অসাধারণ দক্ষতা তাকে নিয়ে যায় কিংবদন্তিদের কাতারে।
ফুটবল ইতিহাস ও পরিসংখ্যানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইএফএফএইচএস বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় সেরা গোলকিপার হিসেবে নির্বাচন করেছিল দিনো জফকে। তার ওপরে ছিলেন কেবল লেভ ইয়াসিন ও গর্ডন ব্যাংকস। ২০০৩ সালের নভেম্বরে তিনি পান ‘গোল্ডেন প্লেয়ার’ খেতাব এবং গত ৫০ বছরের ইতালির সেরা ফুটবলার হিসেবে নির্বাচিত হন।
গোলকিপার হিসেবে তার সবচেয়ে বিস্ময়কর অর্জনগুলোর একটি ছিল দীর্ঘ সময় গোল না খাওয়ার রেকর্ড। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ফুটবলে টানা ১১৪২ মিনিট তার জালে বল পাঠাতে পারেননি কোনো প্রতিপক্ষ ফুটবলার। অবশেষে ১৯৭৪ বিশ্বকাপে হাইতির মানো স্যানোন এক দৃষ্টিনন্দন গোল করে সেই রেকর্ডের অবসান ঘটান।
জাতীয় দলের জার্সিতে ১১২ ম্যাচ খেলেছেন জফ। ইতালির হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার তালিকায় তার ওপরে আছেন শুধু ফ্যাবিও ক্যানাভারো ও পাওলো মালদিনি। ২০০৪ সালের মার্চে পেলের তৈরি ১২৫ জন জীবিত সেরা ফুটবলারের তালিকাতেও জায়গা পেয়েছিলেন তিনি।
১৯৪২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইতালির মারিয়ানো দেল ফ্রিলিতে জন্ম দিনো জফের। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি ছিল গভীর ভালোবাসা। মাত্র ১৪ বছর বয়সে পেশাদার ক্লাব ফুটবলে খেলার স্বপ্ন নিয়ে হাজির হয়েছিলেন ইন্টার মিলান ও জুভেন্টাসের ট্রায়ালে। কিন্তু উচ্চতা কম হওয়ায় দুই ক্লাবই তাকে ফিরিয়ে দেয়।
তবে ভাগ্য তার জন্য অন্য গল্প লিখে রেখেছিল। পাঁচ বছর পর উচ্চতা বাড়লে ১৯৬১ সালে উদিনেসের হয়ে সিরি আ’তে অভিষেক ঘটে তার। উদিনেসের হয়ে ৩৮ ম্যাচ খেলার পর ১৯৬৩ সালে যোগ দেন ম্যানটোভায়। এর পর ১৯৬৮ সালে পাড়ি জমান ন্যাপোলিতে। একই বছর বুলগেরিয়ার বিপক্ষে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের কোয়ার্টার ফাইনালে জাতীয় দলে অভিষেক হয় তার। সেই আসরেই নিজেদের মাটিতে ইউরো শিরোপা জেতে ইতালি।
তবে সব সময় পথ মসৃণ ছিল না। ১৯৭০ বিশ্বকাপে পারফরম্যান্স ভালো না হওয়ায় ইতালির সেরা একাদশে জায়গা হয়নি তার। কিন্তু ১৯৭২ সালে জুভেন্টাসে যোগ দেওয়ার পর শুরু হয় নতুন অধ্যায়।
জুভেন্টাসের হয়ে টানা ১১ বছরের ক্যারিয়ারে ছয়টি সিরি আ শিরোপা জেতেন তিনি। পাশাপাশি দুটি কোপা ইতালিয়া ও একটি উয়েফা কাপও জিতেছিলেন। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সিরি আ’তে সবচেয়ে বেশি বয়সি ফুটবলার এবং সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ডও ছিল তার দখলে। ৫৭০ ম্যাচ খেলে গড়া সেই রেকর্ড দুই দশকের বেশি সময় অক্ষত ছিল। পরে যথাক্রমে ল্যাতসিওর গোলকিপার মার্কো বালোত্তা এবং এসি মিলানের ডিফেন্ডার পাওলো মালদিনি সেই রেকর্ড ভাঙেন।
