দ্য লাস্ট ড্যান্স... বিদায় বলবেন যে কিংবদন্তি
ছবি: এআই জেনারেটড

কারিমুল ইসলাম: ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়। এটি স্মৃতির ভাণ্ডার, আবেগের আশ্রয়, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়া গল্পের নাম। কিছু খেলোয়াড় থাকেন যারা সময়কে ছাড়িয়ে যান— যাদের নাম উচ্চারণ করলেই ভেসে ওঠে একেকটি যুগ, একেকটি অনুভূতি, একেকটি মহাকাব্য।

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব ফুটবলকে শাসন করা লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোরা এখন বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে। স্টেডিয়ামের গর্জন, আলোর ঝলকানি, কোটি মানুষের ভালোবাসা— সবকিছুর মাঝেও সময় নীরবে জানিয়ে দিচ্ছে তাদের শেষ বাঁশি আর খুব দূরে নয়। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মাটিতে বসতে যাওয়া ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ তাই শুধু আরেকটি বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট নয় এটি হতে যাচ্ছে এক আবেগময় অধ্যায়ের শেষ পাতা। নতুন ৪৮টি দলের বিশ্বকাপ যেমন ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেবে তেমনি বিদায় জানাবে এসব কিংবদন্তিদের— যাদের ছাড়া আধুনিক ফুটবল কল্পনা করাই কঠিন।

কারও হাতে ইতোমধ্যে উঠেছে সোনালি ট্রফি, কেউ এখনও অপূর্ণ স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে লড়ছেন। কিন্তু সবার গল্পের মধ্যেই আছে এক গভীর উপলব্ধি এটাই হয়তো শেষবার। শেষবার জাতীয় সংগীতের সময় চোখ বন্ধ করে দাঁড়ানো, শেষবার বিশ্বকাপের আলোয় নিজের নাম ধ্বনিত হতে শোনা, শেষবার কোটি মানুষের স্বপ্ন বুকে নিয়ে মাঠে নামা। ট্রফির লড়াই ছাপিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ হবে স্মৃতি, শ্রদ্ধা আর বিদায়ের এক মহা নাট্যমঞ্চ। যেখানে ফুটবল বিশ্ব হয়তো শেষবারের মতো দেখবে মেসির জাদুকরী বাঁ-পা, রোনালদোর অদম্য উচ্চাকাঙ্ক্ষা কিংবা মদরিচের কবিতার মতো ফুটবল।

যেসব কিংবদন্তির জন্য ২০২৬ বিশ্বকাপই হতে পারে জাতীয় দলের জার্সিতে শেষ অধ্যায়:

১. লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা)

২০২২ কাতার বিশ্বকাপে মেসি যখন বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তুলেছিলেন তখন যেন পুরো ফুটবল বিশ্ব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। ফুটবলের রোমান্টিকতাই যেন জয়ী হয়েছিল। অনেকে ভেবেছিলেন, সেখানেই হয়তো তিনি বিদায় বলবেন। কিন্তু ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা তাকে মাঠে টেনে রেখেছে। ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে ‘লা পুলগা’-র বয়স হবে ৩৯। আগের মতো গতি না থাকলেও তার ফুটবল মেধা, দৃষ্টি আর খেলার বোধ এখনও অটুট। আর্জেন্টিনার জন্য তিনি শুধু একজন অধিনায়ক নন, এক আধ্যাত্মিক নেতা। ২০২৬ বিশ্বকাপ হয়তো হবে মুকুট হস্তান্তরের মঞ্চ কিন্তু বল যখনই তার বাঁ পায়ে যাবে, জাদু তখনও বেঁচে থাকবে।

২. ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো (পর্তুগাল)

যদি কেউ সময়কে হার মানাতে পারেন তবে তিনি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। বিশ্বকাপের সময় তার বয়স হবে ৪১। সেই বয়সেও পর্তুগাল দলে জায়গা পাওয়া হবে এক শারীরিক ও ক্রীড়াবিষয়ক বিস্ময়। রোনালদো রেকর্ড ভাঙার নেশায় মত্ত। ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হিসেবে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে পারার সম্ভাবনা নিশ্চয়ই তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। হয়তো তার ভূমিকা হবে ‘সুপার সাব’ কিন্তু তার উপস্থিতি, নেতৃত্ব আর গোলের সামনে নির্মম দক্ষতা দলকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। ২০২৬ বিশ্বকাপই হবে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিগত যুগের চূড়ান্ত সমাপ্তি।

৩. লুকা মদরিচ (ক্রোয়েশিয়া)

দীর্ঘস্থায়িত্ব আর নান্দনিকতার আরেক নাম লুকা মদরিচ। ৪০ বছর বয়সেও ক্রোয়েশিয়ান এই মিডফিল্ড জাদুকর এমন সৌন্দর্যে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করেন যা তরুণ মিডফিল্ডারদের কাছেও স্বপ্নের মতো। তার নেতৃত্বেই ছোট্ট দেশ ক্রোয়েশিয়া টানা দুই বিশ্বকাপে পদক জিতেছিল—২০১৮ সালে রানার্সআপ এবং ২০২২ সালে তৃতীয় স্থান। ২০২৬ বিশ্বকাপ হবে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডারের বিদায়ী মঞ্চ। মদরিচ যখন শেষবার মাঠ ছাড়বেন, ফুটবল হারাবে তার কবিতার একটি অংশ।

৪. গিয়ের্মো ওচোয়া (মেক্সিকো)

