রহমান নিশাত: প্রতি চার বছর পরপর পৃথিবী যেন এক অদ্ভুত জাদুর ভেতর ঢুকে যায়। শহরের ব্যস্ত রাস্তা, গ্রামের চায়ের দোকান, ক্যাফের বড় পর্দা কিংবা ঘরের ছোট্ট টেলিভিশন; সব জায়গায় তখন একটাই ভাষা, একটাই উন্মাদনা— ফুটবল। এক মাসজুড়ে চলে আবেগ, উন্মাদনা আর আনন্দাশ্রুর এক বিশ্বমঞ্চ। কোটি কোটি মানুষ নিজেদের ভিন্নতা ভুলে এক হয়ে যায় একটি বলের পেছনে। আর সেই মহাযজ্ঞের সবচেয়ে মহিমান্বিত অধ্যায় বিশ্বকাপ ফাইনাল— যেখানে জন্ম নেয় কিংবদন্তি, ভেঙে যায় হৃদয় আবার কোনো জাতি নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখে। কখনও সেখানে থাকে ম্যারাডোনার জাদু, কখনও পেলের হাসি, কখনও জিদানের হেডবাট, কখনও মেসির অশ্রুভেজা ট্রফি উঁচিয়ে ধরা মুহূর্ত। বিশ্বকাপের ১০টি অবিস্মরণীয় ফাইনালে চোখ রাখা যাক, যেগুলো আজও ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে অমরত্বের স্থান দখল করে আছে।
উরুগুয়ে বনাম আর্জেন্টিনা (১৯৩০)
বিশ্বকাপের প্রথম সূর্যোদয় হয়েছিল মন্টেভিডিওতে। ১৯৩০ সালের সেই ফাইনালে স্বাগতিক উরুগুয়ে পিছিয়ে পড়েও আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলে হারিয়ে ইতিহাসের প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। সেদিন শুধু একটি ট্রফি জেতেনি উরুগুয়ে, জন্ম হয়েছিল বিশ্বকাপ নামের এক অমর প্রেমের। গ্যালারির গর্জন আর পতাকার ঢেউয়ে ফুটবল যেন প্রথমবার বুঝেছিল— এ খেলার আবেগ সীমান্ত মানে না।
ব্রাজিল বনাম সুইডেন (১৯৫৮)
১৯৫৮ সালের ফাইনাল ছিল এক নতুন যুগের সূচনা—যেখানে ফুটবলের আকাশে জন্ম নেয় এক উজ্জ্বল সূর্য: পেলে। মাত্র ১৭ বছর বয়সি এই কিশোর, স্বপ্নের মতো খেলায় ভরিয়ে দেন গোটা বিশ্বকে। সুইডেনকে ৫-২ ব্যবধানে হারিয়ে ব্রাজিল শুধু শিরোপাই জেতে না— জন্ম দেয় এক নতুন ফুটবল দর্শনের, যেখানে সৌন্দর্য আর সৃজনশীলতা হয়ে ওঠে অস্ত্র।
ব্রাজিল বনাম চেকোস্লোভাকিয়া (১৯৬২)
ব্রাজিল ফুটবলের বরপুত্র পেলে ছিলেন না। ইনজুরিতে ছিটকে গিয়েছিলেন টুর্নামেন্টের মাঝপথেই। তবু ব্রাজিল থামেনি। কারণ গ্যারিঞ্চা নামের একজন ছিলেন, যিনি দুই পায়ে জাদু নিয়েই খেলছিলেন। গ্যারিঞ্চার জাদুতে চেকোস্লোভাকিয়াকে ৩-১ গোলে হারিয়ে ব্রাজিল টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জেতে। সেই জয় প্রমাণ করেছিল— ব্রাজিল শুধু লাতিন আমেরিকার একটি দল নয়, তারা ছিল এক ফুটবল সাম্রাজ্য।
ফ্রান্স বনাম ব্রাজিল (১৯৯৮)
প্যারিসের সেই রাত আজও রহস্য আর বিস্ময়েঘেরা। ফাইনালের আগে রোনালদো নাজারিওকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল অদ্ভুত অনিশ্চয়তা। আর ঠিক সেই মঞ্চেই আলো কেড়ে নেন জিনেদিন জিদান। হেডের জন্য বিখ্যাত জিদান দুটি দুর্দান্ত হেডেই ভেঙে দেন ব্রাজিলের স্বপ্ন ভেঙে। ফ্রান্সকে এনে দেন প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা। এই বিশ্বকাপ জিদানকে এনে দিয়েছিল কিংবদন্তির খেতাব। স্ট্যাড দ্য ফ্রান্সের আকাশে তখন শুধু একটাই নাম—জিদান।
জার্মানি বনাম আর্জেন্টিনা (২০১৪)
মারাকানার আলোয় সবাই অপেক্ষা করছিল মেসির জন্য। কিন্তু ইতিহাস লিখেছিলেন মারিও গ্যোটজে। অতিরিক্ত সময়ে বদলি হিসেবে নেমে বুক দিয়ে বল নামিয়ে অসাধারণ ভলিতে গোল করে জার্মানিকে বিশ্বকাপ এনে দেন তিনি আর মেসির স্বপ্ন সেদিন থেমে গিয়েছিল কিছুটা দূরে, কিছুটা নিঃশব্দে। বিশ্বকাপ ট্রফির সামনে মেসির অবাক হয়ে মন বিষাদপূর্ণের ছবি চিরকালীন দুঃখের প্রতীক হয়ে আছে। যদিও পরে শিরোপায় আক্ষেপ পূর্ণতা দিয়েছেন আর্জেন্টাইন জাদুকর।
