রফিকুল ইসলাম: আর্জেন্টিনার ফুটবল মানেই আবেগ, নাটক, জাদু আর অনন্ত ভালোবাসা। এই দেশের ফুটবলাররা শুধু ট্রফি জেতেননি, ফুটবলকে দিয়েছেন নতুন ভাষা। কখনও নিখুঁত গোল, কখনও অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং, কখনও নেতৃত্ব কিংবা অসম্ভবকে সম্ভব করার ক্ষমতায় তারা হয়ে উঠেছেন কোটি মানুষের নায়ক। আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে অসংখ্য কিংবদন্তির জন্ম হয়েছে। তবে কিছু নাম সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে আজও আলো ছড়ায় সমান উজ্জ্বলতায়।
হারনান ক্রেসপো: গোলের চেয়েও বড় এক স্ট্রাইকার
হারনান ক্রেসপোকে শুধু গোলসংখ্যা দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। কারণ আর্জেন্টিনার হয়ে তিনি অনেক ম্যাচেই নেমেছেন বদলি হিসেবে। আবার যেসব ম্যাচে শুরুর একাদশে ছিলেন সেগুলোরও অনেকটিতে পুরো সময় খেলতে পারেননি। তবুও আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া তার অসাধারণ সামর্থ্যেরই প্রমাণ।
ক্রেসপো ছিলেন নিখুঁত ফিনিশার। বলের গতি, অবস্থান আর মুহূর্ত বোঝার ক্ষমতা তাকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। তিনটি বিশ্বকাপ খেলেও ট্রফি জেতা হয়নি তার। কিন্তু গোল করার সহজাত ক্ষমতার কারণে আর্জেন্টাইন ফুটবলে তিনি আজও বিশেষ এক নাম।
লিওনেল মেসি: ফুটবল যার পায়ে কবিতা হয়ে ওঠে
মেসিকে শুধু ফুটবলার বললে ভুল হবে। তিনি যেন বল পায়ে একজন শিল্পী। মাঠে তার ড্রিবলিং কখনও মনে হয় আঁকা ছবি, কখনও অসম্ভবকে সম্ভব করার জাদু। প্রতিপক্ষ যত বড় ফাঁদই তৈরি করুক, মেসি যেন অবলীলায় সেটি ভেঙে বেরিয়ে আসেন।
অনেক বছর তাকে শুনতে হয়েছে, ক্লাবের মতো জাতীয় দলের জার্সিতে উজ্জ্বল হতে পারেন না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সমালোচনার জবাব দিয়েছেন তিনি। ২০০৮ অলিম্পিকে সোনা, কোপা আমেরিকায় দুর্দান্ত পারফরম্যান্স এবং সবশেষে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ জয় তাকে নিয়ে গেছে অন্য এক উচ্চতায়। এখন অনেকের কাছেই তিনি শুধু আর্জেন্টিনার নন, ফুটবল ইতিহাসেরও সেরা নাম।
রিকার্ডো বোচিনি: ম্যারাডোনার ছায়ায় হারিয়ে যাওয়া প্রতিভা
বর্তমান ফুটবলে এক ক্লাবের প্রতি এতটা আনুগত্য খুব কমই দেখা যায়। রিকার্ডো বোচিনি পুরো ক্যারিয়ার কাটিয়েছেন ইন্ডিপেন্ডিয়েন্টেতে। ইউরোপে না খেলেও তাকে ধরা হয় ইতিহাসের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার হিসেবে।
তার দুর্ভাগ্য ছিল, জন্মেছিলেন ম্যারাডোনার সময়ে। একই পজিশনে ম্যারাডোনার উপস্থিতির কারণে জাতীয় দলে খুব বেশি সুযোগ পাননি। তবুও ১৯৮৬ বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য ছিলেন তিনি। ফুটবল বোদ্ধারা এখনও মনে করেন, বিশ্বজুড়ে যথাযথ স্বীকৃতি না পেলেও বোচিনি ছিলেন অনন্য প্রতিভা।
আমাদেও ক্যারিজো: গোলপোস্টের সামনে ‘টারজান’
আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে গোলরক্ষকদের মধ্যে সবচেয়ে সৃজনশীল নামগুলোর একটি আমাদেও ক্যারিজো। ডাকনাম ছিল ‘টারজান’। অনেকের মতে, তিনিই ছিলেন ‘গোলকিপার অব দ্য সেঞ্চুরি’।
টানা ৭৬৯ মিনিট গোল না খাওয়ার রেকর্ড তার অসাধারণ দক্ষতার প্রমাণ। গ্লাভস ব্যবহার জনপ্রিয় করার পেছনেও তার অবদান ছিল। রিভার প্লেটের হয়ে দীর্ঘ সময় আধিপত্য বিস্তার করেছেন তিনি। দুর্ভাগ্য, রাজনৈতিক কারণে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ থেকে দূরে থাকায় তার সেরা সময় বিশ্বমঞ্চে দেখা যায়নি।
অ্যাঞ্জেল লাবরুনা: বিশ্বযুদ্ধের কাছে হার মানা এক কিংবদন্তি
অ্যাঞ্জেল লাবরুনার ক্যারিয়ার যেন সময়ের নিষ্ঠুরতার শিকার। যখন তিনি ক্যারিয়ারের সেরা সময় পার করছিলেন তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে বিশ্বকাপই অনুষ্ঠিত হয়নি। পরে আর্জেন্টিনা রাজনৈতিক কারণে বিশ্বকাপ বর্জন করায় আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার প্রতিভা পুরোপুরি দেখা যায়নি। তবুও ক্লাব ফুটবলে তিনি ছিলেন এক কিংবদন্তি নাম। রিভার প্লেটের হয়ে তার গোল আর নেতৃত্ব তাকে আর্জেন্টাইন ফুটবলের ইতিহাসে স্থায়ী আসন এনে দিয়েছে।
গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা: ‘বাতিগোল’-এর অগ্নিগর্ভ শট
গোলের সামনে বাতিস্তুতা ছিলেন নির্মম। সুযোগ পেলেই প্রতিপক্ষের জালে বল জড়াতেন। এ কারণেই তার নাম হয়ে যায় ‘বাতিগোল’। আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ড হিসেবে ধরা হয় তাকে।
১৯৯১ ও ১৯৯৩ কোপা আমেরিকা জয়ে তিনি ছিলেন মূল নায়ক। বিশ্বকাপেও করেছেন ১০ গোল। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে গ্রিসের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক দিয়ে শুরু করেছিলেন। আবার ১৯৯৮ বিশ্বকাপেও করেছিলেন হ্যাটট্রিক। দুই বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করা প্রথম ফুটবলার হিসেবে ইতিহাস গড়েন তিনি।
উবালদো ফিল্লোল: বিশ্বকাপজয়ী দেয়াল
ডিয়েগো ম্যারাডোনা একবার বলেছিলেন, ‘আমার ক্যারিয়ারে দেখা সেরা গোলরক্ষক উবালদো।’এই একটি বাক্যই তার শ্রেষ্ঠত্ব বোঝানোর জন্য যথেষ্ট। ১৯৭৮ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম শিরোপা জয়ে ফিল্লোল ছিলেন অন্যতম বড় নায়ক। গ্রুপ পর্বে দুর্দান্ত গোলকিপিংয়ের পর ফাইনালেও নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে অসাধারণ কিছু সেভ করেন তিনি। অনেকের মতে, আর্জেন্টিনার ইতিহাসে তিনিই সেরা গোলরক্ষক।
মারিও কেম্পেস: যে মানুষটি আর্জেন্টিনাকে প্রথম বিশ্বকাপ এনে দেন
মারিও কেম্পেসের নাম উচ্চারিত হলেই মনে পড়ে ১৯৭৮ বিশ্বকাপ। টুর্নামেন্টের শুরুটা ভালো না হলেও কোচ মেনোত্তির কৌশল বদলে দেয় সবকিছু। একটু নিচে নেমে খেলতেই ভয়ংকর হয়ে ওঠেন কেম্পেস। পোল্যান্ড ও পেরুর বিপক্ষে জোড়া গোল করার পর ফাইনালেও করেন দুই গোল। তার নৈপুণ্যেই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা। সেই আসরে গোল্ডেন বুট ও গোল্ডেন বল দুটিই জেতেন তিনি।
ড্যানিয়েল প্যাসারেলা: রক্ষণভাগের সম্রাট
ডিফেন্ডার হয়েও প্রচুর গোল করেছেন ড্যানিয়েল প্যাসারেলা। আর্জেন্টিনার ইতিহাসে অন্যতম সেরা নেতা হিসেবেও ধরা হয় তাকে। ‘এল কায়জার’ নামে পরিচিত এই ফুটবলার ছিলেন কঠিন, ঠান্ডা মাথার এবং নির্ভরযোগ্য।
১৯৭৮ বিশ্বকাপে অধিনায়ক হিসেবে আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জেতান। তিনি আর্জেন্টিনার একমাত্র ফুটবলার, যিনি দুটি বিশ্বকাপজয়ী দলের অংশ ছিলেন। রক্ষণে যেমন দুর্ভেদ্য ছিলেন তেমনি প্রতিপক্ষের গোলপোস্টেও হুমকি হয়ে উঠতেন নিয়মিত।
ডিয়েগো ম্যারাডোনা: ফুটবল ইতিহাসের চিরন্তন বিদ্রোহী
ফুটবল মানেই যদি আবেগ হয়, তবে সেই আবেগের সবচেয়ে বড় নাম ডিয়েগো ম্যারাডোনা। তিনি ছিলেন একাধারে জাদুকর, নেতা, বিদ্রোহী এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার কারিগর।
১৯৮৬ বিশ্বকাপে প্রায় একাই আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতান তিনি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার দুটি গোল ফুটবল ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। একটি ‘হ্যান্ড অব গড’, অন্যটি ‘শতাব্দীর সেরা গোল’। নিজের অর্ধ থেকে বল নিয়ে একের পর এক ডিফেন্ডার কাটিয়ে গোল করার সেই দৃশ্য আজও ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্তগুলোর একটি।
ম্যারাডোনার জীবন ছিল আলো আর অন্ধকারের মিশেল। মাঠে তিনি ছিলেন জিনিয়াস, মাঠের বাইরে বিতর্কিত। ডোপ টেস্টে ব্যর্থতা, নিষেধাজ্ঞা কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের নানা ঝড় তাকে ঘিরে ছিল সবসময়। তবুও ফুটবল ইতিহাসে তার স্থান অমর। কারণ ম্যারাডোনা শুধু ট্রফি জেতেননি, ফুটবলকে আবেগের নতুন সংজ্ঞা দিয়েছিলেন।