ফুটবলে একটা অলিখিত নিয়ম আছে— বিশ্বকাপ এলেই গিয়ের্মো ওচোয়া পৃথিবীর সেরা গোলরক্ষকে পরিণত হন। কোঁকড়ানো চুলের এই মেক্সিকান গোলরক্ষক বিশ্বকাপের এক কাল্ট নায়ক। ২০২৬ সালে তার বয়স হবে ৪০। তবে মেক্সিকো স্বাগতিক হওয়ায় তার অনুপ্রেরণা থাকবে আকাশছোঁয়া। ওচোয়া খেলতে চান নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ যা তাকে ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা করে দেবে। আজতেকা স্টেডিয়ামে ঘরের দর্শকদের সামনে শেষ বিশ্বকাপ খেলতে পারা হবে তার ক্যারিয়ারের নিখুঁত সমাপ্তি।

৫. কেভিন ডি ব্রুইনা (বেলজিয়াম)

উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপের সময় ম্যানচেস্টার সিটির সাবেক তারকা মিডফিল্ডারের বয়স ৩৫ ছুঁইছুঁই হবে। ডি ব্রুইন হয়তো তার প্রজন্মের সবচেয়ে পরিপূর্ণ প্লে-মেকার, কিন্তু বেলজিয়ামের তথাকথিত ‘গোল্ডেন জেনারেশন’-এর ব্যর্থতার গল্প তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে তাড়া করে ফিরেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপই তার শেষ সুযোগ বড় কোনো ছাপ রেখে যাওয়ার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চোট আর শারীরিক ক্লান্তি বিবেচনায় নিলে এটিই সম্ভবত বিশ্বজয়ের পথে তার শেষ লড়াই।

৬. মোহাম্মদ সালাহ (মিসর)

‘দ্য ফ্যারাও’ নামে পরিচিত মোহামেদ সালাহর বয়স ২০২৬ বিশ্বকাপের সময় হবে ৩৪ বছর। বিশ্বকাপ বরাবরই সালাহর জন্য আনন্দের চেয়ে বেশি বেদনার গল্প লিখেছে। ২০১৮ বিশ্বকাপের আগে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে পাওয়া সেই হৃদয়ভাঙা চোট থেকে শুরু করে বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়ার ব্যর্থতা— সব মিলিয়ে এই মঞ্চে তার স্বপ্ন বারবার থমকে গেছে। তবে ৪৮ দলের সম্প্রসারিত বিশ্বকাপ মিসরের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। আফ্রিকার দেশটি এবার বড় মঞ্চে নিজেদের ছাপ রাখার সুযোগ পাচ্ছে। সালাহর জন্য এটি শুধু শেষ সুযোগ নয় বরং একটি মিশন— একটি কিংবদন্তি ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে সেই জাতিকে আনন্দ উপহার দেওয়া যারা তাকে প্রায় ভালোবেসে মাথায় রেখেছে।

৭. কাসেমিরো (ব্রাজিল)

আক্রমণ ভাগ ধ্বংসের বিশেষজ্ঞ। বহু বছর ধরে ব্রাজিল ও রিয়াল মাদ্রিদের ভারসাম্যের মূল স্তম্ভ ছিলেন কাসেমিরো। ২০২৬ বিশ্বকাপে তার বয়স হবে ৩৪। আধুনিক ফুটবলে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের জন্য প্রয়োজন অসাধারণ ফিটনেস, এই বিশ্বকাপই হবে তার সহনশীলতার চূড়ান্ত পরীক্ষা। ব্রাজিল মরিয়া হয়ে খুঁজছে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ শিরোপা— ‘হেক্সা’। আক্রমণনির্ভর দলটিতে ভারসাম্য আনার জন্য কাসেমিরোর অভিজ্ঞতা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৮. নেইমার (ব্রাজিল)

নেইমারকে বলা হয়ে থাকে প্রতিভার অপচয়। চোটের কারণে ক্যারিয়ারজুড়ে বারবার মাঠের বাইরে ছিটকে গেছেন। এবারের বিশ্বকাপেও তার খেলা অনিশ্চিত। ব্রাজিল দলে অনিশ্চয়তার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন নেইমার। তার বিশ্বকাপ যাত্রা অনেকটাই নির্ভর করবে কার্লো আনচেলত্তির পরিকল্পনার ওপর।

৯. সন হিউং মিন

বিশ্বকাপের সময় দক্ষিণ কোরিয়ার অধিনায়ক সন হিউং-মিনের বয়স হবে ৩৩। উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপ সম্ভবত তার চতুর্থ এবং শেষ বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে। আগের তিনটি বিশ্বকাপেই তিনি রেখে গেছেন স্মরণীয় মুহূর্ত। বিশেষ করে ২০১৮ বিশ্বকাপে জার্মানির বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয় আজও দক্ষিণ কোরিয়ার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম গৌরবময় স্মৃতি। ২০২৫ সালের জুনে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করার পর এখন সনের সামনে সুযোগ, উত্তর আমেরিকার মঞ্চে নিজের বিশ্বকাপ যাত্রাকে স্মরণীয় এক সমাপ্তি দেওয়ার।

১০. আন্তোনিও গ্রিজম্যান (ফ্রান্স)

প্রায়ই অবমূল্যায়িত অথচ ফ্রান্সের সাফল্যের জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ এক নাম আন্তোনিও গ্রিজমান। বিশ্বকাপের সময় তার বয়স হবে ৩৫ বছর। দিদিয়ের দেশমের কৌশলগত ‘রূপ বদলানো সৈনিক’ তিনি। কখনও গোলস্কোরার, কখনও প্লেমেকার, আবার প্রয়োজন হলে রক্ষণভাগের শ্রমিক— সব ভূমিকাতেই সমান কার্যকর। ফরাসি ফুটবলের ‘লিটল প্রিন্স’ নিঃশব্দেই জাতীয় দলের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে পরিণত হয়েছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপই হবে তার বড় মঞ্চকে বলা শেষ ‘ও রেভোয়া’।