১৯৬১ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত ক্লাব ফুটবলে মোট ৬৪২ ম্যাচ খেলেছেন দিনো জফ। একই সময়ে ১৯৬৮ থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন ১১২ ম্যাচ। তার উচ্চতা ছিল ১.৮৩ মিটার। পজিশন—গোলকিপার।
খেলোয়াড়ি জীবন শেষে কোচ হিসেবেও নতুন অধ্যায় শুরু করেন তিনি। প্রথমে জুভেন্টাসের টেকনিক্যাল স্টাফে যোগ দেন। এর পর ১৯৮৮ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ছিলেন ক্লাবটির প্রধান কোচ। তার অধীনে ১৯৮৯-৯০ মৌসুমে উয়েফা কাপ ও কোপা ইতালিয়া জিতেছিল জুভেন্টাস। তবু ১৯৯০ সালে তাকে বরখাস্ত করে ক্লাব কর্তৃপক্ষ।
এর পর যোগ দেন ল্যাতসিওতে। ১৯৯৪ সালে ক্লাবটির প্রেসিডেন্টের দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৯৮ সালে ইতালি জাতীয় দলের কোচ হন তিনি। তার কোচিংয়ে ইউরো ২০০০-এর ফাইনালে পৌঁছে যায় ইতালি।
ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে ৯০ মিনিট পর্যন্ত ১-০ গোলে এগিয়ে ছিল ইতালি। শিরোপা তখন প্রায় হাতের মুঠোয়। কিন্তু ম্যাচ শেষ হতে যখন ৬০ সেকেন্ডেরও কম সময় বাকি, তখন সমতা ফেরায় ফ্রান্স। খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে, আর সেখানেই শিরোপা হারায় জফের ইতালি।
এর কিছুদিন পর এসি মিলানের প্রেসিডেন্ট ও ইতালির রাজনীতিবিদ সিলভিও বার্লুসকোনির কঠোর সমালোচনার মুখে জাতীয় দলের কোচের পদ থেকে পদত্যাগ করেন দিনো জফ। পরে আবারও ফিরে যান ল্যাতসিওতে। ২০০১-০২ মৌসুমে দলের বাজে শুরুর পর সেখান থেকেও সরে দাঁড়ান।
২০০৫ সালে ফিওরেন্টিনার কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি। মৌসুমের শেষ দিনে দলকে অবনমন থেকে বাঁচালেও এর পর কোচিং ক্যারিয়ারের ইতি টানেন।
দিনো জফ শুধু একজন বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক নন, তিনি গোলকিপিং শিল্পের এক অনন্য প্রতীক। তার ক্যারিয়ার প্রমাণ করে, প্রত্যাখ্যান কখনও শেষ নয়। ইন্টার মিলান ও জুভেন্টাসের ট্রায়াল থেকে বাদ পড়া সেই কিশোর একদিন হয়ে উঠেছিলেন ইতালির ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র।
একনজরে
নাম: দিনো জফ
জন্ম: ২৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪২
বয়স: ৬৯
উচ্চতা: ১.৮৩ মিটার
পজিশন: গোলকিপার কোচিং: ফিওরেন্টিনা (অবসর)
জন্মস্থান: মারিয়ানো দেল ফ্রিলি, ইতালি
ক্লাব ফুটবলে ম্যাচ: ৬৪২ (১৯৬১-১৯৮৩)
জাতীয় দলে ম্যাচ: ১১২ (১৯৬৮-১৯৮৩)
চ্যাম্পিয়ন: বিশ্বকাপ ১৯৮২, রানার্সআপ ইউরো ২০০০
পদক: গোল্ডেন প্লেয়ার