ইতালি বনাম ফ্রান্স (২০০৬)
ফুটবল কখনও কখনও নাটকের চেয়েও নাটকীয়। বার্লিনের সেই ফাইনাল ছিল তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। জিদানের প্যানেঙ্কা পেনাল্টি, তারপর মাতেরাজ্জিকে হেডবাট, লাল কার্ড— সব মিলিয়ে ফুটবলের ইতিহাসে এক সিনেমাটিক রাত। টাইব্রেকারে ইতালি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলেও ফুটবল বিশ্ব সবচেয়ে বেশি মনে রেখেছে জিদানের বিদায়কে। এই বিশ্বকাপই জিদানের ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ।
আর্জেন্টিনা বনাম নেদারল্যান্ডস (১৯৭৮)
স্বাগতিক আর্জেন্টিনা তখন স্বপ্নে ভাসছে। আর সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেন মারিও কেম্পেস। অতিরিক্ত সময়ে নেদারল্যান্ডসকে ৩-১ গোলে হারিয়ে প্রথম বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা। প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের সেই আনন্দ ছড়িয়ে গিয়েছিল লাতিন আমেরিকার দেশটির প্রতিটি প্রান্তে। বুয়েনস এইরেসের রাত তখন ছিল আনন্দ, অশ্রু আর উন্মাদনায় ভরা।
ইংল্যান্ড বনাম জার্মানি (১৯৬৬)
‘ফুটবল ইজ কামিং হোম’— এই বিশ্বাসের জন্ম সেদিনই। ওয়েম্বলিতে জিওফ হার্স্টের ঐতিহাসিক হ্যাটট্রিকে জার্মানিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে প্রথম ও একমাত্র বিশ্বকাপ জেতে ইংল্যান্ড। এই এক হ্যাটট্রিক ফুটবল ইতিহাসে অমর হয়ে আছে আজ অবধি। আর হার্স্ট? তিনি আজও ইংল্যান্ডের প্রতিটি ঘরে ঘরে কীর্তিমানের মতো অমর হয়ে আছেন। সেই হ্যাটট্রিক বহু বছর ধরেই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে ফুটবলের ক্যানভাসে।
ব্রাজিল বনাম ইতালি (১৯৭০)
অনেকের চোখে এটি ব্রাজিলের সর্বকালের সেরা দল। পেলে, জাইরজিনহো, তোস্তাও, কার্লোস আলবার্তো—একেকজন যেন মাঠের নিপুণ শিল্পী। তারা কায়দা করে সবুজ গালিচায় ছবি আঁকেন। সেই ছবিতে উন্মাতাল হয়ে ওঠে গোটা ব্রাজিল। সাম্বার ছন্দে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে পুরো বিশ্ব। ওই আসরে ইতালিকে ৪-১ গোলে হারানো সেই ফাইনাল ছিল সাম্বা ফুটবলের শ্রেষ্ঠ প্রদর্শনী। কার্লোস আলবার্তোর গোলটি আজও ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর দলীয় গোলগুলোর একটি।
আর্জেন্টিনা বনাম ফ্রান্স (২০২২)
লিওনেল মেসির জীবনে সবচেয়ে বড় অর্জন কি? এই এক প্রশ্ন জাগিয়ে দিয়েছিল কাতার। সেই কাতারের বুকেই জীবনের সব অর্জনের পূর্ণতা দিয়ে প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন মেসি। জিতেছিলেন বিশ্বকাপ। লুসাইল স্টেডিয়ামে যা হয়েছিল তা ফুটবল নয়— ছিল আবেগের বিস্ফোরণ। মেসি বনাম এমবাপ্পে। অভিজ্ঞতার বিপরীতে তরুণ বিস্ময়। স্বপ্ন বনাম ভবিষ্যৎ। ১২০ মিনিটজুড়ে চলা ৩-৩ গোলের সেই মহাকাব্যিক লড়াই টাইব্রেকারে জিতে বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা। আর তাতেই মেসি ছুঁয়ে ফেলেন নিজের কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন। অন্যদিকে হেরে গিয়েও এমবাপ্পের হ্যাটট্রিক অমর হয়ে থাকে ইতিহাসের পাতায়। সেদিন ফুটবল বিশ্ব জেনেছিল— কিছু ম্যাচ শুধু খেলা নয়, চিরন্তন এক মহাকাব্য।